★ এক্সপ্লেইনার

বিক্ষোভে উত্তাল ইউরোপের চার দেশ

সবুজ বাংলা ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

★ চলছে সংঘর্ষ-আগুন-লুটপাট
★ রাজপথে লাখো মানুষের ঢল
 

 

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছেন। বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠছে ইউরোপের চার দেশ। বিক্ষোভকারীদের দমাতে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় থেমে থেমে চলছে সংর্ঘর্ষ। হামলা, ভাঙচুর অগ্নিকাণ্ড আর লুটপাটও চলছে অবাধে। নানা কৌশলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও তৎপর রয়েছে বিক্ষোভ দমনে। গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইতালি ও পর্তুগালে হওয়া এই বিক্ষোভের ঢেউ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সরকারগুলোকে চাপের মুখে ফেলেছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম উত্তাল দিন পার করেছে দেশটি। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এদিন প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভে অংশ নেন বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। সপ্তাহব্যাপী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় রূপ নেয়। একের পর এক সরকারি ভবন, বিলাসবহুল বুটিক ও সুপারমার্কেট হামলার শিকার হচ্ছে। এসব হামলার পর পুলিশের সঙ্গেও ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে বিক্ষোভকারীদের।

ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু জানান, এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছে দেড়শর বেশি পুলিশ কর্মকর্তা।

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, প্যারিস, মার্শেই, নিস, নঁতে, বর্দো, লিমোগেস, লিলে, তুলুস ও স্ত্রাসবুর্গে অসংখ্য দোকানে লুটপাট চালানো হয়েছে। প্যারিসের মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোইরে বলেন, শহরটির সব রাস্তাঘাট ‘বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। লিমোগেস শহরে মুখ ঢাকা বিক্ষোভকারীদের দেয়া আগুনে ১৪০ বছরেরও বেশি পুরনো টাউন হল প্রায় সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গেছে। এ ছাড়া মার্শেই ও লিলের টাউন হলে ভাঙচুর চালিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা। লিঁওতে শহরের পর্যটন কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেয়া পোস্টে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ লিখেছেন, দায়ী ব্যক্তিদের ‘আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া হবে’।

এদিকে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ করে আসছে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করেছে পুলিশ।

ব্রাসেলসের পূর্বে অবস্থিত তুলনামূলক ছোট শহর লিজেও বিক্ষোভ দমনে জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। তবে বিক্ষোভে কতজন অংশ নিয়েছিল, সে বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিতভাবে কিছু জানাতে পারেনি।

এদিকে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং বড় শহরগুলোতে আবাসন সংকটের প্রতিবাদে আনুমানিক দশ হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারী পদযাত্রা করেছেন। পর্তুগালে ২০১৭ সাল থেকে বাড়িভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) পর্তুগালের সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম বলেছেন, সরকার রাজপথে হইচইয়ের কাছে মাথা নত করবে না। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের দাবি, দেশটির নেতারা তাদের সমস্যা সম্পর্কে উদাসীন।

এ ছাড়া ইতালির মিলান শহরের কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। এ সময় দোকানপাট লুটপাট এবং বিভিন্ন ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এর ফলে পিয়াজ্জা দেল দুওমো এবং বিলাসবহুল শপিং আর্কেড ফাঁকা হয়ে যায়।

যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ মিছিল মুহূর্তেই সহিংস হয়ে ওঠে জানায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। পরে মুখ ঢাকা বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর, পেভমেন্টের ইট এবং অন্যান্য বস্তু ছুড়ে মারে এবং বার-টেবিল দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে পুলিশ।

ইতালির বার্তা সংস্থা লাপ্রেস জানিয়েছে, এ ঘটনায় অন্তত দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং শিশু-কিশোরসহ প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এক্স-এ দেয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘বিক্ষোভ করা মৌলিক অধিকার, কিন্তু আমাদের শহরকে জ্বালিয়ে দেয়ার অধিকার কারও নেই।’

মিলানের মধ্য-বামপন্থী মেয়র জিউসেপ্পে সালা বলেছেন, ‘বিক্ষোভের কারণগুলো যৌক্তিক ছিল। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সহিংসতা এবং শহরের ক্ষতিসাধন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

এইচইসি প্যারিস বিজনেস স্কুলের ইইউ আইন ও নীতির অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, অন্যান্য দেশের বিক্ষোভ ফ্রান্সের মতো বিশাল আকার ধারণ না করলেও, এটি অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ হতে পারে। তিনি বলেন, ফ্রান্স এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু... এবং এখন এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে এটি ফ্রান্সের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই দেশগুলোতে গত শনিবারের বিক্ষোভই শেষ নয়। সামনের দিনগুলোতে নতুন নতুন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে। গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় এই আন্দোলনের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে। ‘আগামী সপ্তাহে’ এই দেশগুলোতেও বড় ধরনের বিক্ষোভ হতে পারে বলে জানান তিনি।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL