বাস্তবতার নিরিখে চায়না যেভাবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে নিত্য নতুন আইডিয়ার জন্ম দিচ্ছে তাতে চিকিৎসা শাস্ত্রে এক নতুন দিগন্তের সৃষ্টি হয়েছে। চায়না কেবল তথ্যপ্রযুক্তিরক্ষেত্রেই নয়, চিকিৎসাক্ষেত্রেও যে অন্যদের থেকে যোজন যোজন এগিয়ে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের দেশগুলো এখন চিকিৎসাক্ষেত্রে মাও সেতুংয়ের দেশটিকে আস্থার প্রতীক হিসেবে খুঁজে পাচ্ছে। বিশেষ করে চিকিৎসা শাস্ত্রে চীনের এই বিস্ময়কর অগ্রযাত্রাকে মূলত দু’টি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এক. হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাপদ্ধতি। দুই. বর্তমান যুগের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও যদি স্বচোখে দেশটির চিকিৎসা ব্যবস্থা না দেখতাম এবং চিকিৎসা সেবা গ্রহণ না করতাম তাহলে চায়নার চিকিৎসা শাস্ত্র অজানাই থেকে যেতো। সত্যি বলতে কী, চীনের চিকিৎসার মান ও সেবা মানুষের মনে এতোটাই দাগ কেটেছে যে, কেউ এখন আর বিকল্প দ্বিতীয় দেশটির কথা কল্পনা করছেন না। সবাই এখন উন্নত চিকিৎসার জন্য চীনে ছুটছেন। একসময় উন্নত চিকিৎসা মানেই আমাদের দেশের মানুষ দল বেধে ভারতে যেতেন। আরো অধিকতর চিকিৎসার আশায় যেতেন থাইল্যান্ড। তার ওপরে সিঙ্গাপুর ছিল সবার চয়েজ। মালয়েশিয়ায়ও যাবার রেওয়াজ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ভিসা জটিলতা, এয়ার টিকিটে চওড়া মূল্য আর ব্যয়বহুল চিকিৎসায় যখন সবাই হাপিয়ে উঠছিল তখনই আশিবাদ হয়ে এলো চীন। তাদের না আছে ভিসা জটিলতা, না আছে টিকিটের চওড়া দাম, না আছে চিকিৎসার ব্যয়! ওইসব দেশের তুলনায় চীনের চিকিৎসা সেবার মান যেমন অনেক ভালো। তেমননি সাশ্রয়ী খরচ। তবে অনেকে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে থাকেন প্রেসক্রিপশন ও চাইনিজ ভাষা অন্য কোন দেশে কাজে লাগবে না, বাংলাদেশে ওই প্রেসক্রিপশনের ঔষধ পাওয়া যায় না, ভাষাগত সমস্যা। কিন্তু বাস্তবতায় আসলে তা নয়। চাইনিজ ডাক্তাররা খুবই আন্তরিক। একজন প্রেসেন্টকে যথেষ্ট সময় নিয়ে দেখেন। ভাষাগত সব দেশেই আছে। চায়নারা গুগল ট্রান্সলেট, গুগুল ভয়েস এবং নানা প্রযুক্তির মাধ্যম ব্যবহার করে রোগীর রোগ সর্ম্পকে বোঝার চেষ্টা করেন। এখন অনেক হসপিটালে রোগীদের সুবিধার্থে এন্টারপেন্টারের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এমন কী, অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করেও চিকিৎসা ব্যবস্থা দিচ্ছেন চাইনিজ ডাক্তাররা। এক জরিপে দেখা গেছে চীনের ৪২টি আধুনিকমানের হসপিটাল থেকে এদেশের রোগীরা চিকিৎসা বিজ্ঞানভিত্তিক নিচ্ছেন। যেখানে আন্তর্জাতিকমানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাই বিশ্বমানের হাসপাতালগুলোয় এখন বাংলাদেশের রোগীদের জন্য উন্নত চিকিৎসার দ্বার খুলে গেছে। বিশেষ করে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় রোবোটিক সার্জারি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। যা আগামী বিশ্ব এ চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে অনেক সুফল পাবে। জটিল চিকিৎসাগুলো আরো উন্নত চিকিৎসার পথ সহজ হবে। জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসায় গুণগত মান বজায় রেখেও ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হবে। এছাড়া আইভিএফ ও বন্ধ্যাত্ব ঘুচনে বেবি প্ল্যানিং, হরমোন থেরাপি, কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট, স্টোন ট্রিটমেন্ট, হৃদরোগ, শিশু চিকিৎসা, গ্যাস্ট্রো ও প্লাস্টিক সার্জারি, চোখের উন্নত চিকিৎসায় লেজার ভিশন, কর্নিয়া, রেটিনা ট্রান্সপ্লান্ট, ছানি অপারেশন, ব্রেইন টিউমার, স্ট্রোক, পারকিনসন্স, এপিলেপ্সি সার্জারি, ক্যান্সার চিকিৎসায় কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন, টার্গেটেড থেরাপি, জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট, স্পাইন সার্জারি, স্পোর্টস ইনজুরি চিকিৎসাসহ অন্যান্য জটিল সমস্যা সমাধানে আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে গণচীনে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা দিয়েই শুরু করি। চলতি বছরে চীনে এটি ছিল আমার চতুর্থ সফর। এর আগে বেইজিং, গোয়াংজু ও হাং চৌ ঘুরেছি। কিন্তু কোনো সফরেই চিকিৎসার প্রয়োজনে হাসপাতালের দরজায় যেতে হয়নি। কিন্তু এবার যেতে হলো— যা চীনের স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে আমার ধারণাই পাল্টে দিয়েছে। গত ২২ থেকে ৩০ এপ্রিল সানিয়ায় চলছিল ষষ্ঠ এশিয়ান বিচ গেমস। গেমস কাভার করতে বাংলাদেশ থেকে গিয়েছিলাম হাইনান প্রদেশের এই মনোমুগ্ধকর শহরে। সানিয়ার সমুদ্রসৈকত যেন শিল্পীর ক্যানভাস—নীল জল, ছিমছাম পরিবেশ, নানা বিনোদন আর খেলাধুলার আয়োজন। সমুদ্রের হাওয়া আর চারপাশের আনন্দে নিজেকে আটকে রাখা কঠিন। ২৬ এপ্রিল অন্যদের দেখাদেখি ড্রাগন কাইট ওড়ানোর লোভ সামলাতে পারলাম না। কিন্তু সেই আনন্দই যে পরদিন হাসপাতালের বিছানায় নিয়ে যাবে, কে জানত!
প্রচণ্ড বাতাসে ঘুড়ির সুতা সামলাতে গিয়ে বারবার কব্জি ঘোরাতে হচ্ছিল। একসময় হাতে প্রচণ্ড টান লাগে। তখনও বুঝিনি কতটা বড় বিপদ হয়েছে। পরদিন ব্যথায় যখন কাতর হয়ে উঠলাম তখন বুঝলাম বিষয়টি গুরুতর। আমি তখন জিং হাই হোটেলে। নিচতলার মিনি হাসপাতালে চিকিৎসক হাত দেখে আর দেরি করলেন না। অ্যাম্বুলেন্স ডেকে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন সানিয়া সেন্ট্রাল হসপিটালে। ব্যথায় কাতর হয়ে অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে মিনিট পনেরো-বিশের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম হাসপাতালে। অ্যাম্বুলেন্স থামতেই দেখি— ডাক্তার, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবক সবাই আমাকে ঘিরে আছেন। হাসপাতালের ঝকঝকে পরিবেশ দেখে মনে হলো, বাংলাদেশের কোনো নামী বেসরকারি হাসপাতাল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মাথায় আরেকটি প্রশ্নও এলো—বিল কত হবে? ইমার্জেন্সিতে প্রেসার, পালস, সুগারসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা হলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাকে তৃতীয় তলায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলো।
কিন্তু এবার নতুন সমস্যা—ভাষা। আমি ইংরেজিতে বোঝানোর চেষ্টা করছি, চিকিৎসক চীনা ভাষায় প্রশ্ন করছেন। গুগল ট্রান্সলেট, ভয়েস ট্রান্সলেশন—সবই হলো। এমনকি ড্রাগন কাইট ওড়ানোর ছবি দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টাও করলাম। তবু ঠিকমতো বোঝানো যাচ্ছিল না। হেল্প ডেস্ক থেকে শেষ পর্যন্ত এক তরুণ ইংরেজিভাষী কর্মী এলেন। এবার শুরু হলো আসল চিকিৎসা। চিকিৎসক জানালেন, আমার সমস্যা শুধু কব্জিতে নয়, আঘাতটি এসেছে কনুইয়ের কাছ থেকে। সেখান থেকে ব্যথা কব্জিতে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি প্রথমে চীনা চিকিৎসার একটি পদ্ধতিতে কনুইয়ের কাছে কয়েকটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে চাপ দিতে শুরু করলেন। প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছিল। প্রায় ১৫ মিনিট পর অবাক হয়ে দেখলাম—ব্যথা যেন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে! এরপর তিনি চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার আরেক ধাপে নিতে চাইলেন। কিন্তু সূক্ষ্ম কিছু উপাদান শরীরে প্রয়োগের কথা শুনে ভয় পেয়ে গেলাম। বললাম, ‘না, এটা আমি পারব না।’ চিকিৎসক হাসলেন। বললেন, ‘ঠিক আছে, আরও দুটি অপশন আছে।’ আমি বেছে নিলাম থেরাপি।
এরপর শুরু হলো প্রায় দেড় ঘণ্টার চিকিৎসা। প্রথমে ৩০ মিনিট ফটোথেরাপি। তাপ বেশ তীব্র। তারপর ১৫ মিনিট ইলেকট্রিক থেরাপি। একটি বিশেষ ব্যাগের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। সবসময় একজন চিকিৎসক পাশে ছিলেন। শেষে আবার কিছুক্ষণ হিট থেরাপি। সবশেষে ব্যান্ডেজ খুলে দেখি—হাতের ফোলা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। ব্যথাও অনেক কমে গেছে। কনুই ও কব্জিতে বিশেষ ধরনের প্লাস্টার লাগিয়ে দিয়ে চিকিৎসক বললেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এগুলো নিজে থেকেই খুলে যাবে। সঙ্গে আরও কিছু প্লাস্টার দিয়ে বললেন, প্রয়োজন হলে ব্যবহার করতে। আর সত্যিই—৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হাত প্রায় স্বাভাবিক। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, আমাকে ব্যথানাশক কোনো ওষুধই দেওয়া হয়নি।
আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল শেষে। এত চিকিৎসা, এতগুলো প্রক্রিয়া— কিন্তু কোনো বিল নেই। সরকারি হাসপাতাল। চিকিৎসা ফ্রি। অথচ আমাদের দেশে সরকারী হাসপাতালে প্যারাসিটামল, ফ্ল্যাজিল ছাড়া প্রয়োজনীয় ঔষধটিও বাইরে থেকে আনতে হয়। এমন কী, এক্সরে করতে গেলেও টাকা লাগে! নার্স, ব্রাদারদের খুশি করতে হয়! কিন্তু চায়নায় হলো ভিন্ন অভিজ্ঞতা। সেখানে একজন রোগীকে চিকিৎসক, নার্সরা সেবা ও সুস্থ্য করে তুললে পারলেই ভীষণ খুশি হন। হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটি ইনজুরি থেকে সেরে উঠিনি; সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি একটি প্রশ্নও—চিকিৎসা কি শুধু রোগ সারানোর নাম, নাকি রোগীর সময়, অর্থ ও ভোগান্তির প্রতিও সমান দায়িত্বশীল হওয়ার নাম? সানিয়ার সেই হাসপাতাল আমাকে অন্তত একটি বিষয় শিখিয়েছে—আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি দ্রুততা, সমন্বয়, রোগীর প্রতি মনোযোগ এবং মানুষের নাগালের মধ্যে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়াও একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় শক্তি হতে পারে।