পর্ব-১

একই সম্পদ থেকে একাধিক আয়ের উৎস

মোরসালিন আহমেদ, চীন থেকে ফিরে
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

কৃষিকে ঘিরেই বদলে গেছে দামাওয়ের অর্থনীতি


একসময় যেখানে ছিল কাঁচা রাস্তা, সীমিত কৃষিকাজ আর খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘর, সেখানে এখন ফলের বাগান, স্মার্ট গ্রিনহাউস, সাইক্লিং পথ, হোমস্টে ও পর্যটনকেন্দ্র। তবে দামাও ওশান ইকো-ভিলেজের পরিবর্তনের গল্প শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের নয়। এর বড় গল্পটি অর্থনীতির, যা কৃষিকে কেন্দ্র করে একটি গ্রামের আয় ও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে।


চীনের হাইনান প্রদেশের সানিয়া শহরের জিয়াং জেলায় প্রায় ১ হাজার ১৩৩ হেক্টর এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা দামাও ওশান ইকো-ভিলেজে কৃষি, পর্যটন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আধুনিক প্রযুক্তিকে একই অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে জমি এখানে শুধু ফসল উৎপাদনের জায়গা নয়; একই জমি পর্যটনের আকর্ষণ, শিক্ষার ক্ষেত্র এবং স্থানীয় মানুষের আয়ের উৎস হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
সম্প্রতি চীনের অন্যতম পর্যটননগরী সানিয়ায় গিয়ে দামাও ওশান ইকো-ভিলেজ পরিদর্শনের সুযোগ হয়। আধুনিক সানিয়া শহর থেকে প্রায় এক ঘণ্টার পথ পেরিয়ে পাহাড়, কৃষিজমি, ফলের বাগান ও জলাধারঘেরা এলাকায় পৌঁছালে প্রথমেই চোখে পড়ে পরিকল্পিত সবুজায়ন। কিন্তু এর চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে প্রকৃতিকে অক্ষুন্ণ রেখে একটি গ্রামীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।  
স্থানীয় কর্মকর্তা লি ওয়েই বলেন, ওশান গ্রুপ ও স্থানীয় গ্রামের যৌথ উদ্যোগে দামাওর এই প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এর লক্ষ্য শুধু একটি পর্যটন এলাকা তৈরি করা নয়; কৃষিকে ভিত্তি করে গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা।
এই মডেলের কেন্দ্রে রয়েছে কৃষি। তার চারপাশে যুক্ত হয়েছে কৃষি প্রযুক্তি, গবেষণা, পর্যটন, আবাসন, শিক্ষা ও সংস্কৃতি। ফলে কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে যাচ্ছে না। উৎপাদনস্থলকেই পর্যটন ও শিক্ষার অংশ করা হচ্ছে। স্থানীয় বাড়িগুলো হয়ে উঠছে পর্যটকদের থাকার জায়গা। কৃষির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন ধরনের সেবা। অর্থনীতির দৃষ্টিতে এর গুরুত্ব হচ্ছে একটি সম্পদকে একবার ব্যবহার করে থেমে না গিয়ে একই সম্পদ থেকে একাধিক আয়ের সুযোগ তৈরি করা।             
দামাওর পরিবর্তনের অন্যতম ভিত্তি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি। প্রকল্পের ইন্টেলিজেন্ট গ্রিনহাউসে প্রচলিত কৃষির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, গবেষণা ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। গাছের গোড়ায় থাকা সেন্সরের মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা পরিমাপ করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় সেচব্যবস্থায় পানি দেওয়া হয়। কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় তাপমাত্রা ও আর্দ্রতাও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।


এর ফলে কৃষি ব্যবস্থাপনায় অনুমানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পানি ও অন্যান্য উপকরণের ব্যবহারও প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে দামাওর স্মার্ট কৃষির লক্ষ্য শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সক্ষম নতুন জাতের ফসলের পরীক্ষা, কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং সেই জ্ঞান স্থানীয় কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত।
হাইনানের ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত সুবিধার কারণে চীনের দক্ষিণাঞ্চলে বীজ গবেষণা ও নতুন জাতের ফসল পরীক্ষার কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। ‘নানফান’ বা দক্ষিণাঞ্চলভিত্তিক বীজ গবেষণার বৃহত্তর পরিসরের সঙ্গে হাইনানের কৃষি উন্নয়নের সম্পর্ক রয়েছে। দামাওর স্মার্ট গ্রিনহাউসেও নতুন জাতের ফসলের পরীক্ষামূলক চাষ করা হচ্ছে। এতে কৃষকের ভূমিকারও পরিবর্তন ঘটছে। তিনি শুধু জমিতে ফসল উৎপাদনকারী নন; আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার একজন অংশীদার। কৃষির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও নতুন দক্ষতা।
গবেষণাগারে কর্মরত মিজ ফেঙ এক প্রশ্নে বলেন, দামাওর অর্থনৈতিক মডেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক কৃষিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা। বিস্তীর্ণ ফলের বাগানে ড্রাগন ফল, প্যাশন ফল, তুঁত ও আমের চাষ হচ্ছে। পর্যটকেরা শুধু বাগান দেখেন না, নিজের হাতে ফল সংগ্রহের সুযোগও পান। ফলে একই জমি থেকে দুটি ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে সেখানে কৃষিপণ্য উৎপাদন হচ্ছে, অন্যদিকে সেই কৃষিজমিই পর্যটনের আকর্ষণে পরিণত হচ্ছে। পর্যটক বাগানে গিয়ে ফল সংগ্রহ করছেন, স্থানীয় কৃষি সম্পর্কে জানছেন, খাবার কিনছেন এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। অর্থাৎ কৃষিপণ্যের মূল্য শুধু বাজারে বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; কৃষির সঙ্গে একটি অভিজ্ঞতার মূল্যও যুক্ত হচ্ছে।


দামাওতে ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সাইক্লিং গ্রিনওয়ের একটি অংশও রয়েছে। পাহাড়, ফলের বাগান ও জলাধারের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া এই পথ পর্যটনের জন্য আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। নতুন বড় স্থাপনা নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান প্রাকৃতিক পরিবেশকে পর্যটন কর্মকাণ্ডের অংশ করা হয়েছে।
প্রকল্প কর্মকর্তা ওয়েই বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে পর্যটনের প্রভাব সবচেয়ে দৃশ্যমান হয়েছে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায়। গ্রামের কয়েকটি সাধারণ বসতবাড়ি সংস্কার করে হোমস্টেতে রূপ দেওয়া হয়েছে। যে বাড়ি আগে ছিল একটি পরিবারের আবাসন, পর্যটন বাড়ায় সেটিই এখন আয়ের উৎস। কোনো পরিবার পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করছে, কেউ স্থানীয় খাবার পরিবেশন করছে, কেউ পর্যটকদের গ্রাম ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে। অর্থাৎ পর্যটনের অর্থনৈতিক সুবিধা শুধু বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্থানীয় পর্যায়েও ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
একজন স্থানীয় গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে তাদের জীবিকা মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল। পর্যটনের প্রসারের সঙ্গে সারা বছর বিভিন্নভাবে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, আগে মানুষ গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র যেত, এখন মানুষ গ্রাম দেখতে আসে। একজন পর্যটক যখন গ্রামে থাকেন, খাবার খান, স্থানীয় পণ্য কেনেন কিংবা কোনো সেবা নেন, তখন তার ব্যয়ের একটি অংশ স্থানীয় অর্থনীতিতে থেকে যায়। একে কেন্দ্র করে কৃষক, গৃহস্থ, ছোট ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও সেবাদাতাদের জন্য নতুন বাজার তৈরি হয়েছে।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL