- এখন অধ্যাদেশ সংশোধনেও রাজি সচিবালয়ের কর্মচারীরা
- ৪২ দিন পর নিজ কক্ষে প্রবেশ করলেন ডিএসসিসি প্রশাসক
- প্রধান উপদেষ্টা হস্তক্ষেপ কামনা এনবিআরের কর্মকর্তাদের
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনে একরে পর এক আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এক মাসের বেশি সময় থেকে আন্দোলন চলছে সচিবালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। প্রশাসনে এমন অস্থিরতায় অস্বস্তি তৈরি হয়েছে সরকরে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময়েও আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারায় সরকারের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়েছে। সূত্র বলছে, সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে বনিবনার চেষ্টা চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই চলমান আন্দোলনগুলোর সুরাহা আসবে। তবে আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও প্রশাসনে আবারও অস্থিরতা তৈরির সুযোগ আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত ঐক্য পরিষদের সঙ্গে গত বুধবার আলোচনায় বসে সরকার গঠিত ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ’-সংক্রান্ত পর্যালোচনা কমিটি। গত ৪ জুন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে আহ্বায়ক করে এ কমিটি গঠন করে সরকার। জানা যায়, বৈঠকে অধ্যাদেশের বিতর্কিত নিবর্তনমূলক ধারাগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ফোরামের পক্ষ থেকে অধ্যাদেশের কিছু ধারার বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। আজ অনুষ্ঠেয় বৈঠকে উভয়পক্ষ নিজ নিজ পক্ষে পর্যালোচনা করবে, কী কী বিষয়ে পরিবর্তন করা প্রয়োজন। আপনারা এতদিন চাকরি অধ্যাদেশ সম্পূর্ণ বাতিলে আন্দোলন করছেন। কিন্তু অধ্যাদেশের আপত্তিজনক ধারা বাতিল না করে সংশোধন করা হলে তো আর অধ্যাদেশ বাতিল হলো না, এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পরিষদের কো-চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, তা ঠিক। কিন্তু অধ্যাদেশের বিতর্কিত ধারাগুলো যদি এভাবে সংশোধন করা যায়, যাতে এসব ধারা থাকলেও যা বা না থাকলেও যা। আলোচনায় অনেক বিষয় চলে আসে। কর্মচারীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো যেসব ধারা আছে, সেসব সংশোধন করে এমন করা হলো, যাতে কর্মচারীর ক্ষতির শঙ্কা থাকল না। তা হলে সেটা মেনে নেওয়া যায়।
কো-চেয়ারম্যান বলেন, কর্মচারী ঐক্য ফোরাম অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে অনঢ় আছে। এরপরও যদি কোনো কারণে শতভাগ সফল হতে না পারি, তখন তো বিকল্প কিছু থাকতে হবে। এই আলোকেই আমরা আলোচনায় যাচ্ছি সরকারের পর্যালোচনা কমিটির সঙ্গে। তিনি বলেন, গত সোমবার আলোচনায় আমরা অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে যেমন যুক্তি উপস্থাপন করেছি, তেমনই সংশোধনের কথাও বলেছি। অপর প্রশ্নের জবাবে কর্মচারী এ নেতা বলেন, ‘পর্যালোচনা কমিটির সদস্যরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বীকার করেছেন যে, কিছু ধারা অধ্যাদেশে দেওয়া ঠিক হয়নি বা যুক্তিসংগত হয়নি।’
এদিকে বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে মেয়রের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে চলমান আন্দোলনের ৪৩ দিন পর নগর ভবনে ফিরেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়া। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে ডিএসসিসি নগর ভবনের প্রশাসক কার্যালয়ে উপস্থিত হন তিনি। এদিকে সকাল থেকে চলছিল প্রাশসকের কার্যালয় পরিচ্ছন্নতার কাজ। ৪২ দিন আগে লাগানো তালা আজ খুলে দেন নগর ভবনের সিকিউরিটি অফিসার গোলাম মোস্তফা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ডিএসসিসি অন্যান্য কর্মচারীরাও।
২৭ মার্চ ইশরাক হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে রায় দেন নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল ও ঢাকা প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালত। ২৭ এপ্রিল ইশরাককে মেয়র হিসেবে গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু সেই গেজেট বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়নি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ইশরাকের শপথ না পড়ানো নিয়ে করা আবেদন খারিজ করে দেন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। পরে ১৪ মে থেকে ইশরাককে মেয়রের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে নগরভবনে টানা অবস্থান ও কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করেন ঢাকাবাসীসহ ইশরাক সমর্থককারীরা। এ সময় নগর ভবনের মূল ফটক, প্রশাসনের কার্যালয়সহ ভবনের সব নাগরিক সেবা প্রতিষ্ঠানের গেটে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের অপসারণসহ একাধিক দাবিতে আন্দোলনরত কর্মকর্তাদের কলমবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি গতকাল বৃহস্পতিবারও অব্যাহত ছিল। আন্দোলনের গতি ঠেকাতে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের রাজস্ব ভবন ও আশপাশের এলাকায় সকাল থেকেই মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক সেনা, পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ড ও আনসার সদস্য। ‘এনবিআর রিফর্ম ইউনিটি পরিষদের’ ব্যানারে গত কয়েকদিন ধরে এ আন্দোলন চলছে। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত পূর্বঘোষিত অবস্থান ও কলমবিরতি কর্মসূচি পালন করেন তারা। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতির কারণে তারা রাজস্ব ভবনের ভেতরে ঢুকতে পারেননি। ইউনিটি পরিষদের সভাপতি ও এনবিআরের অতিরিক্ত কমিশনার হাসান মুহাম্মদ তারেক রিকাবদার বলেন, আমাদের ভবনের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, তাই আমরা বাইরে অবস্থান করছি।
এদিকে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অর্থ মন্ত্রণালয় গত বুধবার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এনবিআর কর্মকর্তাদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়। তবে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ না করায় আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন নেতারা। এনবিআর রিফর্ম ইউনিটি পরিষদ আগামী ২৮ জুন ‘মার্চ টু এনবিআর’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। একইসঙ্গে দাবি পূরণ না হলে ওইদিন থেকেই পূর্ণদিবস শাটডাউনেরও ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
বিকালে রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা এনবিআর-এ চলমান অচলাবস্থার অবসানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২৭ জুনের মধ্যে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানকে অপসারণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই দাবি পূরণ না হলে ২৮ জুন থেকে এনবিআর এবং সারা দেশের শুল্ক ও কর কার্যালয়গুলোতে লাগাতার ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করা হবে। একই দিনে ঘোষিত হয়েছে ‘মার্চ টু এনবিআর’ কর্মসূচি, যাতে সারা দেশ থেকে কর্মকর্তারা একযোগে রাজধানীতে জড়ো হবেন। সংবাদ সম্মেলনে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের সভাপতি হাছান মুহম্মদ তারেক রিকাবদার বলেন, বর্তমানে এনবিআরের সংস্কার ও কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতে চেয়ারম্যানের অপসারণ ছাড়া বিকল্প কোনও পথ খোলা নেই। প্রতিষ্ঠানটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।




















