০৫:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে হঠাৎ তৎপর দুদক

  •  আতঙ্কে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী
  • সাদ মুসা গ্রুপের এমডিকে স্ত্রীসহ দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
  •  উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রারের অবৈধ সম্পত্তি-নগদ অর্থ জব্দ

দেশের যেখানেই অনিয়ম-দুর্নীতি, সেখানেই ব্যবস্থা। এমন জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে এবার জোরেশোরে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরই মধ্যে তার প্রতিফলনও ঘটতে শুরু করেছে। হঠাৎ করেই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দুদকের এমন তৎপরতায় এক রকম ঘুম হারাম হওয়ার উপক্রম সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তাদের। সংস্থার অভিযোগ কেন্দ্রে (হটলাইনে) অভিযোগ আসামাত্রই অভিযান চালাচ্ছে দুদক। এ অভিযানে হাতেনাতে ধরাও পড়ছে রাঘববোয়ালরা। সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক শীর্ষ এক কর্মকর্তাকে সপরিবারে দুদক কার্যালয়ে তলব করায় ফের আলোচনায় উঠে এসেছে দুর্নীতি-অনিয়মের নানান চিত্র। দুদকের অনুসন্ধান টিমের শুদ্ধি অভিযানে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী মহলেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা দেখে অনুসন্ধানে নামার কথা থাকলেও এখনো তা প্রকাশ্যে রূপ ধারণ করেনি। টিআইবি বলছে, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই নয়, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এবং ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মধ্যেও দুর্নীতিবাজরা ঘাপটি মেরে রয়েছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবে রূপ ধারণ করতে হলে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতি জরুরি। দুদক বলছে, দুদকের হটলাইনসহ যেকোনো উপায়ে অভিযোগ এলেই তার অনুসন্ধান করছে দুদক। দুর্নীতি দমনে সরকারের যে অঙ্গীকার তাতে দুদক আত্মবিশ্বাসী। নতুনভাবে আরো দৃঢ়তার সাথে দুর্নীতি প্রতিরোধে মাঠে প্রতিনিয়তই কাজ করছে দুদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত অনুসন্ধান দল। দুদক চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বলেছেন, সব মন্ত্রণালয় যেন দুর্নীতির ব্যারাজ খুলে রেখেছে। গতকাল সোমবার দুদকসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

দুদক সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনের দায়েরকৃত অভিযোগ, বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্তব্যরত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে একটি তালিকা প্রণয়ন করেছে দুদক। এ তালিকায় অন্তত দুইশত ব্যক্তি রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত। এছাড়া আমলা, ব্যবসায়ীক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত অসাধু ব্যক্তি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অসাধু কর্মকর্তা, ভূমি অফিস, তিতাস, ওয়াসা, বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি বিভাগ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আরো প্রায় ৩ শতাধিক দুর্নীতিবাজদের তালিকা রয়েছে দুদকের হাতে। এর মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতে চার্জশীটও দেওয়া হয়েছে। কিছু মামলা বিচারাধীন ও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্য যাচাই-বাছাই করছে দুদকের অনুসন্ধান টিম।

জানা যায়, গত ২৮ মে দুদকের কুমিল্লা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. ইমরা খান বাদী হয়ে মামলা করেন ট্রাফিক পরিদর্শক জিয়াউল চৌধুরী ও তার স্ত্রী ফারজানা হোসেন রীমার বিরুদ্ধে। এজহারে তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং জাল হলফনামা প্রদানের অভিযোগ আনা হয়। এদিকে চেক ডিজঅনারের মামলায় গত ৬ জুন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ৭ সদস্যের আপিল বিভাগ অভিযুক্ত ঋণখেলাপি সাদ মুসা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মহসিন এবং তার স্ত্রী শামীমা নার্গিস চৌধুরীর ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম বলেন, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৭টি মামলার মোট ৪৬৭ কোটি টাকার চেক ডিজঅনার হয়েছে। বৃহস্পতিবারের মামলাটি ছিল ৫ কোটি ১৬ লাখ টাকার। এর আগে প্রধান বিচারপতির আদালত থেকে তাকে বলা হয়েছিল, ৬ জুনের মধ্যে ৫ কোটি টাকা দিলে বিদেশ যেতে অনুমতি দেওয়া হবে। তবে ওইদিন তারা টাকা না দিয়ে আরও সময়ের আবেদন করেন। তিনি আরও বলেন, এর আগেও ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং দায়রা আদালত মো. মহসিনকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। তবে ৬ মাসের জন্য এ নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেন হাইকোর্ট। পরে মামলাটি চেম্বার আদালত হয়ে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে আসে। আপিল বিভাগের আদেশে বলা হয়, ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে এমএ রহমান ইন্ডাস্ট্রিজের নামে ৮৩ কোটি ২০ লাখ ৩৬ হাজার ৬৫৫ টাকা ঋণ নেন মোহাম্মদ মহসিন। কিন্তু তা পরিশোধ না করে আত্মসাৎ করায় খেলাপি হয়ে যান তিনি। এরপর খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থঋণ মামলা হয়। ২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর মামলাটি করা হয়। এ ঋণ দুই বার পুনঃতফসিল করা হয়। সুদও মওকুফ করা হয়। তারপরও মহসিন কোনো ঋণ পরিশোধ করেননি। এ অবস্থায় বিবাদীরা খেলাপি ঋণ পরিশোধ না করে দেশত্যাগের পাঁয়তারা করছেন। তাই আদালত তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। সাদ মুসা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মহসিনের বিরুদ্ধে ১০টি ঋণ খেলাপির মামলা রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার গ্রুপের তিন হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন আদালতের বেঞ্চ সহকারী রেজাউল করিম।
এদিকে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুদকের দায়েরকৃত মামলায় গত ৫ জুন টাঙ্গাইলের সিনিয়র দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. নাজিমুদ্দৌলা কালিয়াকৈরের সাব রেজিস্ট্রার নূরুল আমিন তালুকদার ও তার স্ত্রী নুরুন্নাহার এবং মেয়ে জিনাত তালুকদারের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দেন। এরপর আদালতের এমন নির্দেশে সম্পত্তিসহ বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা জব্দ করেছে দুর্নীত দমন কমিশন (দুদক)। অভিযুক্ত নুরুল আমিন তালুকদার বর্তমানে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার বাড়ি টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর পৌর শহরের ঘাটান্দি এলাকায়। এর আগে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ২৩ জুলাই টাঙ্গাইল জেলা দায়রা জজ আদালতে মামলা করেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুর্নীতির প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বলেন, দুর্নীতিবাজরা সুযোগ পেলে সিংহের মতো গলায় কামড় দিয়ে ধরে। তবে সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবিদরা সৎ হলে এসব দুর্নীতিবাজকে সহজে নির্মূল করা যাবে। এজন্য দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সবুজ বাংলাকে বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই নয়, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও দুর্নীতিবাজ রয়েছে। এদের দায় সরকারকে অবশ্যই নিতে হবে। এখানে সরকারের দায় আছে। কারণ, পুলিশ কর্মকর্তারা এককভাবে দুর্নীতি করেননি। দুর্নীতি, অনিয়ম, অবৈধ সম্পদের মালিকানা, স্বর্ণপাচার হোক, পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে কিন্তু আরো অনেক অংশীজন ছিলেন। পরিচালনাকারী ছিলেন। সুরক্ষাকারী আরো অনেকে ছিলেন। তাদের দুর্নীতিরও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

গতকাল বিকেলে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দুদক মহাপরিচালক শিরীন পারভীন ও দুদুক সচিব খোরশেদা ইয়াসমীনের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে দুদক পরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান-২)-এর পরিচালক মো. বেনজীর আহমেদ ও উপ-পরিচালক মো. নূরুল হুদা জানান, দুর্নীতি দমনে সরকারের যে অঙ্গীকার তাতে দুদক আত্মবিশ্বাসী। নতুনভাবে আরো দৃঢ়তার সাথে দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করছে দুদক। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামার তথ্যও যাচাই-বাছাই চলছে। ব্যত্যয় ঘটলেই অনুসন্ধান চালিয়ে প্রমান পেলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ পর্য›ন্ত দুদকের হাতে যেসব অভিযোগ ও নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। প্রমাণ মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান দুদকের কর্মকর্তারা। এছাড়াও অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িতদের অনেকেই দুদকের নজরদারিতে রয়েছে বলেও জানান দুদকের এই কর্মকর্তারা। এদিকে গতকাল দুদকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে দুদক চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বলেছেন, কোনো মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিধিতে দুর্নীতি দমনের কোনো কথা বলা নেই। সব মন্ত্রণালয় যেন দুর্নীতির ব্যারাজ খুলে রেখেছে। মন্ত্রণালয়গুলোর আইনে দুর্নীতিবিরোধী ধারা থাকতে হবে। তিনি বলেন, দুর্নীতি প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। দুদকের একার পক্ষে সব ধরনের দুর্নীতি দমন করা সম্ভব নয়। মন্ত্রণালয়গুলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তারা ব্যবস্থা নিলে এত অভিযোগ দুদকে আসত না।

জনপ্রিয় সংবাদ

পদত্যাগের পরদিনই সায়েদুর রহমানকে একই পদে নিয়োগ

দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে হঠাৎ তৎপর দুদক

আপডেট সময় : ০৭:৫২:৩৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ জুন ২০২৪
  •  আতঙ্কে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী
  • সাদ মুসা গ্রুপের এমডিকে স্ত্রীসহ দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
  •  উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রারের অবৈধ সম্পত্তি-নগদ অর্থ জব্দ

দেশের যেখানেই অনিয়ম-দুর্নীতি, সেখানেই ব্যবস্থা। এমন জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে এবার জোরেশোরে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরই মধ্যে তার প্রতিফলনও ঘটতে শুরু করেছে। হঠাৎ করেই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দুদকের এমন তৎপরতায় এক রকম ঘুম হারাম হওয়ার উপক্রম সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তাদের। সংস্থার অভিযোগ কেন্দ্রে (হটলাইনে) অভিযোগ আসামাত্রই অভিযান চালাচ্ছে দুদক। এ অভিযানে হাতেনাতে ধরাও পড়ছে রাঘববোয়ালরা। সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক শীর্ষ এক কর্মকর্তাকে সপরিবারে দুদক কার্যালয়ে তলব করায় ফের আলোচনায় উঠে এসেছে দুর্নীতি-অনিয়মের নানান চিত্র। দুদকের অনুসন্ধান টিমের শুদ্ধি অভিযানে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী মহলেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা দেখে অনুসন্ধানে নামার কথা থাকলেও এখনো তা প্রকাশ্যে রূপ ধারণ করেনি। টিআইবি বলছে, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই নয়, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এবং ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মধ্যেও দুর্নীতিবাজরা ঘাপটি মেরে রয়েছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবে রূপ ধারণ করতে হলে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতি জরুরি। দুদক বলছে, দুদকের হটলাইনসহ যেকোনো উপায়ে অভিযোগ এলেই তার অনুসন্ধান করছে দুদক। দুর্নীতি দমনে সরকারের যে অঙ্গীকার তাতে দুদক আত্মবিশ্বাসী। নতুনভাবে আরো দৃঢ়তার সাথে দুর্নীতি প্রতিরোধে মাঠে প্রতিনিয়তই কাজ করছে দুদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত অনুসন্ধান দল। দুদক চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বলেছেন, সব মন্ত্রণালয় যেন দুর্নীতির ব্যারাজ খুলে রেখেছে। গতকাল সোমবার দুদকসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

দুদক সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনের দায়েরকৃত অভিযোগ, বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্তব্যরত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে একটি তালিকা প্রণয়ন করেছে দুদক। এ তালিকায় অন্তত দুইশত ব্যক্তি রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত। এছাড়া আমলা, ব্যবসায়ীক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত অসাধু ব্যক্তি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অসাধু কর্মকর্তা, ভূমি অফিস, তিতাস, ওয়াসা, বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি বিভাগ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আরো প্রায় ৩ শতাধিক দুর্নীতিবাজদের তালিকা রয়েছে দুদকের হাতে। এর মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতে চার্জশীটও দেওয়া হয়েছে। কিছু মামলা বিচারাধীন ও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্য যাচাই-বাছাই করছে দুদকের অনুসন্ধান টিম।

জানা যায়, গত ২৮ মে দুদকের কুমিল্লা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. ইমরা খান বাদী হয়ে মামলা করেন ট্রাফিক পরিদর্শক জিয়াউল চৌধুরী ও তার স্ত্রী ফারজানা হোসেন রীমার বিরুদ্ধে। এজহারে তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং জাল হলফনামা প্রদানের অভিযোগ আনা হয়। এদিকে চেক ডিজঅনারের মামলায় গত ৬ জুন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ৭ সদস্যের আপিল বিভাগ অভিযুক্ত ঋণখেলাপি সাদ মুসা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মহসিন এবং তার স্ত্রী শামীমা নার্গিস চৌধুরীর ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম বলেন, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৭টি মামলার মোট ৪৬৭ কোটি টাকার চেক ডিজঅনার হয়েছে। বৃহস্পতিবারের মামলাটি ছিল ৫ কোটি ১৬ লাখ টাকার। এর আগে প্রধান বিচারপতির আদালত থেকে তাকে বলা হয়েছিল, ৬ জুনের মধ্যে ৫ কোটি টাকা দিলে বিদেশ যেতে অনুমতি দেওয়া হবে। তবে ওইদিন তারা টাকা না দিয়ে আরও সময়ের আবেদন করেন। তিনি আরও বলেন, এর আগেও ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং দায়রা আদালত মো. মহসিনকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। তবে ৬ মাসের জন্য এ নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেন হাইকোর্ট। পরে মামলাটি চেম্বার আদালত হয়ে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে আসে। আপিল বিভাগের আদেশে বলা হয়, ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে এমএ রহমান ইন্ডাস্ট্রিজের নামে ৮৩ কোটি ২০ লাখ ৩৬ হাজার ৬৫৫ টাকা ঋণ নেন মোহাম্মদ মহসিন। কিন্তু তা পরিশোধ না করে আত্মসাৎ করায় খেলাপি হয়ে যান তিনি। এরপর খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থঋণ মামলা হয়। ২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর মামলাটি করা হয়। এ ঋণ দুই বার পুনঃতফসিল করা হয়। সুদও মওকুফ করা হয়। তারপরও মহসিন কোনো ঋণ পরিশোধ করেননি। এ অবস্থায় বিবাদীরা খেলাপি ঋণ পরিশোধ না করে দেশত্যাগের পাঁয়তারা করছেন। তাই আদালত তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। সাদ মুসা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মহসিনের বিরুদ্ধে ১০টি ঋণ খেলাপির মামলা রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার গ্রুপের তিন হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন আদালতের বেঞ্চ সহকারী রেজাউল করিম।
এদিকে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুদকের দায়েরকৃত মামলায় গত ৫ জুন টাঙ্গাইলের সিনিয়র দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. নাজিমুদ্দৌলা কালিয়াকৈরের সাব রেজিস্ট্রার নূরুল আমিন তালুকদার ও তার স্ত্রী নুরুন্নাহার এবং মেয়ে জিনাত তালুকদারের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দেন। এরপর আদালতের এমন নির্দেশে সম্পত্তিসহ বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা জব্দ করেছে দুর্নীত দমন কমিশন (দুদক)। অভিযুক্ত নুরুল আমিন তালুকদার বর্তমানে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার বাড়ি টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর পৌর শহরের ঘাটান্দি এলাকায়। এর আগে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ২৩ জুলাই টাঙ্গাইল জেলা দায়রা জজ আদালতে মামলা করেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুর্নীতির প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বলেন, দুর্নীতিবাজরা সুযোগ পেলে সিংহের মতো গলায় কামড় দিয়ে ধরে। তবে সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবিদরা সৎ হলে এসব দুর্নীতিবাজকে সহজে নির্মূল করা যাবে। এজন্য দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সবুজ বাংলাকে বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই নয়, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও দুর্নীতিবাজ রয়েছে। এদের দায় সরকারকে অবশ্যই নিতে হবে। এখানে সরকারের দায় আছে। কারণ, পুলিশ কর্মকর্তারা এককভাবে দুর্নীতি করেননি। দুর্নীতি, অনিয়ম, অবৈধ সম্পদের মালিকানা, স্বর্ণপাচার হোক, পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে কিন্তু আরো অনেক অংশীজন ছিলেন। পরিচালনাকারী ছিলেন। সুরক্ষাকারী আরো অনেকে ছিলেন। তাদের দুর্নীতিরও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

গতকাল বিকেলে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দুদক মহাপরিচালক শিরীন পারভীন ও দুদুক সচিব খোরশেদা ইয়াসমীনের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে দুদক পরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান-২)-এর পরিচালক মো. বেনজীর আহমেদ ও উপ-পরিচালক মো. নূরুল হুদা জানান, দুর্নীতি দমনে সরকারের যে অঙ্গীকার তাতে দুদক আত্মবিশ্বাসী। নতুনভাবে আরো দৃঢ়তার সাথে দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করছে দুদক। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামার তথ্যও যাচাই-বাছাই চলছে। ব্যত্যয় ঘটলেই অনুসন্ধান চালিয়ে প্রমান পেলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ পর্য›ন্ত দুদকের হাতে যেসব অভিযোগ ও নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। প্রমাণ মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান দুদকের কর্মকর্তারা। এছাড়াও অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িতদের অনেকেই দুদকের নজরদারিতে রয়েছে বলেও জানান দুদকের এই কর্মকর্তারা। এদিকে গতকাল দুদকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে দুদক চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বলেছেন, কোনো মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিধিতে দুর্নীতি দমনের কোনো কথা বলা নেই। সব মন্ত্রণালয় যেন দুর্নীতির ব্যারাজ খুলে রেখেছে। মন্ত্রণালয়গুলোর আইনে দুর্নীতিবিরোধী ধারা থাকতে হবে। তিনি বলেন, দুর্নীতি প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। দুদকের একার পক্ষে সব ধরনের দুর্নীতি দমন করা সম্ভব নয়। মন্ত্রণালয়গুলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তারা ব্যবস্থা নিলে এত অভিযোগ দুদকে আসত না।