- আয়কর রিটার্নে গোপন ১,৩৩৯টি দামি গাড়ি
- শত কোটি টাকার গাড়ির মালিক, কর দেন না ৪০৯ জন
- ল্যাম্বরগিনি-রোলস রয়েস-ফেরারিও ফাঁকির জালে
- এনবিআরের অভিযানের প্রস্তুতি
- আয় গোপনের নতুন কৌশল উদঘাটন করেছে গোয়েন্দারা
‘অনেক বড় কোম্পানি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি কর ফাঁকির পাশাপাশি অর্থপাচারেও জড়িত। শুধু আয়কর ফাঁকি নয়, এসব গাড়ির বিনিয়োগের উৎস সন্দেহজনক হওয়ায় তা আর্থিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে’-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক কর্মকর্তা
বাংলাদেশে বিলাসবহুল গাড়ির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। একদিকে মধ্যবিত্তরা স্বপ্নেও ভাবেন না এমন দামি গাড়ি, অন্যদিকে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এসব গাড়ি ব্যবহার করছেন, কিন্তু সরকারের কাছে কর দিচ্ছেন না বা গোপন করছেন এসব সম্পদের তথ্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) সম্প্রতি একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা গেছে, দেশে পাঁচ হাজার দুইশ’ আটাশি (৫২৮৮) বিলাসবহুল গাড়ির খোঁজ মিলেছে। কিন্তু এর মধ্যে বহু গাড়ির মালিক আয়কর রিটার্নে এসব গাড়ির কোনো উলে¬খই করেননি। এনবিআর সংশি¬ষ্টরা বলছেন, অনেক বড় কোম্পানি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি কর ফাঁকির পাশাপাশি অর্থপাচারেও জড়িত। শুধু আয়কর ফাঁকি নয়, এসব গাড়ির বিনিয়োগের উৎস সন্দেহজনক হওয়ায় তা আর্থিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব গাড়ির মধ্যে রয়েছে বিশ্বের নামকরা ব্র্যান্ডের গাড়ি ল্যাম্বরগিনি, ফেরারি, টেসলা, রোলস রয়েস, মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডবি¬উ, অডি, বেন্টলি, পোরশে, রেঞ্জ রোভার ও আরও অনেক। এসব গাড়ির দাম কয়েক কোটি থেকে শুরু করে ৩০-৪০ কোটি টাকার মতো। এমন গাড়ি কিনে কেউ কর দেয় না এটা শুধু অস্বাভাবিকই নয়, আইনের চোখে অপরাধও বটে। সিআইসির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৫২৮৮টি গাড়ির মধ্যে মাত্র ২৭১৯টি গাড়ি করদাতাদের রিটার্নে দেখানো হয়েছে। ১৩৩৯টি গাড়ির কোনো তথ্য রিটার্নে নেই। আর ৪০৯টি গাড়ির মালিক রিটার্নই দাখিল করেননি। ৪৪২টি গাড়ির মালিকানা হস্তান্তর হয়েছে, কিন্তু তা ঠিকভাবে রেকর্ডে নেই। ১৮৮টি গাড়ি রিটার্নে থাকলেও তাতে কর ফাঁকি রয়েছে কি না তা যাচাই চলছে। বাকি ১৪৮টি গাড়ি চলতি করবর্ষে কেনা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম কর অঞ্চল‑১ এ দেখা গেছে, ১৫২টি বিলাসবহুল গাড়ির মধ্যে ৭০টি গোপন রাখা হয়েছে। এর মধ্যে একটি বহুজাতিক রং কোম্পানির নামেই রয়েছে ২১টি গাড়ি, যেগুলো কর ফাইলে নেই। এছাড়া আরও অনেক কোম্পানি ও ব্যক্তিগত করদাতার গাড়ির তথ্য গোপনের প্রমাণ মিলেছে। শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি নয়, অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামেও রয়েছে কোটি টাকার গাড়ি, যেগুলোর বিনিয়োগ আয়কর ফাইলে দেখানো হয়নি। এদিকে, ঢাকার বিভিন্ন কর অঞ্চলে অনুসন্ধানে একই চিত্র দেখা গেছে। অনেক গাড়ি মালিক রিটার্নে গাড়ির কথা জানাননি, অনেকে রিটার্নই জমা দেননি। যেমন কর অঞ্চল‑১ এ ২২৬টি বিলাসবহুল গাড়ির মধ্যে ৬৩টি রিটার্নে গোপন, ১৮টি রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি। কর অঞ্চল‑৫ এ ২৭৫টির মধ্যে ৬৫টি গোপন, ১২টি রিটার্নই নেই। কর অঞ্চল‑১১-তে ১৬২টি গাড়ির মধ্যে মাত্র ৪৬টি রিটার্নে আছে, ৬১টি গোপন, ২৬টির কোনো রিটার্ন নেই।
এভাবে ঢাকার ২৫টি কর অঞ্চলে গাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। শুধু ঢাকা নয়, দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহর যেমন চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, কুমিল¬া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ সবখানেই বিলাসবহুল গাড়ির মালিকরা আয়কর ফাঁকি দিয়েছেন বলে প্রমাণ মিলেছে। এদিকে, এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনেক বড় কোম্পানি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি কর ফাঁকির পাশাপাশি অর্থপাচারেও জড়িত। শুধু আয়কর ফাঁকি নয়, এসব গাড়ির বিনিয়োগের উৎস সন্দেহজনক হওয়ায় তা আর্থিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তদন্তে দেখা গেছে, অনেক গাড়ি ‘রিজার্ভ’ বা ‘পুঞ্জিভূত মুনাফা’র চেয়ে বড় অঙ্কে কেনা হয়েছে, যা আয়কর আইনের ৬৭ (১২) ধারা অনুযায়ী অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবে গণ্য হবে এবং বাড়তি কর দিতে হবে।
এদিকে, ল্যাম্বরগিনি গাড়ির দাম ভারতে শুরু হয় প্রায় পাঁচ কোটি রুপি থেকে। বাংলাদেশে শুল্ক ও কর মিলিয়ে এর দাম প্রায় ৩০ কোটি টাকার বেশি। অথচ এই গাড়ি ব্যবহার করছেন এমন ব্যক্তিরা অনেক সময়ই রিটার্নে নিজেকে মধ্যবিত্ত দেখিয়ে থাকেন। একইভাবে রোলস রয়েস, ফেরারি, বেন্টলি, মাসেরাতি, টেসলার মতো গাড়ির দাম কয়েক কোটি টাকা হলেও, তাদের ক্রেতারা তা গোপন করছেন। বিআরটিএ ডাটাবেজ বিশে¬ষণ করে দেখা গেছে, এসব গাড়ির মালিকদের অনেকেই কোম্পানি, ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশন অথবা আত্মীয়স্বজনের নামে গাড়ি কিনেছেন। উদ্দেশ্য নিজেদের আয় ও সম্পদ গোপন রাখা। কর কর্মকর্তারা বলছেন, এখন থেকে এসব গোপন তথ্য খতিয়ে দেখা হবে, এবং যেখানে কর ফাঁকি প্রমাণিত হবে, সেখানে জরিমানা ও ফৌজদারি মামলাও হতে পারে।
জানা গেছে, এনবিআরের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর সার্কেলকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেসব গাড়ি রিটার্নে দেখানো হয়নি, সেগুলোর মালিকদের নোটিশ দিতে। যদি কোনো করদাতা জবাব না দেন বা ভুল তথ্য দেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ, এটা শুধু আয়কর আইন ভঙ্গ নয়, বরং রাষ্ট্রের রাজস্ব নীতির সঙ্গে সরাসরি সংঘাত। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ করদাতাদের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে। কারণ, যারা মাসে কিছু আয় করেও নিয়ম করে রিটার্ন জমা দেন, তারা প্রশ্ন তোলেন বড়লোকরা কি আইনের ঊর্ধ্বে? কর দেওয়ার ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান নিয়ম থাকা উচিত। রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, গরিবের জন্য আইন আর ধনীদের জন্য ছাড় এই ধারা চলতে থাকলে কর সংস্কারে কোনো উন্নয়ন হবে না।













