বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট কে এম তাহসিফ সাউরির পেছনে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্ত সংস্থা। তাহসিফের শেয়ার করা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে দেশত্যাগের ভিডিও এবং তার কাছে সেদিনের আরও কোনো ভিডিও ফুটেজ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) আদালতে তোলা তাহসিফ সাউরির সঙ্গে থাকা সন্দেহভাজন অভিযুক্ত নারী আসামি জেরিকা তাসনীম দিশাকে পুনরায় রিমান্ড শুনানি শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের শুনানি শেষে বিজ্ঞ আদালতের বিচারক ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মঞ্জুরুল ইসলাম দিশাকে ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এদিন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলামের আদালতে তাহসিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ওই দিশার রিমান্ড শুনানি হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, তাহসিফের ধারণ (শেয়ার) করা ভিডিওটি দেশের মানুষের কাছে শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে দেশত্যাগের দৃশ্য তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ওই ভিডিওর কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা কোনো একটি বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত করছেন না। তাহসিফের ওই ভিডিও, সেদিনের অন্য কোনো ঘটনার ফুটেজ তার কাছে ছিল কি না এবং এসবের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না- সব বিষয়ই বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এর আগে, আদালতে শুনানির শুরুতে তদন্ত কর্মকর্তা আগের রিমান্ডে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, তদন্তে দুজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে। তারা বিভিন্ন সময়ে একেক রকম বক্তব্য দিচ্ছেন। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, আমার মক্কেলকে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিহত তাহসিফ নিজেই তাকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কোনো সমস্যা থাকলে এমনটি হওয়ার কথা নয় বলে দাবি করেন তিনি। পরে আসামির নারী ও ছাত্রী পরিচয় বিবেচনায় নিয়ে আদালতের কাছে আবেদন জানান। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত ওই নারীর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার জেরিকা তাসনীম দিশাকে (১৯) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবারও ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার (৪ নভেম্বর) উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মঞ্জুরুল ইসলামের আদালত এ আদেশ দেন।
এর আগে এ মামলায় চার দিনের রিমান্ড শেষে দিশাকে আদালতে হাজির করে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন দ্বিতীয় দফায় আবারও সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, গত ২৭ অক্টোবর রাতে নিহত তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ যান জেরিকা তাসনিম দিশা। এছাড়াও ঘটনার আগে তারা একাধিকবার ‘সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকস’ এ গিয়েছিলেন। একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে এই মামলার অপর রিমান্ডপ্রাপ্ত আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের (২৩) সঙ্গেও দিশাকে একসঙ্গে অবস্থান করতে দেখা গেছে। এছাড়া ভিকটিম তাহসিফের সঙ্গে দিশা রেস্টুরেন্টে অবস্থানসহ মোটরসাইকেলে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করেছিলেন। নিহত তাহসিফের মোবাইল কললিস্ট (সিডিআর) পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘটনার আগে দিশার সঙ্গে তার একাধিকবার ফোনালাপের প্রমাণ রয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা আবেদনে উল্লেখ করেন, প্রাথমিকভাবে তাহসিফ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দিশার জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন, অন্য অজ্ঞাত আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, হত্যাকাণ্ডের স্থান নির্ধারণ, আলামত উদ্ধার এবং অপর আসামি দীপের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে দিশার বক্তব্য ক্রস-চেক (মুখোমুখি যাচাই) করার জন্য আসামিকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা একান্ত প্রয়োজন। এর আগে, গত ১ নভেম্বর তার এ মামলায় চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেন।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, গত ২৭ অক্টোবর আমার ছেলে তাহসিফ সাউরি আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টার পর দীপ নামে তার এক বন্ধুর ডাকে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। রাত বেশি হলেও ছেলে ফিরে না আসায় তার মা বারবার ফোনে যোগাযোগ করলে সে জানায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরবে। পরে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তার ফোন থেকে মায়ের ফোনে ভয়েস মেসেজ পাঠায়, ‘রওনা দিয়েছি, আসছি। কিন্তু রাত পেরিয়ে পরদিন বিকেল হলেও সে ফিরে আসেনি। গত ২৮ অক্টোবর বিকেল আনুমানিক ৫টা ২০ মিনিটে উত্তরখান থেকে নৌ-পুলিশ ফোনের মাধ্যমে আমাকে জানায়, রাজারবাড়ি ঘাট উত্তরখান এলাকায় তুরাগ নদী থেকে আমার সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এরপর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক কার্যক্রম শেষে ২৯ অক্টোবর দুপুরে নৌ-পুলিশ আমার কাছে আমার সন্তানের মরদেহ হস্তান্তর করে। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় রীতি সম্পন্ন করে ২৯ অক্টোবর বিকেলে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাহসিফের লাশ দাফন করা হয়। এ ঘটনায় গত ৩১ অক্টোবর রাজধানীর উত্তরখান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম।