০৩:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কর্মীদের কাছেও নিরাপদ নয় ব্যাংকের টাকা

  • হরহামেশা ঘটছে গ্রাহকের টাকা নিয়ে ‘উধাও’ হওয়ার ঘটনা
  • জড়িত ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী
  • উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে লাপাত্তা হওয়ার ঘটনা বেশি 

গ্রাহকের আমানত তছরুপের ঘটনা ব্যাংক কখনোই দায় এড়াতে পারে না ড. আহসান এইচ মনসুর অর্থনীতিবিদ

মুদ্রার প্রচলন হওয়ার পরেই ব্যাংকিং খাতের জন্ম। আর্থিক নিরাপত্তা ও সহজ লেনদেনের লক্ষ্যেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। অথচ বর্তমানে নানা কেলেঙ্কারি, অস্বচ্ছতা ও অব্যবস্থাপনায় আস্থা হারাচ্ছে ব্যাংকিং খাত। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকের টাকা ‘নয়ছয়’, ‘উধাও’, ‘লাপাত্তা’ হওয়ার ঘটনাগুলো বেশি শোনা যাচ্ছে। ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছেই গ্রাহকের আমানত এখন নিরাপদ নয়। রক্ষকই এখন ভক্ষকে রূপ নিয়েছে। এতে ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে বহুলাংশে। গ্রাহকের টাকা আত্মসাতে জড়িত কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা- কর্মচারী ও এজেন্ট কর্মীরা।
সম্প্রতি বগুড়া জেলার আদমদীঘির চাঁপাপুর ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট আউটলেটের শতাধিক গ্রাহকের জমাকৃত আমানতের দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়েছেন ক্যাশিয়ার সুজন রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা। বিষয়টি জানাজানির পর আমানতকারীরা ব্যাংকে এসে ভিড় জমাতে শুরু করেন এবং টাকা ফেরতের দাবি জানান। এদিকে গ্রাহকদের টাকা ফেরতের আশ্বাস দিয়ে দিন পার করছেন ব্যাংকের এজেন্ট কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, ৫ বছর আগে আউটলেটটি চালু করেন গোবিন্দপুর গ্রামের নুরুল ইসলাম। বর্তমান আউটলেটটির গ্রাহক সংখ্যা সাড়ে ৩ হাজার।

আউটলেটটিতে প্রবাসীদের পাঠানো টাকা আর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জমা রাখা টাকার পরিমাণ বেশি ছিল। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আউটলেটে টাকা জমা এবং উত্তোলনের পর গ্রাহককে প্রিন্টেট ভাউচার দেওয়ার নিয়ম থাকলেও সেখানকার দায়িত্বরত ক্যাশিয়ার সুজন রহমান তা কখনোই  দিতেন না। ভাউচারের বদলে তিনি স্টেটমেন্টের স্থিতির অংশ ছিঁড়ে ফেলে উপরের অংশে টাকার পরিমাণ হাতে লিখে দিতেন। শুধু তাই নয়, ক্যাশিয়ার সুজন অতি মুনাফার লোভ দেখিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে অ্যাকাউন্টে জমা না দিয়ে নিজের আয়ত্তে রাখতেন। চলতি বছরের ২৩ মে হঠাৎ ক্যাশিয়ার সুজন সপরিবারে নিরুদ্দেশ হন। এরপর ২৬ মে ব্যাংকের কয়েকজন গ্রাহক সঞ্চয়ী হিসাব থেকে টাকা তুলতে এসে দেখেন তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা নেই। এরপর সুজনের প্রতারণার বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে শতাধিক গ্রাহক টাকা ফেরত নিতে এসে দেখেন তাদের হিসাব নম্বরে জমাকৃত টাকা নেই। এর পরিমাণ দাঁড়ায় দেড় কোটি টাকায়। মাহফুজা বেগম নামের এক ভুক্তভোগী গ্রাহক জানান, ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর জন্য ওই ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ৫ লাখ টাকা রেখেছিলাম। গত সোমবার ছেলের ফ্লাইট ছিল। তার আগের দিন রোববার ব্যাংকে টাকা তুলতে গিয়ে দেখি অ্যাকাউন্ট শূন্য। ছেলের আর বিদেশ যাওয়া হলো না।
ফাতেমা নামের আরেক ভুক্তভোগী গ্রাহক জানান, আমি টাকা জমা দিতে আসলেও আমার ফিঙ্গার নেওয়া হতো। জমার জন্য কেন ফিঙ্গার দিতে হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে ক্যাশিয়ার সুজন বলেছিলেন- টাকার কোনো নড়চড় যেন না হয় এজন্যই ফিঙ্গার নেওয়া হচ্ছে। এরপর তিনি আমার হাতে একটি সিলিপ ধরিয়ে দিয়ে বিদায় দেন। এখন বুঝতে পারছি আমার দেওয়া ফিঙ্গারের মধ্যেমেই অ্যাকাউন্ট নম্বরে জমাকৃত টাকাগুলো তিনি উত্তোলন করে নিজে পকেটে নিতেন। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ফরিদপুরের দুই উপজেলা থেকে একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি ফরিদপুরের ভাঙা উপজেলার সীমান্তবর্তী নগরকান্দা উপজেলার ঝাটুরদিয়া বাজার মিডল্যান্ড এজেন্ট ব্যাংক শাখায় এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী আলিয়া বেগমের স্বামী আজিজুল হক জানান, আমার স্ত্রীর মিডল্যান্ড ব্যাংকে ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা জমা রেখেছে। এখন ব্যাংকের সব লোকজন পলাতক রয়েছে। তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ। টাকা খোয়া গেলে আমরা পথে বসে যাব।
এদিকে গত এপ্রিলে চাঁদপুরে পূবালী ব্যাংকের নতুন বাজার শাখার ব্যবস্থাপক শ্রীকান্ত নন্দী কয়েক কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন। যদিও পরে ব্যবস্থাপকসহ ৮ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

চলতি বছর বরিশালের একজন বাসিন্দা অভিযোগ করছেন যে, সেখানকার একটি বেসরকারি ব্যাংকে তার হিসেব থেকে ৯ লাখ টাকা ‘উধাও’ হয়ে গেছে। এ নিয়ে ব্যাংকের কাছে অভিযোগ দেওয়া হলেও পুরো বিষয়টি উল্টো তার উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এর আগে গত বছর গ্রাহকের ৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়েছেন জনতা ব্যাংক শাহজাদপুর শাখার এক পিওন। চলতি বছরের মার্চে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার জনতা ব্যাংকের ভল্ট থেকে ৫ কোটি টাকা উধাও হয়েছে- এখন খবর পাওয়া যায়। হরহামেশা এসব ঘটনা ঘটলেও অনেকটা উদাসীন দেখা গেছে এসব ব্যাংক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনার দায় ব্যাংক কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আস্থা হারাবে ব্যাংকগুলো। গ্রাহকদের টাকা অবশ্যই গ্রাহকদের ফিরিয়ে দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে এমন নৈরাজ্যে ঘটনা সম্পর্কে বেসরকারি একটি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, এসব ঘটনায় আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। গ্রাহকরা তাদের টাকা জমা দেওয়ার প্রমাণ দেখাতে পারলে সেটার দায়- দায়িত্ব অবশ্যই ব্যাংক নিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংক হিসেবে লেনদেনের ক্ষেত্রে যাতে কোনো জালিয়াতির ঘটনা না ঘটে, কিংবা গ্রাহকের স্বার্থহানি না হয় সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু নীতিমালা করেছে। টাকা লেনদেন করার ক্ষেত্রে ব্যাংক কোনো ধরনের নিয়ম অনুসরণ করলে এবং গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হলে সেটির প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু বিধি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্ট এবং ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি এন্ড
কাস্টমার সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট এসব নির্দেশনা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, একটি স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সেবার মানোন্নয়ন এবং গ্রাহকদের স্বার্থ
সংরক্ষণের জন্য তারা যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। সেজন্য নানা নিয়মকানুন তৈরি করা হয়েছে। কোনো ব্যাংক সম্পর্কে যদি গ্রাহকের অভিযোগ থাকে তাহলে
বাংলাদেশের নম্বর ১৬২৩৬ নম্বরে ডায়াল করে অভিযোগ জানাতে পারেন।
এছাড়া ই- মেইল করে কিংবা চিঠি দিয়ে অভিযোগ দায়ের করার সুযোগ আছে। এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড.
আহসান এইচ মনসুর বলেন, একজন কর্মকর্তা বা ব্যাংকের এজেন্ট তো ব্যাংকই নিয়োগ দিয়ে থাকে। ব্যাংক কখনোই এর দায় এড়াতে পারে না। ব্যাংক কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ব্যাংকিংয়ের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে না। গুটিকয়েক অসাধু ব্যক্তির জন্য এই ব্যাংকিং বন্ধ হতে পারে না।

কর্মীদের কাছেও নিরাপদ নয় ব্যাংকের টাকা

আপডেট সময় : ০৭:৩০:২৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ জুন ২০২৪
  • হরহামেশা ঘটছে গ্রাহকের টাকা নিয়ে ‘উধাও’ হওয়ার ঘটনা
  • জড়িত ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী
  • উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে লাপাত্তা হওয়ার ঘটনা বেশি 

গ্রাহকের আমানত তছরুপের ঘটনা ব্যাংক কখনোই দায় এড়াতে পারে না ড. আহসান এইচ মনসুর অর্থনীতিবিদ

মুদ্রার প্রচলন হওয়ার পরেই ব্যাংকিং খাতের জন্ম। আর্থিক নিরাপত্তা ও সহজ লেনদেনের লক্ষ্যেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। অথচ বর্তমানে নানা কেলেঙ্কারি, অস্বচ্ছতা ও অব্যবস্থাপনায় আস্থা হারাচ্ছে ব্যাংকিং খাত। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকের টাকা ‘নয়ছয়’, ‘উধাও’, ‘লাপাত্তা’ হওয়ার ঘটনাগুলো বেশি শোনা যাচ্ছে। ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছেই গ্রাহকের আমানত এখন নিরাপদ নয়। রক্ষকই এখন ভক্ষকে রূপ নিয়েছে। এতে ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে বহুলাংশে। গ্রাহকের টাকা আত্মসাতে জড়িত কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা- কর্মচারী ও এজেন্ট কর্মীরা।
সম্প্রতি বগুড়া জেলার আদমদীঘির চাঁপাপুর ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট আউটলেটের শতাধিক গ্রাহকের জমাকৃত আমানতের দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়েছেন ক্যাশিয়ার সুজন রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা। বিষয়টি জানাজানির পর আমানতকারীরা ব্যাংকে এসে ভিড় জমাতে শুরু করেন এবং টাকা ফেরতের দাবি জানান। এদিকে গ্রাহকদের টাকা ফেরতের আশ্বাস দিয়ে দিন পার করছেন ব্যাংকের এজেন্ট কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, ৫ বছর আগে আউটলেটটি চালু করেন গোবিন্দপুর গ্রামের নুরুল ইসলাম। বর্তমান আউটলেটটির গ্রাহক সংখ্যা সাড়ে ৩ হাজার।

আউটলেটটিতে প্রবাসীদের পাঠানো টাকা আর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জমা রাখা টাকার পরিমাণ বেশি ছিল। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আউটলেটে টাকা জমা এবং উত্তোলনের পর গ্রাহককে প্রিন্টেট ভাউচার দেওয়ার নিয়ম থাকলেও সেখানকার দায়িত্বরত ক্যাশিয়ার সুজন রহমান তা কখনোই  দিতেন না। ভাউচারের বদলে তিনি স্টেটমেন্টের স্থিতির অংশ ছিঁড়ে ফেলে উপরের অংশে টাকার পরিমাণ হাতে লিখে দিতেন। শুধু তাই নয়, ক্যাশিয়ার সুজন অতি মুনাফার লোভ দেখিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে অ্যাকাউন্টে জমা না দিয়ে নিজের আয়ত্তে রাখতেন। চলতি বছরের ২৩ মে হঠাৎ ক্যাশিয়ার সুজন সপরিবারে নিরুদ্দেশ হন। এরপর ২৬ মে ব্যাংকের কয়েকজন গ্রাহক সঞ্চয়ী হিসাব থেকে টাকা তুলতে এসে দেখেন তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা নেই। এরপর সুজনের প্রতারণার বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে শতাধিক গ্রাহক টাকা ফেরত নিতে এসে দেখেন তাদের হিসাব নম্বরে জমাকৃত টাকা নেই। এর পরিমাণ দাঁড়ায় দেড় কোটি টাকায়। মাহফুজা বেগম নামের এক ভুক্তভোগী গ্রাহক জানান, ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর জন্য ওই ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ৫ লাখ টাকা রেখেছিলাম। গত সোমবার ছেলের ফ্লাইট ছিল। তার আগের দিন রোববার ব্যাংকে টাকা তুলতে গিয়ে দেখি অ্যাকাউন্ট শূন্য। ছেলের আর বিদেশ যাওয়া হলো না।
ফাতেমা নামের আরেক ভুক্তভোগী গ্রাহক জানান, আমি টাকা জমা দিতে আসলেও আমার ফিঙ্গার নেওয়া হতো। জমার জন্য কেন ফিঙ্গার দিতে হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে ক্যাশিয়ার সুজন বলেছিলেন- টাকার কোনো নড়চড় যেন না হয় এজন্যই ফিঙ্গার নেওয়া হচ্ছে। এরপর তিনি আমার হাতে একটি সিলিপ ধরিয়ে দিয়ে বিদায় দেন। এখন বুঝতে পারছি আমার দেওয়া ফিঙ্গারের মধ্যেমেই অ্যাকাউন্ট নম্বরে জমাকৃত টাকাগুলো তিনি উত্তোলন করে নিজে পকেটে নিতেন। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ফরিদপুরের দুই উপজেলা থেকে একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি ফরিদপুরের ভাঙা উপজেলার সীমান্তবর্তী নগরকান্দা উপজেলার ঝাটুরদিয়া বাজার মিডল্যান্ড এজেন্ট ব্যাংক শাখায় এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী আলিয়া বেগমের স্বামী আজিজুল হক জানান, আমার স্ত্রীর মিডল্যান্ড ব্যাংকে ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা জমা রেখেছে। এখন ব্যাংকের সব লোকজন পলাতক রয়েছে। তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ। টাকা খোয়া গেলে আমরা পথে বসে যাব।
এদিকে গত এপ্রিলে চাঁদপুরে পূবালী ব্যাংকের নতুন বাজার শাখার ব্যবস্থাপক শ্রীকান্ত নন্দী কয়েক কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন। যদিও পরে ব্যবস্থাপকসহ ৮ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

চলতি বছর বরিশালের একজন বাসিন্দা অভিযোগ করছেন যে, সেখানকার একটি বেসরকারি ব্যাংকে তার হিসেব থেকে ৯ লাখ টাকা ‘উধাও’ হয়ে গেছে। এ নিয়ে ব্যাংকের কাছে অভিযোগ দেওয়া হলেও পুরো বিষয়টি উল্টো তার উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এর আগে গত বছর গ্রাহকের ৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়েছেন জনতা ব্যাংক শাহজাদপুর শাখার এক পিওন। চলতি বছরের মার্চে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার জনতা ব্যাংকের ভল্ট থেকে ৫ কোটি টাকা উধাও হয়েছে- এখন খবর পাওয়া যায়। হরহামেশা এসব ঘটনা ঘটলেও অনেকটা উদাসীন দেখা গেছে এসব ব্যাংক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনার দায় ব্যাংক কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আস্থা হারাবে ব্যাংকগুলো। গ্রাহকদের টাকা অবশ্যই গ্রাহকদের ফিরিয়ে দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে এমন নৈরাজ্যে ঘটনা সম্পর্কে বেসরকারি একটি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, এসব ঘটনায় আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। গ্রাহকরা তাদের টাকা জমা দেওয়ার প্রমাণ দেখাতে পারলে সেটার দায়- দায়িত্ব অবশ্যই ব্যাংক নিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংক হিসেবে লেনদেনের ক্ষেত্রে যাতে কোনো জালিয়াতির ঘটনা না ঘটে, কিংবা গ্রাহকের স্বার্থহানি না হয় সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু নীতিমালা করেছে। টাকা লেনদেন করার ক্ষেত্রে ব্যাংক কোনো ধরনের নিয়ম অনুসরণ করলে এবং গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হলে সেটির প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু বিধি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্ট এবং ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি এন্ড
কাস্টমার সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট এসব নির্দেশনা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, একটি স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সেবার মানোন্নয়ন এবং গ্রাহকদের স্বার্থ
সংরক্ষণের জন্য তারা যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। সেজন্য নানা নিয়মকানুন তৈরি করা হয়েছে। কোনো ব্যাংক সম্পর্কে যদি গ্রাহকের অভিযোগ থাকে তাহলে
বাংলাদেশের নম্বর ১৬২৩৬ নম্বরে ডায়াল করে অভিযোগ জানাতে পারেন।
এছাড়া ই- মেইল করে কিংবা চিঠি দিয়ে অভিযোগ দায়ের করার সুযোগ আছে। এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড.
আহসান এইচ মনসুর বলেন, একজন কর্মকর্তা বা ব্যাংকের এজেন্ট তো ব্যাংকই নিয়োগ দিয়ে থাকে। ব্যাংক কখনোই এর দায় এড়াতে পারে না। ব্যাংক কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ব্যাংকিংয়ের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে না। গুটিকয়েক অসাধু ব্যক্তির জন্য এই ব্যাংকিং বন্ধ হতে পারে না।