• প্রকাশ্যে ধূমপান, যত্রতত্র থুথু ও মলমূত্র ত্যাগে দূষিত হচ্ছে বাতাস
• কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তর-সংস্থার
• বিষাক্ত বাতাসে নানা রোগের সঙ্গে কমাচ্ছে দেশবাসীর আয়
আমরা এমন এক সিস্টেমের মধ্যে বসবাস করি যেখানে পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ, রাস্তাঘাটে কফ-থুথু ফেললে জরিমানার বিধান আছে। কিন্তু বাস্তবে এই আইনগুলোর কোনো প্রয়োগ নেই। ফলে, একজন ধূমপায়ী ইচ্ছেমতো যেখানে খুশি ধূমপান করতে পারে। চলতি পথে যেখানে ইচ্ছা সেখানে কফ-থুথু ফেলা যায়। ইচ্ছা হলে পথের ধারেই প্রকাশ্যে মল-মূত্র বিসর্জন করা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো সভ্য সমাজের সূচক হতে পারে না। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসি- না ঘোষিত স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য তো এটা মোটেই কোনো শুভ লক্ষণ নয়। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে অবশ্যই আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তা না হলে এই কুঅভ্যাসগুলোর মাধ্যমে বায়ুর সঙ্গে মিশে যাওয়া জীবাণু থেকে প্রাণ হারাবে বহু মানুষ। চিকিৎসা বিষয়ক জার্নাল দ্য ল্যানসেট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বে ১০টি মৃত্যুর মধ্যে একটির জন্য দায়ী ধূমপান। গবেষকদের মতে, দেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সি চার কোটি ১৩ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে তামাক সেবন করছে। তারা পরোক্ষভাবে ক্ষতি করছে প্রায় এক কোটি ১৫ লাখ মানুষের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীর ইতিহাসে একটি প্রাচীন রোগ যক্ষ্মা বা টিবি। জীবাণুবাহিত দীর্ঘস্থায়ী সংক্রামক এই ব্যাধিতে দেশে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে ১১৫ জন। আর সারা বছরে মৃত্যুবরণ করছে ৪২ হাজার মানুষ।
যক্ষ্মাগ্রস্ত ব্যক্তির হাঁচি ও কাশি থেকে নির্গত কফ বা থুথুর কণাগুলো অন্যের শরীরে ও বাতাসে জীবাণু ছড়ায়। এসব জীবাণু বাতাসে, শুষ্ক কফ ও থুথুতে এবং ধুলাবালিতে দীর্ঘকাল সক্রিয় থাকে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রথম ডিজিটাল ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, বাংলাদেশের ২০ লাখ ৪৪ হাজার মানুষ খোলা জায়গায় মলত্যাগ করেন। রংপুর বিভাগের ৭ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ খোলা জায়গায় মলত্যাগ করেন। রাজশাহী বিভাগে প্রায় ৩ লাখ ১৭ হাজার, চট্টগ্রাম বিভাগে প্রায় ২ লাখ ৯৯ হাজার, সিলেট বিভাগে ২ লাখ ৯৩ হাজার, ময়মনসিংহ বিভাগে ১ লাখ ৯০ হাজার, খুলনা বিভাগে ৬০ হাজার, বরিশাল বিভাগে ২৭ হাজার ও ঢাকা বিভাগে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ খোলা জায়গায় মল ত্যাগ করেন। বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩ এর ফলাফলে দেখা গেছে, পরিষেবার স্তরভেদে স্যানিটেশন সুবিধায় খানার (গৃহ) অভিগম্যতার ক্ষেত্রে মৌলিক অবস্থানে আছে ৬৯ দশমিক ছয় আট শতাংশ, সীমিত ২৩ দশমিক নয় পাঁচ শতাংশ, অনুন্নত পাঁচ দশমিক চার তিন শতাংশ, উন্মুক্ত স্থানে দশমিক নয় চার শতাংশ।
উন্নত টয়লেট সুবিধা ৯৩ দশমিক ছয় তিন শতাংশ, যৌথ টয়লেট ব্যবহারকারীর খানা ২৫ দশমিক নয় শতাংশ। সাবান ও পানিসহ হাত ধোয়ার সুবিধার ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাবান ও পানি উভয়ের উপস্থিতি আছে ৬৫ দশমিক ২ শতাংশ খানায়, শুধু সাবানের উপস্থিতি আছে এক দশমিক দুই শতাংশ খানায়, শুধু পানির উপস্থিতি আছে ১৬ দশমিক ২ শতাংশ খানায়, হাত ধোয়ার মতো ব্যবস্থা নেই ১৭ দশমিক চার শতাংশ খানায়। প্রকাশ্যে ধূমপান, যত্রতত্র মলমূত্রত্যাগ এবং ইচ্ছেমতো কফ, থুথু ফেলা দেশবাসীর জন্য বাতাসে এক বিষময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। এই অবস্থার পরিবর্তন প্রসঙ্গে সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও আইইডিসিআরের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমাদের যে উন্নয়ন এটা যদি সুষম হতো, এটা যদি শৃঙ্খলা মেনে হতো, আমাদের অন্যান্য যে প্রতিষ্ঠান আছে, আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, পারিবারিক গঠন এই সবগুলো জায়গায় যদি তার প্রতিফলন থাকত তাহলে হয়ত এগুলো এতটা হতো না। কিছু কিছু উড়িয়ে দেয়া যায় না। যেমন ধূমপান এখন সারা বিশ্বেই হয়। ইউরোপে আমি দেখেছি, স্টেশনের বাইরে আসলেই সবার হাতে হাতে সিগারেট। এটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কিন্তু অন্যগুলো করা যায়। যেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কফ না ফেলা, ময়লা না ফেলা এগুলো যদি আমাদের পারিবারিক শিক্ষাটা ভালো হতো তাহলে নিয়ন্ত্রণ করা যেত। আমার নাতির কথা বলতে পারি। আমার মেয়ে এমনভাবে শিখিয়েছে যে, সে কিছুতেই কোথাও বাইরে ময়লা ফেলবে না। বাইরে থেকে এসে সে বেসিনে সাবান দিয়ে হাত ধুবে। এগুলো সে ছোটবেলা থেকেই শিখছে। তার মানে পারিবারিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, আমাদের সামাজিক কিছু প্রতিষ্ঠান আছে। যেমন পাড়াভিত্তিক মুরুব্বিরা, এদের ভূমিকা যদি থাকত কিংবা ধরেন পৌরসভা, তারা যদি ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারত তাহলে এগুলো কম হত। এই ময়লাগুলো হওয়া আসলেই ভালো নয়। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমরা তো কোভিডে প্রমাণ পেয়েছি। এরচেয়ে বড় প্রমাণ তো আর দরকার নেই। যেখানে সেখানে কফ-থুথু ফেললে বা নিয়ম না মেনে চললে তার প্রতিফলটা কি হয়? আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এখন যেটা উদ্যোগ নেয়া দরকার সেটা হলো আমরা হয়ত আমাদের অর্থনৈতিক সূচকে উন্নত দেশ হবো, ভাল দেশ হবো কিন্তু এই জায়গাগুলোতে আমরা অনেক সাফার করব। আমাদের সুস্বাস্থ্যের অধিকারী একটা জাতি পাওয়া কঠিন হবে। সবমিলিয়ে এটা আসলে ভালো না। বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, থুথু ফেলা, কফ ফেলা বন্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তেমন কিছু করতে পারবে না। এগুলো করতে হবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে। তিনি সিটি কর্পোরেশন, ইউনিয়ন কাউন্সিল, পৌরসভা এদের এই কাজ করতে হবে। ধূমপান যদি বন্ধ করতে হয় তাহলে সিগারেট যদি নিষিদ্ধ করা যায়, তামাক উৎপাদন বন্ধ করা যায় তাহলে এটা সম্ভব হবে। কিন্তু আমি যেটা দেখেছি যদিও আমি এ বিষয়ে এক্সপার্ট না, তবে সম্ভবত তারা ভাবেন সিগারেট খাওয়া হিরোইন খাওয়ার চেয়ে ভালো। তারা হয়ত ভাবেন সিগারেট বন্ধ হয়ে গেলে তারা এমন নেশায় আসক্ত হবেন। সিগারেট নিয়ে আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যে কাজ আছে তা নিয়ে আমি সবসময় অভিযোগ করতাম। আলোচনা হত সিগারেটে ট্যাক্স বসানো যায় কি না। তখন আমি বলতাম, যদি সরকার চায় যে তামাক বাংলাদেশে চাষ হবে না আর যদি আমরা না আমদানি করি তাহলেই তো হয়ে যায়। এগুলো আমার কাছে মনে হতো নামকাওয়াস্কে কাজ এবং আমি এগুলো কখনো যেতাম না। সিঙ্গাপুরের কথা যদি আমরা বলি, তাদের স্থানীয় সরকার এত স্ট্রং কেউ থুথু ফেললে তার একশ ডলার জরিমানা হবে। এরকম যদি সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নেয় তাহলে সম্ভব। সিটি করপোরেশন সম্ভবত এই কারণে উদ্যোগ নেয় না যে, তারা নিজেরা আসলে তাদের যে কাজটুকু করা ধূলোবালি মুক্ত রাস্তা রাখা, অপরিচ্ছন্ন রাস্তা না রাখা, এগুলো পারে না বলে তারা জনগণকে বাধ্য করে না। যদি জনগণকে বাধ্য করা যায়, যদি স্থানীয় সরকার থেকে আইন করা যায় তাহলে এগুলো থেকে উন্নতি করা সম্ভব। ধূমপান নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এ সংক্রান্ত ক্যান্সারও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ। তিনি দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ধূমপান তো দেশের বিশাল অংশের মানুষ করে। ধুমপান বাদ দিলে তো ভালো।
কাশির ক্ষেত্রে শিষ্টাচারগুলো মেনে চলা উচিত। যেখানে সেখানে ময়লা করাও ঠিক না। এগুলোর কারণে বায়ুদূষণও হয়। আমাদের সবারই এই বিষয়গুলো মেনে চলা উচিত। তবু অনেকেই মেনে চলে না। রাস্তাঘাটে যত্রতত্র প্রস্রাব-পায়খানা করাও খুব বড় সমস্যা। এটা শহরে বেশি হয়। এটার জন্য বিভিন্ন জায়গায় পাবলিক টয়লেট থাকা দরকার। যদিও সিটি কর্পোরেশন কিছু কিছু জায়গায় পাবলিক টয়লেট স্থাপন করেছে। আরও যদি এগুলো করতে পারে তাহলে হয়ত অবস্থার উন্নতি হবে। শুধু ঢাকা বলে না, দেশের বড় বড় শহরগুলোতে আরও পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা উচিত। তাহলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে। এখনও বাংলাদেশে প্রচুর যক্ষ্মা রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। কফ, থুথু নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এর থেকে মুক্তি মেলা সম্ভব কি না এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরিবেশ উন্নত হলেই এগুলোর অবস্থারও উন্নতি হবে। আমাদের ধূমপানটা নিয়ন্ত্রণ করা খুব জরুরি। ধূমপান নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এ সংক্রান্ত ক্যানসারও নিয়ন্ত্রণ হবে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশে এখন ধূমপানের হার ব্যাপক। বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ ধূমপান করে। আইনে যেটা বলা আছে, যে সব পাবলিক প্লেস আছে সে সব স্থানে যেন ধূমপান না করা হয়। ধূমপান নিষেধ। পাবলিক প্লেসগুলো সরকার ঠিক করে দিয়েছে। কোনগুলো পাবলিক প্লেস। এখানে ধূমপান করা আইনত দণ্ডনীয়। এগুলোর জরিমানাও আছে। ৩০০ টাকা করে দিতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আইনের প্রয়োগটা আমরা দেখি না। আর আইনে পাবলিক প্লেস না হলে ধূমপান করতে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু যে জায়গাটা পাবলিক প্লেস সেই জায়গাটায় ধূমপান করার ব্যাপারে বিরত থাকা উচিত। এটা আসলে ক্ষতি করছে। আইনের প্রয়োগ যদি না থাকে তাহলে পাবলিক প্লেস শতভাগ ধূমপানমুক্ত রাখাটা সম্ভব হবে না। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা যদি মানুষের না জন্মায় তাহলে অবশ্য আইনের প্রয়োগ করাটা কঠিন। তবে, অন্তত পাবলিক প্লেসগুলোতে যেমন- পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যেন ধূমপান না করা হয় সেটা কঠিনভাবে মোবাইল কোর্ট ইত্যাদির মাধ্যমে দেখা দরকার। আমাদের দেশে এই আইনটা অনেক বছর ধরে আছে। তবু আমরা এই আইনটার প্রয়োগ সেভাবে দেখছি না। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমাদের দেশের লোকজন আইন ভাঙাটা অতি স্বাভাবিক মনে করে এবং অন্য মানুষের যে অসুবিধা হচ্ছে সেটাকে অত গুরুত্ব দেয় না। স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, যদি সচেতন নাগরিক না হয়, আদৌ যদি এগুলো বিষয়ে ওরিয়েন্টেশন না করা হয়, তাহলে এগুলো চলবেই। আমাদের অবশ্যই বিদ্যালয় থেকে এই সচেতনতা তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের যদি ঐভাবে সচেতন করা যায়, তুমি যেখানে সেখানে থুথু ফেলবে না, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবে না, কলার খোসা ফেলবে না। কিন্তু সেটা তো আমরা তাদের শেখাইনি। এটাতো হেলথ এডুকেশনের একটা অংশ। পার্সোনাল হেলথ এবং কমিউনিটি হেলথ। ছোটবেলা থেকেই আপনাকে ওরিয়েন্টেড করতে হবে। বড় হলে তো অভ্যাস হয়ে যায়। তখন তো আর সে ঠিক হয়না। সুতরাং এগুলোকে শিক্ষা কার্যক্রমে আনতে হবে। তাছাড়া, এগুলো থেকে পরিত্রাণ মিলবে না। দরিদ্রতার সঙ্গে, সচেতনতার সঙ্গে, শিক্ষার সঙ্গে এটার সম্পর্ক আছে। আর রাষ্ট্র এটা ঠিক করতে ইচ্ছাপোষণ করে কি না। আপনি যখন ইউরোপে যান, সিঙ্গাপুরে যান তখন এই কাজগুলো আপনি করেন না। সুতরাং এইখানে করছেন। ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্টে এগুলো। আমাদের এখনও সভ্য সমাজে পৌঁছাতে সময় লাগবে। রাতারাতি এগুলো পরিবর্তন করা যাবে না। যদি সেভাবে চিন্তা না করেন। কোনো সামাজিক সংগঠনও তো এটা করে না। আগের দিনে গ্রামে-গঞ্জে ক্লাব করত শিক্ষিত সচেতন মানুষ থাকত। এমনকি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ক্লাব থাকত। কিন্তু এখন মানুষ আর এগুলোর কোন ধার ধারে না। এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সচেতনতামূলক কার্যক্রম আছে। তারা জারিগানের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করে। স্থানীয় সরকার এটা নিয়ে কাজ করতে পারে। এখন কে আসলে এটা নিয়ে কাজ করবে তা জানি না। তবে, এগুলো নিয়ে কাজ করাতে হবে। ধূমপান বিরোধী আইনে যা আছে। দেশ থেকে ধূমপান নির্মূলে প্রথমে আন্তর্জাতিক আইনে স্বাক্ষরকারী দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু বিশ্বের প্রথম ধূমপানমুক্ত দেশ ভুটান। বাংলাদেশ এখনও এই লক্ষ্য থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ এ ধূমপানের শাস্তি ৫০ টাকা জরিমানা করা হয়। পরে ২০১৩ সালে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনের সংশোধনী আনা হয়। সেই সংশোধনীতে জনসমাগমস্থলে ধূমপানের সাজার অর্থ ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়। একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে তিনি দ্বিগুণ হারে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। আইনে সিগারেটের দোকান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ২০ গজ দূরে থাকতে হবে বলে বলা হয়েছে। আইনের ২(চ) ধারা অনুসারে পাবলিক প্লেস বলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস; গ্রন্থাগার, লিফট, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, আদালত, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, নৌবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল, প্রেক্ষাগৃহ, প্রদর্শনী কেন্দ্র, থিয়েটার হল, বিপণিবিতান, রেস্টুরেন্ট, পাবলিক টয়লেট, শিশুপার্ক, মেলা বা পাবলিক পরিবহনে আরোহণের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সারি, জনসাধারণের সম্মিলিত ব্যবহারের স্থান বোঝায়। থুথু প্রতিরোধে আইন যা বলে বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এর ৬০(১) ধারায় ‘আবর্জনা বাক্স ও পিকদানী’ শিরোনামে উল্লেখ আছে, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের সুবিধাজনক স্থানে পর্যাপ্ত সংখ্যক আবর্জনা ফেলার বাক্স ও পিকদানী থাকতে হবে এবং সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।’ ৬০ (২) ধারায় উল্লেখ আছে, ‘কোনও প্রতিষ্ঠানের আঙিনার মধ্যে কেউ বাক্স ও পিকদানী ছাড়া ময়লা বা থুথু ফেলতে পারবেন না। ৬০(৩) ধারায় উল্লেখ আছে, এই বিধান লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’ এছাড়া রাজশাহী মহানগরী পুলিশ আইন-১৯৯২ এর ৮৬ ধারায় উল্লেখ আছে, কোনও ব্যক্তি সরকারি বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নোটিশ অমান্য করে ধূমপান করলে বা থুথু ফেললে তাকে একশ’ টাকা জরিমানা করা যাবে। তবে সিলেট মহানগরী পুলিশ আইন-২০০৯ ও বরিশাল মহানগরী পুলিশ আইন-২০০৯ অনুযায়ী তিনশ’ টাকা জরিমানা করা যায়। দ্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স, দ্য চিটাগং মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স এবং দ্য খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্সে একশ’ টাকা জরিমানা করার বিধান আছে। বিদেশের আইনগুলো: সৌদিআরবে রাস্তায় থুথু ফেললে ১০০ থেকে ১৫০ রিয়াল জরিমানা করা হয়। ভারতের গঙ্গায় বর্জ্য বা থুথু ফেললে তিন বছর কারাদণ্ড বা ১০ হাজার রুপি জরিমানা করা হয়। দেশটির মুম্বাইয়ের রাস্তায় থুথু বা পানের পিক ফেলার দায়ে পাঁচ হাজার রুপি জরিমানা ও ১ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত সরকারি দফতর ও রাস্তা ঝাড় দিতে হবে। সিঙ্গাপুরে রাস্তায় কফ থুথু ফেললে ১ হাজার ডলার জরিমানা দিতে হয়। হাইকোর্টের নিদের্শনা পাবলিক প্লেসে ধূমপান বন্ধ ও যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ এবং থুথু, কফ ফেলা বন্ধে আইন অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে গত বছর নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মাহবুব উল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মো. গোলাম রহমান ভূঁইয়া। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আবুল কালাম খান দাউদ। পাবলিক প্লেসে ধূমপান বন্ধ ও যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়। রিটে পাবলিক প্লেসে ধূমপান বন্ধ ও যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ বন্ধে প্রচলিত পুলিশ অধ্যাদেশ আইন বাস্তবায়নের নির্দেশনা চাওয়া হয়। এছাড়া সার্বজনীন থুথু ও কফ ফেলাবিরোধী আইন এবং কোড প্রণয়ন করার আর্জি জানানো হয় রিটে। মানবাধিকার ও সমাজ উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. গোলাম রহমান ভূঁইয়া জনস্বার্থে এ রিট করেন।













