অতীতে মাটির ঘর গরীবের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর বলে পরিচিত ছিল। শীতে ঘরের ভেতর উষ্ণতা আর গরমকালে স্বাভাবিক তাপমাত্রা বিরাজ করায় মাটির ঘর গরিবের কাছে যেমন আরামের তেমন ধনীদের কাছে ছিল বিলাসিতা

হারিয়ে যাচ্ছে মাটির ঘর, মুচ্ছে যাচ্ছে অতীত

তাসনুভা আহমেদ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

গ্রাম বাংলার চির ঐতিহ্যের নিদর্শন সবুজ শ্যামল ছায়া ঘেরা শান্তির নীড় মাটির ঘর। যা এক সময় গ্রামের মানুষের কাছে ‘গরীবের এসি বাড়ি’ নামে পরিচিত ছিলো। কিন্তু কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের মাটির ঘর। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে গ্রামেও। মাটির ঘরের জায়গায় তৈরি হচ্ছে প্রাসাদসম অট্টালিকা। মাটির ঘরের স্থান দখল করে নিচ্ছে ইট-পাথরের দালান। একটু সুখের আশায় মানুষ কত কিছুই না করছে। তবুও মাটির ঘরের শান্তি ইট পাথরের দালান কোঠায় খুঁজে পাওয়া ভার। মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা, প্রযুক্তির উন্নয়ন, রুচিবোধের পরিবর্তন, পারিবারিক নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে নিজেদের সুরক্ষার কারণে এখন আর কেউ মাটির ঘরে থাকতে চান না। সচ্ছল মানুষেরা এখন ঝুঁকে পড়েছেন পাকা দালানের দিকে। তারপরও মানুষ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নগরায়ণের সাথে সাথে পাকা দালান কোঠা তৈরি করছেন। তাই আধুনিকতার ছায়ায় আর সময়ের পরিবর্তনে গ্রাম বাংলা থেকে ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈরি ঘর আজ প্রায় বিলুপ্তের পথে।
বেশিদিন আগের কথা নয়, প্রতিটি গ্রামে একসময় মানুষের নজর কাড়তো সুন্দর এ মাটির ঘর। ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচার পাশাপাশি প্রচুর গরম ও খুবই শীতে বসবাস উপযোগী মাটির তৈরি এসব ঘর এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। আধুনিকতার ছোঁয়া আর কালের বিবর্তনে বিভিন্ন গ্রামে এ চিরচেনা মাটির ঘর বিলুপ্তির পথে বললেই চলে। অতীতে মাটির ঘর গরীবের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর বলে পরিচিত ছিল। এসব ঘর শীত ও গরম মৌসুম আরামদায়ক তাই আরামের জন্য গ্রামের দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি অনেক বিত্তবান ও মাটির ঘর তৈরি করে থাকতেন।


গ্রামবাংলার আদি ঐতিহ্য মাটির ঘর। চারদিক মাটির দেয়াল, উপরে টিন বা ছনের ছাউনি বয়োজ্যেষ্ঠদের মনে করিয়ে দেয় তাদের শৈশব। কনকনে শীতে ঘরের ভেতর উষ্ণ পরিবেশ আর গরমকালে স্বাভাবিক তাপমাত্রা বিরাজ করায় মাটির ঘর গরিবের কাছে যেমন আরামের তেমনি ধনীদের কাছে ছিল বিলাসিতা। তবে যুগের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে অস্তিত্ব বিলীনের পথে মাটির ঘর। এক সময় মফস্বলের প্রতিটি বাড়িতেই দেখা যেত এই মাটির ঘর। কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পূর্বপুরুষের তৈরি ঘরগুলো এখন ইট, বালু, রড, সিমেন্টের ঘরে রূপান্তরিত হচ্ছে। আর যাদের সামর্থ্য নেই তারা করছেন টিনের ঘর।
ঘরগুলোর নির্মাণ কৌশলও কত সুন্দর! পানির সঙ্গে মাটির প্রলেপ মিশিয়ে লেপে নিলেই কোনো ফাটল দেখা যায় না। কোনো কোনো সময় অতিবৃষ্টি কিংবা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরগুলো বেশি নষ্ট বা ফেটে গেলে সিমেন্ট দিয়েও লেপে দেওয়া যায়। যারা মাটির ঘর নির্মাণ করেন তারা ‘দেল বারুই’ নামে পরিচিত। সচরাচর এঁটেল মাটি দিয়ে এসব ঘর তৈরি করা হয়। পরিচ্ছন্ন মাটির সঙ্গে পানি মিশিয়ে কাদায় পরিণত করে ইটের মতো সারি সারি করে ২০-৩০ ইঞ্চি চওড়া দেয়াল তৈরি করা হয়। প্রতিবারে এক-দেড় ফুট উঁচু করে ক্রমে শুকিয়ে গেলে খড় বা টিন দিয়ে ছাউনি দেওয়া হতো। প্রতিটি ঘর তৈরিতে দেড়-দুই মাসের মতো সময় লাগে। মাটির ঘর তৈরির উপযুক্ত সময় ছিল কার্তিক মাস। এ সময় সাধারণত বৃষ্টিপাত কম থাকায় মাটির দেয়াল সহজে শুকিয়ে শক্ত হয়ে যেত। তবে মুষলধারে বৃষ্টিতে মাটির ঘরের স্বাভাবিক কাঠামো নষ্ট হওয়ায় লোকজন এই ঘর তৈরিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।
পূর্বপুরুষের স্মৃতি হিসেবে এখনো বেশ কিছু জায়গায় মাটির ঘর দেখা যায়। রুপগঞ্জ উপজেলার ভূলতা ইউনিয়নের পাচাইখাঁ এলাকায় এখনো কিছু মাটির ঘর রয়েছে। একচালা ঘরগুলোর চারদিক দেয়াল উপরে টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি ঘরগুলো দেখতে ক্যানভাসে আঁকা ছবির মতোই সুন্দর। এছাড়া নওগাঁয় রয়েছে ১০৮ কক্ষের মাটির প্রাসাদ। নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার চেরাগপুর ইউনিয়নের আলিপুর গ্রামে ৩৩ বছর ধরে টিকে আছে বাড়িটি। এছাড়াও বগুড়ার নন্দীগ্রামে ১২ শতক জমির উপর তিনতলা মাটির ঘর দর্শনীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম।


বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ, যেখানে গ্রামবাংলার প্রকৃতি ও মাটির বাড়ি ছিল এক সময় আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক। এখানকার মাটির ঘর, সবুজ শ্যামল ক্ষেত-খামার এবং সহজ-সরল জীবনযাপন গ্রামবাংলার একটি বিশেষ চিত্র তুলে ধরে। ঐতিহ্যবাহী এই গ্রামীণ পরিবেশ বাংলাদেশের সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত। যুগ যুগ ধরে এ দেশের মানুষ তাদের গ্রামীণ জীবনযাপন ও প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করে এসেছে, যা দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ। বর্তমানে নগরায়ণের ফলে গ্রামীণ পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধার জন্য মানুষ শহরের দিকে ঝুঁকছে এবং গ্রামাঞ্চলে কংক্রিটের দালান ও শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠছে। এই নগরায়ণ একদিকে দেশের আর্থিক উন্নতি ও আধুনিকায়নের প্রতীক হলেও অন্যদিকে তা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। হারিয়ে যাচ্ছে মাটির ঘর, কাঁচা রাস্তা ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের স্বাভাবিক সৌন্দর্য।
উন্নতির প্রয়োজনে পরিবর্তন জরুরি হলেও গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গেল পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ঐতিহ্য রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে গ্রামের আভিজাত্য ও ঐতিহ্য অটুট থাকে। গ্রামীণ ঐতিহ্য রক্ষা করেই বাংলাদেশের উন্নয়ন টেকসই হতে পারে।
একসময় গ্রামবাংলার মাটির বাড়ি শুধু বাসস্থান নয়; ছিল আবেগ, ঐতিহ্য আর মানুষের মিলনের প্রতীক। এসব বাড়িতে বসবাস করত যৌথ পরিবার, যেখানে বাবা-মা, সন্তান, দাদা-দাদি সবাই একসঙ্গে থাকত। উঠোনে একসঙ্গে গল্প করা, পিঠা বানানোর উৎসব, সন্ধ্যায় লণ্ঠনের আলোতে পারিবারিক সময় কাটানো– এসব দৃশ্য মাটির বাড়ির অপরিহার্য অংশ ছিল। মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা, সহযোগিতা, ভালোবাসার বন্ধন গভীর ছিল। মাটির দেয়ালের গায়ে এঁকে রাখা আলপনা আর উঠোনজুড়ে খেলার দৃশ্য এক বিশেষ পরিবেশ সৃষ্টি করত, যা আজও স্মৃতিতে ভাসে। কিন্তু আধুনিক ফ্ল্যাট সংস্কৃতি এই চিত্র বদলে দিয়েছে। এখন পরিবারের সদস্যরা আলাদা ঘরে, এমনকি আলাদা শহরে বসবাস করে। মানুষে মানুষে মনের দূরত্ব বেড়েছে। যৌথ পরিবারের ধারণা তো বিলুপ্তপ্রায়। ফ্ল্যাটে বাস করা মানুষের মধ্যে পাশের বাসার কাউকে চেনার তাগিদও কম। মাটির বাড়ির সেই আন্তরিক পরিবেশ আর মিলনের সুযোগ আধুনিক বাসস্থানে অনুপস্থিত, যা আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনকে দিন দিন দুর্বল করে দিচ্ছে।


বর্তমান সময়ে আধুনিকতার ছোঁয়া মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন এনেছে, বিশেষ করে বাসস্থানের নকশায়। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটির বাড়ি ছিল প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ মানানসই। এসব বাড়ি প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি হওয়ায় গরমকালে ঠান্ডা আর শীতকালে উষ্ণ পরিবেশ তৈরি করত। মাটির দেয়াল, খোলামেলা উঠোন, চারপাশে গাছপালার ছায়ায় পাওয়া যেত নির্মল হাওয়া। মাটির বাড়িতে  মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মিশে বাস করত, যা স্বাস্থ্য ও মানসিক প্রশান্তির জন্য অত্যন্ত উপকারী। কিন্তু আধুনিক ফ্ল্যাট বাড়িগুলোতে এসি-ফ্যানের কৃত্রিম বাতাস ব্যবহার করা হচ্ছে, যা একদিকে আরাম দিলেও স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিকর। এসির বাতাস ঘরের আর্দ্রতা কমিয়ে ফেলে, যা ত্বক ও শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা সৃষ্টি করে। পাশাপাশি এর অতিরিক্ত ব্যবহারে পরিবেশের ওপরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মাটির বাড়ির সহজ-স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এখন কংক্রিটের দেয়ালে হারিয়ে গেছে। আধুনিক বাসস্থানের এই পরিবর্তন আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য থেকে শুধু দূরে সরিয়ে দেয়নি, বরং প্রকৃতির সঙ্গেও মানুষের সম্পর্কের একটি বড় ফারাক তৈরি করেছে।
আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। উন্নত জীবনের আশায় ইট পাথরের পাকা বাসস্থানের পেছনে ছুটছে মানুষ। এতে করে কালের গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারক মাটির ঘর। একসময় গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি বাড়িতেই দেখা মিলতো মাটির ঘরের। তবে নগর জীবনের ছোঁয়া লেগেছে এ এলাকার বাসিন্দাদের ওপর। আধুনিক সভ্যতার সঙ্গে পাল্লাদিয়ে জীবনমান উন্নয়নে ইট পাথরের বাসস্থান তৈরিতে ব্যস্ত সবাই। মাটির ঘরের জায়গা দখল করে নিয়েছে ইট-পাথরের তৈরি দালান। এতে করে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের মাটির ঘর। কিছুদিন আগেও গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই মাটির ঘর চোখে পড়তো। তবে এখন সেসব ঘরের জায়গা দখল করে নিয়েছে দালানকোঠা।
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ মাটির ঘরে বসবাস করে আসছে। মাটির সহজলভ্যতা, প্রয়োজনীয় উপকরণ আর শ্রমিক খরচ কম হওয়ায় আগের দিনে মানুষ মাটির ঘর বানাতে বেশ আগ্রহী ছিল। এসব মাটির ঘর তৈরি করতে কারিগরদের সময় লাগতো দুই থেকে তিন মাস। কিন্তু বর্তমানে এর চাহিদা না থাকায় কারিগররাও এই পেশা ছেড়ে অন্য অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন।
মাটির ঘর শীতের সময় উষ্ণ, আর গরমের সময় শীতল থাকে। তাই মাটির ঘরকে গরিবের এসিও বলা হয়ে থাকে। কাদামাটি দিয়ে দেড় থেকে দুই ফুট চওড়া করে ৮ থেকে ১০ ফিট উঁচু দেয়াল নির্মাণ করে টিনের ছাউনি দিয়ে মাটির ঘর তৈরি করা হতো। যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান ও উৎসব এলেই কাঁদামাটির প্রলেপের মাধ্যমে গৃহিণীদের হাতের ছোঁয়ায় সেই মাটির ঘরের সৌন্দর্য আরও দ্বিগুণ হয়ে যেত। মাটির ঘরকে ভেতর ও বাইরে থেকে আরও আকর্ষণীয় করতে আল্পনা আঁকাতেন গৃহীনিরা। কেউবা এই মাটির ঘরে সিমেন্টের প্রলেপ দিয়ে আরও মজবুত করে তাতে রং বা চুন লাগিয়ে দৃষ্টি নন্দন করতো। দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিলনা এটি মাটির ঘর না পাকা দালান বাড়ি।
মাটির ঘর পরিবেশবান্ধব। মাটির ঘরে গরমের সময় গরম লাগে না। শীতের সময় শীত লাগে না। মাটি ঘরে থাকা খুবই আরামদায়ক। প্রতিটি বাড়িতেই আগে মাটির ঘর ছিল। রুচিশীল মানুষরা এই ঘরে বিভিন্ন নকশা করাতেন। অনেকে নকশার সাথে সাথে সিমেন্ট বালির প্রলেপ দিয়ে রঙ করাতেন। দূর থেকে দেখে অবিকল পাকা ঘরের মতো লাগতো। বুঝাই যেতো না মাটির ঘর না পাকা ঘর। এখন গ্রামাঞ্চলেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে; ইট পাথরের বহুতল ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতা চলছে। এখন আর মানুষ মাটির ঘর তৈরি করে না। কালের বিবর্তনে এই পরিবেশবান্ধব বাসস্থান এখন আর নতুন করে তৈরি করতে দেখা যায় না। ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ ঐতিহ্য মাটির ঘর।
একসময় গ্রামবাংলার চিরচেনা দৃশ্য ছিল মাটির ঘর, টিনের চালা আর চারপাশে গাছ-গাছালিতে ঘেরা সবুজ পরিবেশ। গরমের দিনে ঠান্ডা আর শীতের দিনে উষ্ণ-প্রাকৃতিকভাবেই আরামদায়ক এসব মাটির ঘর ছিল গ্রামীণ মানুষের অন্যতম প্রধান আবাসস্থল। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া, মানুষের আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি, রুচির পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। কিছু কিছু গ্রামে অবশ্য এখনও কিছু মাটির ঘর চোখে পড়ে। তবে কয়েক বছর আগেও যেসব এলাকায় অসংখ্য মাটির ঘর দেখা যেত, বর্তমানে সেখানে ইট, বালু, রড ও সিমেন্টের তৈরি পাকা-সেমিপাকা ভবন জায়গা করে নিয়েছে।
একসময় দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি বিত্তবানরাও মাটির ঘরে বসবাস করতেন। নিয়মিত সংস্কার করলে এসব ঘর দীর্ঘদিন টিকে থাকে। তবে এখন মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং আর্থিক সক্ষমতা বাড়ায় সবাই পাকা বা সেমিপাকা বাড়ির দিকে ঝুঁকছেন। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের গ্রামের এই ঐতিহ্য একসময় পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। আগে মাটির ঘর ছিল আমাদের গ্রামের স্বাভাবিক দৃশ্য। ঘরের চারপাশে গাছপালা থাকত, পরিবেশও অনেক সুন্দর ছিল। এখন মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো হয়েছে, তাই সবাই ইট-সিমেন্টের বাড়ি করতে চায়। মাটির ঘরকে এখন অনেকে পুরোনো দিনের জিনিস মনে করেন। অথচ এসব ঘরের সঙ্গে আমাদের শেকড় ও ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। তবে এখনও অনেক পরিবার বাপ-দাদার তৈরি ঘর সংস্কার করে বসবাস করছেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকে বাপ-দাদার তৈরি মাটির ঘর প্রতিবছর মাটি দিয়ে সংস্কার করে বসবাস করছেন। কিন্তুনতুন প্রজন্মের মধ্যে মাটির ঘরের প্রতি আগ্রহ কমে গেছে। নতুন করে মাটির ঘর নির্মাণ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পুরোনো ঘরগুলোও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে।


গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে মাটির ঘরের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। মাটির ঘর শুধু একটি বসতবাড়ি নয়, এটি গ্রামীণ বাংলার জীবনযাপন, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি ঐতিহ্যের শেষ নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রাকৃতিকভাবে আরামদায়ক, পরিবেশবান্ধব এবং স্থানীয় উপকরণনির্ভর এই মাটির ঘরগুলো একসময় হয়তো থাকবে শুধু স্মৃতির পাতায়। তাই সময় থাকতে ঐতিহ্যবাহী এসব ঘরের কিছু নিদর্শন সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া জীবনযাত্রার একটি বাস্তব চিত্র দেখতে পারবে।
হয়ত সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন মাটির ঘরের কথা মানুষের মন থেকে হারিয়ে যাবে, আগামী প্রজন্মের কাছে মাটির ঘর রূপকথার গল্পের মত মনে হবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম মাটির ঘরের গল্প, কবিতার ছন্দে বা সাহিত্যর পাতায় বা যাদুঘরে দেখা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL