বাড়াছে ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার ল্যাব

এসএম দেলোয়ার হোসেন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

★ অপরাধ দমনে পুলিশে বাড়বে দক্ষতা ও সক্ষমতা
★ আগামী অক্টোবরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে উদ্বোধন

“পুলিশ সদর দপ্তরের উদ্যোগে সম্প্রতি দেশব্যাপী সাইবার ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্স চালু করা হয়েছে, যেখানে সিআইডি’র অফিসাররা অংশগ্রহণ করছেন। এতে অপরাধ দমনে সহায়ক হবে” 
— মো. ছুফি উল্লাহ, বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া), সিআইডি 
“সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। পুলিশ যেকোনো অপরাধ দমনে তৎপর রয়েছে। সমাজ থেকে অপরাধ দমন ও মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সচেষ্ট রয়েছে”
— মো. শফিকুল ইসলাম, ডিবিপ্রধান, ডিএমপি

 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশেজুড়ে সংঘটিত সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আগামী অক্টোবরে ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব উদ্বোধন করা হবে। কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট অথবা অন্য কোনো ডিজিটাল ডিভাইস এবং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে প্রতারণা কঠোরভাবে দমনে পুলিশ বাহিনীর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিশেষায়িত ‘সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট’ গঠন এবং অবকাঠামো তৈরির কাজও পুরোদমে চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশেও বাড়ছে সাইবার অপরাধের সংখ্যা। দেশের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে দেশে প্রায় দুই লাখ মানুষ সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য মতে, প্রতি বছর দেশে গড়ে প্রায় ১২ শতাংশ হারে সাইবার অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মোট ভুক্তভোগীর মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন মাধ্যমে অভিযোগ করেন। সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশই ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী।

পুলিশ জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই-ভিত্তিক ভয়েস বা ভিডিও ক্লোনিং (ডিপফেক) ব্যবহার করে পরিচিত ব্যক্তির পরিচয় দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়ার নতুন অপরাধচক্র তৎপর রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে সাধারণ মানুষকে অনলাইন ব¬্যাকমেইল, ভুয়া লিংক এবং আর্থিক প্রতারণা সম্পর্কে সচেতন করতে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে। তাদের তথ্যমতে দেশে সাইবার অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে বিশেষ করে হ্যাকিং, আর্থিক প্রতারণা এবং নারী ও শিশুদের টার্গেট করে করা অপরাধের হার বেশি।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সাইবার অপরাধে রাজধানীর রমনা বিভাগে ৮৮টি মামলা ও ১৬৩ জনকে গ্রেপ্তার, লালবাগ বিভাগে ২২টি মামলা ও ২৩ জনকে গ্রেপ্তার এবং ওয়ারী বিভাগে ১২টি মামলা ও ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া মতিঝিল বিভাগে ৩৩টি মামলা ও ৪৯ জনকে গ্রেপ্তার, তেজগাঁও বিভাগে ৫৩টি মামলা ও ৪৯ জনকে গ্রেপ্তার, মিরপুর বিভাগে ৩৩টি মামলা ও ২৭ জনকে গ্রেপ্তার, গুলশান বিভাগে ৩৮টি মামলা ও ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার এবং উত্তরা বিভাগে ২৬টি মামলা ও ৩৪ জনকে জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  

সিআইডি জানিয়েছে, বিশেষায়িত সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের জন্য চলতি বছরের গত ২১ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশ হয়েছে। সাইবার অপরাধ দমনে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে সরকার কাজ করছে। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় ও উন্নত ল্যাব পরিদর্শনের জন্য বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত এক বছরে সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত জিআর ৩২টি এবং সিআর ১৫৯টি মিলিয়ে মোট ১৯১ মামলা হয়েছে। এ ছাড়া সাইবার অপরাধের ঘটনায় এক বছরে ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সিআইডির তথ্যমতে, সাইবার অপরাধীরা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অনুমতি ছাড়া অন্যের ফেসবুক, ই-মেইল বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে প্রতারণা করছে। এ ছাড়া ভুয়া লিংক বা ওয়েবসাইট তৈরি করে ব্যবহারকারীর গোপন পাসওয়ার্ড বা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে প্রতারণা করা হয়। পাশাপাশি অন্যের পরিচয় বা জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি করে প্রতারণা করা হয়ে থাকে। এ ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ইন্টারনেটে বিভিন্ন জনকে ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল ও মানহানি করে সাইবার অপরাধীরা। 

এ প্রসঙ্গে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, সাইবার জালিয়াতি, হ্যাকিং ও অনলাইন হয়রানি সংক্রান্ত যেসব মামলা সিআইডিতে আসে, তা পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে কর্মরত অফিসারদের সাইবার ট্রেনিং সেন্টার, ফরেনসিক ট্রেনিং ইন্সটিটিউট (এফটিআই) ও ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে (ডিটিএস) চলমান ট্রেনিংয়ে  নতুন নতুন মডিউল সংযোজন করা হচ্ছে। এ ছাড়া পুলিশ সদর দপ্তরের উদ্যোগে সম্প্রতি দেশব্যাপী সাইবার ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্স চালু করা হয়েছে, যেখানে সিআইডি’র অফিসাররা অংশগ্রহণ করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। পুলিশ যেকোনো অপরাধ দমনে তৎপর রয়েছে। সমাজ থেকে অপরাধ দমন ও মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সচেষ্ট রয়েছে। চুরির চেয়ে বর্তমানে সাইবার ক্রাইম বা ডিজিটাল জালিয়াতি অনেক বেশি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন বলেন, সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশ দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সচেষ্ট রয়েছে। সাইবার অপরাধীদের দমনে সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবিতে) একটি সাইবার ল্যাব রয়েছে এবং কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমে (সিটিটিসি) একটি ফরেনসিক ল্যাব চালুর অনুমোদন হয়েছে। এ ছাড়াও ডিজিটাল মামলা তদন্তে ডিএমপি থেকে সংশি¬ষ্টদের দ্রুত প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

এদিকে, পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, সাইবার অপরাধ দমনে বাংলাদেশ পুলিশ বর্তমানে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে অত্যন্ত জোরদার ও তৎপর ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া ইন্টারনেটের অপব্যবহার, অনলাইন প্রতারণা এবং আর্থিক জালিয়াতি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে পুলিশ বাহিনীকে আরও আধুনিক ও দক্ষ করে তোলার জন্য বেশ কিছু বড় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজে সাইবার অপরাধের মামলা তদন্তের ওপর ১০ দিনের একটি বিশেষ ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্স শুরু হয়। এর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ৩৩২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, যারা পরবর্তীতে মাঠপর্যায়ের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেবে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির সাইবার অপরাধ মামলা তদন্ত সংক্রান্ত বিশেষায়িত এই কোর্সের উদ্বোধন করেন।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL