* মানসিক নির্যাতন ও আত্মহত্যার প্ররোচনায় মামলা
* প্রথম স্ত্রীসহ রিমান্ডে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম
* ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধার, পলাতক আসামিকে খুঁজছে পুলিশ
* এমপি পদ থাকা নিয়ে স্পিকারের চিঠির অপেক্ষায় ইসি
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবন থেকে বহুল বিতর্কিত জামায়াত সমর্থিত সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের ফ্ল্যাট থেকে তার আলোচিত দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ‘সুইসাইড নোট’। সেটি প্রাথমিকভাবে মরিয়মের হাতের লেখা ধারণা করা হলেও তা নিশ্চিতে সিআইডি’র ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পর থেকে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বিয়ের পর থেকেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে মরিয়মকে আত্মহত্যার প্ররোচনায় বাধ্য করা হয়েছে। এদিকে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে এক তরুণীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় গাজী নজরুল ইসলামের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। প্রথম দিকে ওই ভিডিওটি জামায়াতের পক্ষ থেকে এআই দিয়ে তৈরি দাবি করলেও পরবর্তীতে ফ্যাক্টচেকিংয়ে তা সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। এরপর জামায়াত ইসলামির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ তাকে দল থেকে বহিস্কার করে। কিন্তু ঘটনা ভিন্নখাতে নেওয়ার অপচেষ্টায় এমপি গাজী নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমে তিনি মরিয়মকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করেছেন। পরবর্তীতে মরিয়মও এমপি পরিবারের চাপে পড়ে সংবাদ সম্মেলন করে এমপি গাজী নজরুলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে মর্মে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করেন। একজন জামায়াতের এমপি’র এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে তার সংসদ সদস্য পদ থেকেও বরখাস্তের দাবি ওঠে। এদিকে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার এমপি গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে পৃথক মেয়াদে রিমান্ডে দিয়েছেন আদালত। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার অপর আসামিকে ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে তার এমপি পদ থাকবে কি থাকবে না, এ নিয়েও সামািজক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। এমপি নজরুলকাণ্ডে খোদ বিব্রতবোধ করছে জামায়াতে ইসলামী দলের হাইকমান্ড। তবে ইসি সচিব বলেছেন, তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল বা বরখাস্ত সংক্রান্ত বিষয়ে স্পিকারের চিঠির অপেক্ষায় রয়েছে ইসি।
জানা যায়, রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মরিয়ম খাতুনের (১৯) মৃত্যুর ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় গ্রেপ্তার জামায়াত সমর্থিত নেতা সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে পৃথক মেয়াদে রিমান্ডে দিয়েছেন আদালত। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এদিন আসামিদের আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শামসুজ্জোহা সরকার প্রত্যেকের ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। পরে শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী আসামিদের রিমান্ডে নেয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমানসহ অন্যরা রিমান্ড বাতিল ও জামিন চেয়ে শুনানি করেন। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত গাজী নজরুল ইসলামের ৪ দিনের এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমের একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে একই দিন তাদের রিমান্ডে চেয়ে পুলিশের করা আবেদনে বলা হয়, ভিকটিম মরিয়ম খাতুনের (১৯) ফাঁস লাগিয়ে মৃত্যুবরণ করার সময় একই বাসায় এজাহারনামীয় গ্রেপ্তার আসামিরা ছিলেন। এ কারণে ভিকটিমের আত্মহত্যার পেছনে তাদের কোনো প্রভাব ছিল কিনা, তা উদঘাটনের জন্য তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, উসকানি, মানসিক চাপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অন্য কোনোভাবে আত্মহত্যায় সহায়তা করার বিষয়ে আসামিদের ভূমিকা উদঘাটন করা প্রয়োজন। এ ছাড়া মরিয়মের আত্মহত্যায় এজাহারনামীয় পলাতক আসামি ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তার অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্যও আসামিদের রিমান্ডে নেয়া প্রয়োজন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়, আত্মহত্যার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা কোনো আসামি জড়িত রয়েছে কি না, তা শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং মামলার মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকসুদা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
পুলিশ ও ঘটনার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায় ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় মরিয়মের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। ওই ফ্ল্যাটেই গাজী নজরুল তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে যৌথভাবে বসবাস করতেন। ঘটনার সময় ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় পুলিশ, সিআইডি, পিবিআই এবং ডিবির একটি যৌথ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে কক্ষের দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠায়। উদ্ধার অভিযানের সময় পুলিশ বিছানার ওপর থেকে একটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধার করেছে।
পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. ফজলুল করিম জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে চিরকুটটি মরিয়মের লেখা বলে মনে হলেও ফরেনসিক পরীক্ষার পরই হস্তাক্ষর নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
জানা যায়, মরিয়মের বাবা পেশায় মুদিদোকানদার এস এম মাসুম বিল্লাহর অভিযোগ অনুযায়ী, গত জুন মাসে ৭৫ বছর বয়সী গাজী নজরুলের সঙ্গে তাঁর ১৯ বছর বয়সী মেয়ে মরিয়মের বিয়ে হয়। এই বিয়েতে মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। বিয়ের পর থেকেই ন্যাম ভবনের ওই বাসায় স্বামী এমপি গাজী নজরুল এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম যৌথভাবে তরুণী মরিয়মের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। মরিয়ম নিয়মিত ফোনে পরিবারের কাছে তার ওপর চালানো নিগ্রহের কথা জানিয়ে কাঁদতেন। গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে গাজী নজরুল ফোনে মরিয়মের বাবাকে দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন। স্বজনেরা সেখানে পৌঁছে অনেক মানুষের ভিড় দেখেন এবং পরবর্তীতে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশের সহায়তায় ভেতরের ঘরের দরজা ভেঙে ফ্যানের সঙ্গে মরিয়মকে ঝুলন্ত অবস্থায় পান।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে বিজয়ী হলেও গাজী নজরুলের সাম্প্রতিক সময়টা বেশ বিতর্কিত ছিল। গত জুলাই মাসে সামাজিক মাধ্যমে তার একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক ভাইরাল হয়, যেখানে তাকে এক তরুণীর সঙ্গে দেখা যায়। এরপর থেকেই শোনা যায়, চাকরির আশ্বাস দিয়ে ওই তরুণীকে ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে শারীরিক সম্পর্ক বা অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হন বহুল বিতর্কিত এমপি গাজী নজরুল। পরবর্তীতে তিনিসহ দলের হাইকমান্ড সেটিকে এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি বলে দাবি করে। এরপর ফ্যাক্টচেকিংয়ে এর সত্যতা প্রমাণিত হলে তুমুল সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিতর্ক চরম রূপ নিলে গাজী নজরুল দাবি করেছিলেন যে, তরুণীটি তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম। এই ঘটনার পরপরই গত ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী তাকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার করে এবং তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি প্রদান করে। এই ঘটনার পর তার বাসায় গৃহবধূ মরিয়মের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং প্ররোচনা মামলায় সংসদ সদস্যের গ্রেপ্তার হওয়া ঘিরে সারাদেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার রাতেই ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেই সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। দিবাগত রাত ১টার দিকে এমপি গাজী নজরুলকে প্রধান আসামি করে ৩ জনের নামে মামলা করেন মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ। মামলার অপর দুই আসামি হলেন- এমপি গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম ও শ্যালক (নিহতের মামা) ওবায়দুল্লাহ।
সবশেষ গতকাল সোমবার তাদের আদালতে তোলা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শামসুজ্জোহা সরকার বলেন, মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ আত্মহত্যার প্ররোচনার যেসব অভিযোগ এসেছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এ মামলার অভিযুক্ত অপর আসামি ওবায়দুল্লাকে ধরতে অভিযান চলছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তার মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
এদিকে, নৈতিক স্খলনের দায়ে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে জাতীয় সংসদ থেকে এখনো কোনো চিঠি পায়নি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। স্পিকারের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাওয়ার পরই তার সংসদ সদস্য পদের বিষয়ে আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।
ইসি সচিব বলেন, স্পিকারের পক্ষ থেকে চিঠি পাওয়ার আগে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নেই। সংসদ থেকে চিঠি হাতে পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এর আগে, নীতিগত কারণ দেখিয়ে গত ২২ জুলাই গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী। এরপর দলটির পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) চিঠি দিয়ে বিষয়টি অবহিত করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।