* দুর্গন্ধময়-কালচে হয়ে উঠেছে অধিকাংশ নদীর পানি
* প্রতিদিন ৪ হাজার টন বর্জ্য ও ৫৭ লাখ গ্যালন দূষিত পানি ফেলে রাজধানীর চার পাশের নদীগুলোতে
* বাড়ছে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, ক্যানসারসহ নানারকম রোগ
‘রাষ্ট্র যারা চালায় তারা চান না নদীকে রক্ষা করা হোক’
অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত, পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ।‘এ বছরের মধ্যেই ১৯টি খালের দখল ও দূষণমুক্তকরণের কাজ সম্পন্ন করা হবে’
– সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, পানি সম্পদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা
একসময় নদীই ছিল মিঠাপানির অন্যতম উৎস। নদীর পানিই মানুষ পান করা শুরু করে ব্যবহার করতো যাবতীয় কাজে। নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল রাজধানী ঢাকা। ঢাকাকে ঘিরে রাখা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি এক সময় ছিল অমৃতধারা। তবে সময়ের পরিক্রমায় দখল আর দূষণের মহোৎসবে আজ এসব নদী পরিণত হয়েছে বিষাক্ত পানির উৎসে। এমনিতেই দখলের চাপে কমে গেছে নদীর আয়তন। মৃতপ্রায় অবস্থা প্রায় সব নদীর। অন্যদিকে দূষণে পানি হয়ে উঠেছে বিষাক্ত। প্রতিদিন রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোতে ৪ হাজার টন বর্জ্য ও ৫৭ লাখ গ্যালন দূষিত পানি ফেলা হচ্ছে। এতে জীবন বাঁচানো পানি পরিণত হচ্ছে বিষ আর মরণাস্ত্রে। বাড়ছে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সারসহ নানারকম রোগ। পরিবেশগত এমন বিপর্যয় মানবজীবনের জন্যও মহাবিপদ হয়ে উঠছে। তাই আগামী প্রজন্মের জন্য এখন থেকেই নদীকে বাঁচাতে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে নদী নিয়ে তেমন পরিকল্পনার কথা জানা না গেলেও চলতি বছরের মধ্যেই রাজধানী ঢাকার ১৯টি খালের দখল ও দূষণমুক্তকরণের কাজ সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছেন পানি সম্পদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ।
জানা গেছে, একসময় ঢাকার আশপাশের এসব নদীর ছল ছল শব্দ, দূর-দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি এনে দিতো নির্মল প্রশান্তি। একই অবস্থা ছিল দেশের অন্যান্য নদীর। নদীমাতৃক বাংলাদেশে একটা সময় মাছের অভাব দেখেনি জেলে পরিবার। কৃষকের ছিল না পানির অভাব। এই অঞ্চলে সর্বত্রই ছিল সুপেয় পানি। নদীর পানিই ছিল পান করার জন্য অন্যতম উৎস। তবে দখল আর দূষণের ফলে প্রায় নিষ্প্রাণ এসব নদীতে কান পেতে এখন আর টের পাওয়া যায় না ঢেউয়ের ধ্বনি। নদীর আশ্রয়ে গড়ে উঠা শহর নদীকেই মেরেছে তিলে তিলে। দোলাই নদী হয়ে ঢাকাকে আশ্রয় দেওয়া বুড়িগঙ্গা নদীও হারিয়েছে তার প্রাণের অস্তিত্ব। একসময়ের স্বচ্ছ পানির রঙ এখন হয়েছে কালচে-দুর্গন্ধময়। রাজধগানীর চারপাশের তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার প্রায় একই দশা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিদিন রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোতে প্রায় সাড়ে চার হাজার টন বর্জ্য ও ৫৭ লাখ গ্যালন দূষিত পানি ফেলা হয়। যার অন্যতম ভুক্তভোগী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যাসহ অন্য নদীগুলো। এসব বর্জ্য আর দূষিত পানির চাপে দূষণে হাহাকার অবস্থা এসব নদীর। বুড়িগঙ্গার পানি দূষণের ৩৫ শতাংশ আসে ট্যানারি থেকে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, মাত্রাতিরিক্ত দূষণের ফলে রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানি থেকে ভূগর্ভস্থ বিশুদ্ধ পানিতে ঢুকছে প্রতিনিয়ত। এক দশক আগেও এসব নদীতে জেলেরা কিছু মাছ ধরলেও এখন জাল ফেলেও মিলছে না মাছ। দূষিত আর বিষাক্ত পানিতে ধ্বংস হয়ে গেছে এসব নদীর জীববৈচিত্র্য। বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা বলছে, দূষণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে নদী তীরবর্তী মানুষের জীবন, সেইসঙ্গে কৃষি, জলজ স্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির যোগানও হুমকির মুখে। মানবজীবনের জন্যও এক মহাবিপদ হয়ে উঠছে নদীদূষণ। বাড়ছে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সারসহ নানারকম রোগ।
এদিকে নদীর অবৈধ দখল, পরিবেশ দূষণ আর অনিয়ম বন্ধে ২০১৪ সালে গঠিত হয় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট একটি রায়ে নদীকে জীবন্ত সত্তা বলে আদেশ জারি করা হয়। এরপর নদী রক্ষার জন্য নানা প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে কোটি কোটি টাকা। এরপরও কমছে না নদী দূষণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, কঠোর আইনের প্রয়োগ, জনগণের সচেতনতা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছাই পারে নদীকে আগের রূপে ফিরিয়ে নিতে। তা না হলে আরও হুমকির মুখে পড়বে প্রাণ-প্রকৃতি। বিষাক্ত পানির প্রভাবে বাড়বে মরণঘাতী বিভিন্ন রোগের প্রভাব।
পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ক্রোমিয়াম অত্যন্ত ক্ষতিকর জিনিস। সেটা অপসারণের কোনো প্ল্যান ছিল না। সলিড ওয়েস্ট অপসারণের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। যার ফলে এমন পরিণতি হয়েছে। সংবিধানের ১৮ (ক) এর যে ধারায় বলা আছে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি ইত্যাদি ইত্যাদি রক্ষা করা। এ আইন কার্যকরের সময় পার্লামেন্টে যিনি বড় কর্তা ছিলেন তখন সংসদ সদস্যরা এর থেকে নদী শব্দটা কেটে দিয়েছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্র যারা চালায় তারা চান না নদীকে রক্ষা করা হোক।
পানি সম্পদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, বর্ষার আগে আপাতত ৬টা খাল দখল ও দূষণমুক্ত করতে সক্ষম হব এবং খুব শিগগিরই আরো ৪টা খাল দখল ও দূষণমুক্তকরণের কাজ শুরু করব এবং এই বর্ষার আগেই বাকি আরও ৯টির কাজ শুরু হবে। অর্থাৎ এ বছরের মধ্যেই ১৯টি খালের দখল ও দূষণমুক্তকরণের কাজ সম্পন্ন করা হবে।













