বাংলাদেশ-চীন ক্রীড়া কূটনীতি ও আমাদের সম্ভাবনা-শেষ পর্ব

এখন দরকার এমন এক সেতু, যার ওপর দিয়ে দুই দেশই হাঁটবে

মোরসালিন আহমেদ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

বাংলাদেশ-চীন ক্রীড়া সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করতে এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কাজের দিকে এগোনো। বিকেএসপিকে দুই দেশের ক্রীড়া সহযোগিতার একটি কেন্দ্রীয় হাব হিসেবে গড়ে তোলা, চীনের বিভিন্ন স্পোর্টস ইউনিভার্সিটির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ডিসিপ্লিনে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, আট থেকে দশটি সম্ভাবনাময় খেলায় পাঁচ বা দশ বছরের হাই পারফরম্যান্স প্রোগ্রাম, বাংলাদেশি কোচদের জন্য ফেলোশিপ এবং চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রীড়াবিদদের নিয়মিত স্কলারশিপ—এসব হতে পারে সেই পথের শুরু।
ক্রিকেট হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী স্পোর্টস ডিপ্লোমেসির একটি মাধ্যম। পাশাপাশি উশু ও তাই চির সঙ্গে চীনের স্পোর্টস সায়েন্স, রিহ্যাবিলিটেশন ও পারফরম্যান্স প্রযুক্তি বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যৌথ যুব টুর্নামেন্ট, কোচিং ক্যাম্প, বিশ্ববিদ্যালয় গেমস এবং গবেষণা ও তথ্য বিনিময় বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন ক্রীড়া কূটনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতিমালা।
এ ধরনের সহযোগিতার আগ্রহ এখন দুই পক্ষেই দৃশ্যমান। সানিয়া সফর শেষে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক জানান, আর্চারি, শুটিং, জিমন্যাস্টিকস, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, উশু, ভলিবল ও অ্যাথলেটিকসে চীনের কারিগরি সহায়তার বিষয়ে বাংলাদেশ আগ্রহী। দেশে বিচ গেমস আয়োজনেও সহায়তা চাওয়া হয়েছে। সানিয়ায় হাইনান প্রদেশের ভাইস গভর্নর হে ঝিজিং, পর্যটন ও ক্রীড়া দপ্তরের মহাপরিচালক চেন তিয়েজুন এবং সানিয়া সিটির ভাইস মেয়র ফান ওয়েইঝেংয়ের সঙ্গে বৈঠকে অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি বিনিময় নিয়েও আলোচনা হয়। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের আগ্রহের বড় জায়গা ক্রিকেট; পাশাপাশি নারী ক্রীড়া ও প্যারা স্পোর্টসেও সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
এর আগে ৩১ মার্চ ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে বৈঠকেও কোচ ও প্রশিক্ষক উন্নয়ন, ক্রীড়া অবকাঠামো, কারিগরি সহযোগিতা এবং যুব ও ক্রীড়া বিনিময় নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ চীনা প্রশিক্ষক ও কারিগরি সহায়তা নেওয়ার আগ্রহ জানায় এবং প্রস্তাবিত স্পোর্টস ইনস্টিটিউটে চীনা বিনিয়োগের আহ্বান জানায়। রাষ্ট্রদূতও যুব প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও ক্রীড়া শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা বলেন।
ক্রীড়াবিদদের অভিজ্ঞতাও একই প্রয়োজনের কথা বলে। জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যাডমিন্টন লিজেন্ড ও বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব যোবায়দুর রহমান রানা নিজের খেলোয়াড়জীবনে চীনা কোচের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা স্মরণ করে বলেন, চীনের টেকনিক ও ট্যাকটিকস থেকে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে। টেবিল টেনিস খেলোয়াড় খই খই সাই মারমা ও ভারোত্তোলক মাজিয়া আক্তার ইকরাও আধুনিক প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তার প্রয়োজনের কথা তুলে ধরেছেন। খই খই ২০২৬ সালের জাতীয় টেবিল টেনিসে নারী একক ও দ্বৈতে শিরোপা জিতেছেন।
বিকেএসপি-ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতাও এখন বাস্তব রূপ পাচ্ছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে চারটি ‘স্টাডি ইন ওয়াইএমইউ’ বৃত্তি, বাংলাদেশ-চীন ক্রিকেট ও তাই চি কেন্দ্র, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় এবং যৌথ গবেষণার প্রস্তাব রয়েছে।
বৃত্তির গুরুত্ব এখানেই। একজন তরুণ চীনে গিয়ে একই সঙ্গে পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। দেশে ফিরে তিনি শুধু সাবেক খেলোয়াড় নন—কোচ, গবেষক, ক্রীড়া প্রশাসক বা স্পোর্টস সায়েন্টিস্টও হতে পারেন। একজন বিশেষজ্ঞ দেশে এসে কিছুদিন কাজ করলে তার প্রভাব সীমিত হতে পারে; কিন্তু একজন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ তৈরি হলে তিনি বহু বছর সেই জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে পারেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে কর্মসংস্থান ও ক্রীড়া শিল্প। কোচ, ফিজিও, ট্রেনার, পারফরম্যান্স বিশ্লেষক ও ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা পেশাজীবীদের জন্য আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে জার্সি, জুতা, ব্যাট, বল, প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম, ফিটনেস যন্ত্র ও পারফরম্যান্স প্রযুক্তিতেও সহযোগিতার সুযোগ আছে।
৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ৮ম চায়না অ্যাম্বাসেডর কাপ উশু চ্যাম্পিয়নশিপের সমাপনীতে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ও প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশে উশু ও ক্রীড়ার উন্নয়নে চীন সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
পাঁচ দশক আগে যে সম্পর্কের শুরু হয়েছিল কূটনৈতিক যোগাযোগ দিয়ে, তার নতুন ভাষা হতে পারে মাঠ, ম্যাট, ব্যাট, বল, কোচিং, গবেষণাগার ও বিশ্ববিদ্যালয়। তবে এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা। একটি সফর সংবাদ হতে পারে, একটি চুক্তি স্মরণীয় হতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া কোনো সহযোগিতাই স্থায়ী হয় না।
রাষ্ট্র কূটনীতির টেবিলে কথা বলে, আর ক্রীড়ার মাঠে কথা বলে মানুষ। তাই বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের আগামী অধ্যায়ে ক্রীড়া শুধু সহযোগিতার একটি ক্ষেত্র নয়—দুই দেশের তরুণ প্রজন্মকে কাছাকাছি আনারও একটি কার্যকর সেতু।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL