নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তর ঘিরে যখন বিশ্বনেতাদের আনাগোনা শুরু হওয়ার অপেক্ষা, তখন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশিদের আলোচনায় নতুন করে এসেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠক। ট্রাম্প নিজেই তারেক রহমানকে লেখা এক চিঠিতে শিগগিরই তাঁর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই চিঠিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ জানিয়ে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘বোয়িং আপনাকে হতাশ করবে না, আর আমিও এটি ভুলব না।’
গত ৩১ আগস্ট তারেক রহমানকে পাঠানো ওই চিঠির খবর প্রকাশের পর নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ আগামী ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে তারেক রহমানের অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। অধিবেশন উপলক্ষে তাঁর নিউইয়র্ক সফর হলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্ভাব্য সাক্ষাৎ সেই সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস জানিয়েছে, ট্রাম্প তাঁর চিঠিতে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের মানুষ অনেক কঠিন সময় পার করেছে। তবে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও এর জনগণের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চিঠিতে ট্রাম্প বলেন, খুব বেশি দূরে নয়, এমন ভবিষ্যতে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। তবে সেই সাক্ষাতের নির্দিষ্ট তারিখ, সময় বা স্থান এখনো জানানো হয়নি।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন প্রতিবছরই বিশ্বনেতাদের সরাসরি যোগাযোগের বড় সুযোগ তৈরি করে। বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানের পাশাপাশি মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও এ সময় অনুষ্ঠিত হয়। ফলে তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরের সময় ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে।
দুই নেতার সম্ভাব্য বৈঠকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, বিমান চলাচল, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। বিশেষ করে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের চিঠির বড় একটি অংশজুড়েই রয়েছে বোয়িং। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের জন্য তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান তিনি। এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত মনোযোগেরও প্রশংসা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্প জানান, বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে তারেক রহমানের চিঠি তিনি পেয়েছেন এবং বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত প্রশংসার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আশ্বস্ত করেন, বোয়িং বাংলাদেশকে হতাশ করবে না। বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত তিনি মনে রাখবেন বলেও উল্লেখ করেন।
বোয়িং নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও আগ্রহের কথা প্রকাশ পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, বাংলাদেশ আরো বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার জন্য কয়েকশ কোটি ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং আগের ক্রয়াদেশ বাড়ানো হচ্ছে। তবে উড়োজাহাজের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বা মোট চুক্তিমূল্য তিনি জানাননি।
একটি বড় উড়োজাহাজ ক্রয় চুক্তির প্রভাব শুধু বিমান কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণসহ দীর্ঘমেয়াদি নানা কার্যক্রম যুক্ত থাকে। ফলে বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বাড়লে দুই দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগের পরিধিও বিস্তৃত হতে পারে।
প্রবাসীদের আগ্রহ কেন : নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে দুই নেতার সম্ভাব্য বৈঠক কেবল কূটনৈতিক খবর নয়। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নানা দিক সরাসরি জড়িত। অভিবাসন, ভিসা, পারিবারিক পুনর্মিলন, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত— এসব বিষয়ে দুই দেশের নীতিগত অবস্থানের প্রভাব পড়ে প্রবাসীদের ওপর।
নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশের সঙ্গে বাংলাদেশের নিয়মিত পারিবারিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। কেউ দেশে ব্যবসা পরিচালনা করেন, কেউ নিয়মিত অর্থ পাঠান, আবার অনেকেই পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দেখা করতে বছরে একাধিকবার বাংলাদেশে যাতায়াত করেন। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়ন তাঁদের কাছে বাস্তব জীবনের বিষয়।
বিশেষ করে নিউইয়র্কের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের কাছে সম্ভাব্য বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়লে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা দুই দেশের বাজারের মধ্যে সেতুবন্ধনের ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিমান চলাচলের ক্ষেত্রেও প্রবাসীদের আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ, যাতায়াতের সুবিধা, বিমানবন্দরের সেবা এবং ভ্রমণ ব্যয়— এসব বিষয় প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের আগ্রহের জায়গা। বোয়িং কেনাকে ঘিরে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতে সক্ষমতা বাড়লে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
জাতিসংঘ অধিবেশন ঘিরে অপেক্ষা : আগামী ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে তারেক রহমানের অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। এ কারণে নিউইয়র্কে তাঁর সফর ঘিরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ইতোমধ্যেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী মহলেও এ সফর নিয়ে আলোচনা চলছে।
এর মধ্যে ট্রাম্পের সরাসরি সাক্ষাতের আগ্রহের কথা প্রকাশ পাওয়ায় সফরটি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদিও এখন পর্যন্ত বৈঠকের আনুষ্ঠানিক সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি, তবু নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ এখন তাকিয়ে আছে সেপ্টেম্বরের সেই দিনটির দিকে।
ট্রাম্পের চিঠিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ এবং বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের প্রশংসা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের আগ্রহ। ফলে সম্ভাব্য বৈঠকটি বাস্তবে হলে সেটি শুধু ঢাকা ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কের জন্য নয়, নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এখন প্রশ্ন একটাই— জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন ঘিরে নিউইয়র্কে যখন বিশ্বনেতাদের সমাবেশ হবে, তখন কি সেই মঞ্চেই মুখোমুখি বসবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তারেক রহমান? উত্তর জানতে অপেক্ষা করতে হবে সেপ্টেম্বরের সেই বহুল প্রতীক্ষিত সময় পর্যন্ত।