বাংলাদেশে বর্তমান সময়-আগস্ট ২০২৬, অর্থাৎ বর্ষাকাল/মৌসুমি ভারী বৃষ্টির সময়-মৎস্যচাষে রোগের ঝুঁকি সাধারণত বেশি থাকে। এর প্রধান কারণ হলো বৃষ্টিতে পানির তাপমাত্রা ও pH-এর ওঠানামা, চিংড়ি/ভেটকি ঘেরে হঠাৎ লবণাক্ততা কমে যাওয়া, DO কমে যাওয়া, আশেপাশের গড়িয়ে আসা পানি প্রবেশের কারণে জৈব ও অজৈব পদার্থ বৃদ্ধি এবং পুকুর/ঘেরের পানির গুণ-মানের ঘন ঘন পরিবর্তন। বাংলাদেশে মাছ ও চিংড়িচাষে রোগ বিশেষ করে বর্ষায় বেশি দেখা যাওয়ার প্রমাণ রয়েছে।
কার্প, তেলাপিয়া, পাঙ্গাস ও ক্যাটফিশ
|
সম্ভাব্য সমস্যা/রোগ |
বর্ষায় ঝুঁকি |
সাধারণ লক্ষণ |
|
EUS / Ulcer disease |
🔴 বেশি |
শরীরে লালচে দাগ, ক্ষত/আলসার |
|
Bacterial septicemia /Aeromoniasis |
🔴 বেশি |
লাল দাগ, রক্তক্ষরণ, পেট ফুলে যাওয়া, দুর্বলতা |
|
Fin & Tail rot |
🟠 মাঝারি-বেশি |
পাখনা/লেজ ক্ষয় |
|
Gill rot / Bacterial gill disease |
🟠 বেশি |
শ্বাসকষ্ট, পানির উপরিভাগে আসা |
|
Dropsy |
🟠 মাঝারি-বেশি |
পেট ফুলে যাওয়া, আঁশ উঁচু হয়ে যাওয়া |
|
Parasitic diseases |
🟠 বেশি |
অতিরিক্ত পিচ্ছিলভাব, ঘষাঘষি, অস্বাভাবিক সাঁতার |
|
Fungal infection |
🟠 বেশি |
ত্বকে তুলার মতো সাদাভাব (বিশেষত ক্ষতস্থানে) |
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মাছের রোগ পর্যালোচনাতেও EUS, dropsy, argulosis, gill rot, lernaeasis, red spot এবং tail/fin rot উল্লেখযোগ্য ।
এছাড়া চিংড়িতে বর্ষাকালে বিশেষভাবে দেখা যেতে পারে:
গলদা চিংড়ি |
বাগদা চিংড়ি |
|
এন্টেনা/ রোস্ট্রাম ভাঙ্গা (Antenna/rostrum breakage) |
হোয়াইট স্পট সিনড্রোম (WSD/WSSV) |
|
কালো-বাদামী দাগ (Black/brown spot) |
ভিব্রিওসিস (Vibriosis / bacterial disease) |
|
নরম খোলস বা আবরণ (Soft shell) |
ইএমএস/ এএইচপি (EMS/AHP) |
|
ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ (Bacterial infection) |
ব্ল্যাক গিল ডিজিজ (Black gill / gill damage) |
|
পরজীবী আক্রমণ (Parasitic problems) |
লালচে বা বিবর্ণতা (Red discoloration / reddish body) |
|
মোচনকালীন ধকল (Moulting-related stress) |
নরম খোলস বা আবরণ (Soft shell problem) |
বাংলাদেশের চিংড়িচাষে এন্টেনা/ রোস্ট্রাম ভাঙ্গা (broken antenna/rostrum) গলদার অন্যতম সাধারণ হিসেবে পাওয়া গেছে ।
তবে বর্ষাকালে বাগদার ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত:
- হোয়াইট স্পট সিনড্রোম (WSD/WSSV) 🔴
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাসঘটিত রোগ । বৃষ্টির পর পানির লবণাক্ততা ও হঠাৎ তাপমাত্রার হ্রাসজনিত শক এবং অক্সিজেন ঘাটতি হলে সুপ্ত সংক্রমণ আরো তীব্র হতে পারে। যদিও বাংলাদেশে WSSV-এর সংক্রমণ সারা বছরই থাকতে পারে- তাই এটিকে শুধু বর্ষার রোগ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। - ভিব্রিওসিস / ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ 🟠🔴
পরিবেশগত ধকল, জৈব পদার্থের প্রাচুর্যতা, পুকুরের তলদেশের খারাপ অবস্থা ও পানির গুণমানের অস্বাভাবিকরকম -এর সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ে। - আর্লি মরটালিটি/অ্যাকিউট হেপাটোপ্যানক্রিয়াটিক নেক্রোসিস (EMS/AHP-like syndrome) 🟠
বিশেষ করে মজুদ এর পর জুভেনাইল চিংড়ি-এ অলসতা, খাদ্যে অনীহা ও মৃত্যু দেখা যেতে পারে। কক্সবাজার-এর একটি গবেষণায় বর্ষাকালে EMS-like clinical signs বেশি দেখা গিয়েছিল। - ব্ল্যাক গিল ডিজিজ 🟠
অতিরিক্ত জৈব পদার্থের প্রাচুর্যতা, পুকুরের তলদেশের খারাপ অবস্থা ও microbial stress-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। - লালচে বা বিবর্ণতা (reddish body/appendage) 🟠
এটি কোন একটি নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়; ব্যাকটেরিয়াল স্ট্রেস, পরিবেশগত ধকল, জৈব পদার্থের প্রাচুর্যতা, অক্সিজেন ঘাটতি বা অন্য রোগজনিত অবস্থা -এর clinical sign হতে পারে। - নরম খোলস বা আবরণ/ মোচনকালীন ধকল 🟠
মিনারেলের ভারসাম্যহীনতা, পুষ্টির অভাব, লবণাক্ততার ওঠানামা ও পরিবেশগত ধকল -এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
কেন আগস্টে রোগের ঝুঁকি বেশি?
এ সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘রোগের চেয়ে পরিবেশগত ধকল আগে আসে।’

বিশেষ করে বাগদার ক্ষেত্রে বর্ষায় বৃষ্টির পর পানির লবণাক্ততা ও হঠাৎ তাপমাত্রার হ্রাসজনিত শক বা ধাক্কা -এর সঙ্গে মৃত্যুহার এবং রোগের প্রাদুর্ভাব -এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে “আগস্টে নিশ্চিতভাবে উপরিউক্ত রোগগুলোই হবে” এই হিসেবে দেখা উচিত নয়। একই ধরণের শারীরিক লক্ষণ একাধিক কারণেও হতে পারে। তবে রোগ বা সমস্যাগুলোর সমাধানে পুকুর/জলাশয় ব্যবস্থাপনায় একজন খামারীকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হয়।
ঝুঁকি এড়াতে করণীয়সমূহ
পুকুর ব্যবস্থাপনায় যথাযথভাবে এবং গুরুত্ব সহকারে সার্বক্ষণিক তদারকি করতে হবে। বৃষ্টির পানি যাতে পুকুরে প্রবেশ করতে পারে এমন ব্যবস্থা করতে হবে সম্ভব না হলে পাঁড়ের আশপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। পাড়ের ঢালু অংশে পোড়া চুন/পাথুরে চুন ছিটিয়ে রাখতে হবে। এতে করে ধুয়ে আসা পানির প্রাথমিক ক্ষতির পরিমান এড়ানো যায়। মাসে অন্তত দুইবার নির্দিষ্ট সময় অন্তর নিয়মিত ভিত্তিতে পানির প্যারামিটার তথা DO, pH, Temperature, TAN/NH₃, Nitrite, Alkalinity, Salinity (চিংড়িতে), Transparency এবং Bottom Condition দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘনঘন বৃষ্টি হলে সপ্তাহে একাধিকবারও দেখা যেতে পারে। এছাড়া নিয়মিত মাছের স্বাস্থ্য নমুনায়ন করাটাও জরুরি। প্যারামিটারগুলোর পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে। মাসে অন্তত একবার নিয়মিতভিত্তিতে পুকুর ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো ঠিক রাখার জন্য অ্যাকোয়া ব্যবস্থাপনা পণ্য হিসেবে- চুন, সার, জিওলাইট বা শোষক উপাদান (Aqua Hero Granular), লবণ, প্রোবায়োটিক (Aqua Master Powder), গ্যাস অপসারক (U-Ka God Solution) প্রয়োজন হলে পরজীবীনাশক, জীবাণুনাশক প্রয়োগ করতে হবে। খাদ্য ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা ও খাদ্যকে সহজে হজমযোগ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় নিউট্রিশনাল সাপ্লিমেন্টস প্রয়োগের পাশাপাশি লিভার ও কিডনির সাপোর্ট হিসেবে খাদ্যের সাথে প্রয়োজনীয় মাত্রায় লিভারটনিক (Liva Fresh Solution), গাট প্রোবায়োটিক্স (Gut Treat Powder), ভিটামিন-মিনারেল অ্যাডিটিভস (Profit Plus/Cavit-P/Active Plus) দেওয়া যেতে পারে। এতে করে খাদ্য অনীহা দূর হয়, রুচি ঠিক থাকে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকে। অতিরিক্ত দুর্যোগময় দিনগুলোতে খাবার প্রয়োগ থেকে বিরত থাকুন। ইমার্জেন্সি বা আপদকালীন পরিস্থিতিতে (অতিরিক্ত খারাপ পআবহাওয়া বা রোদহীন দিনগুলোতে) অক্সিজেন ঘাটতি কাটাতে বা পরিবেশীয় ধকলাবস্থা থেকে মাছ ও চিংড়ির মৃত্যুহার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ওষুধ (Oxy Bridge Tablet/Easy Plus Powder) মজুদ রাখতে হবে।
‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম ব্যবস্থা’- সর্বোপরি, দুর্যোগসম্ভাব্য এই আগস্ট মাসে মাছ ও চিংড়িচাষ থেকে একটি ভালো ও আশানুরূপ ফলন পেতে মৎস্যচাষি/খামারী ভাইদের আরও বেশি সতর্ক ও নিয়মিত পুকুর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন হলে ক্ষতির মাত্রা কমানো সহজতর হয়ে যায়, যা একজন আদর্শ মৎস্যচাষির কাছে প্রত্যাশিত।
রোগবালাইমুক্ত ও সফল মৎস্য চাষে কার্যকর ভূমিকা রাখছে ব্রীজ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের উৎপাদিত উন্নতমানের অ্যাকোয়া পণ্যসমূহ
লেখক : কৃষিবিদ প্রান্তর রায়, সহকারী ব্যবস্থাপক (মৎস্যচাষ), ব্রীজ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড
