“মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প উপায় খুঁজতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষতে তাগিদ দিয়েছি। কিন্তু সেই কাজে গতি না থাকায় চলমান কার্যক্রমের মুখ থুবড়ে পড়ছে”
— কাজী মাহমুদ ইমাম বিলু, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশন
“সংস্থাটিতে অর্থ ও জনবল সংকট রয়েছে। অপরদিকে বিচারিক কার্যক্রম চলছে। একটা আইনি কাঠামোতেই যেতে হয়, কোনো পক্ষই যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং ন্যায়বিচার যাতে নিশ্চিত হয়, যার কারণে এটা একটু ডিলে হচ্ছে”
— শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন, সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস
চট্টগ্রাম কাস্টমসে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার মামলায় আটকে আছে আমদানিকারকদের হাজার কোটি টাকার পণ্য। এতে শুধু রাজস্বই আটকে আছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্টসহ নানা বিচারিক আদালতে অনেক মামলা চলছে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে। এতে সরকারি অর্থের অপচয়, কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের হয়রানির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, মামলা পরিচালনায় বছরে বরাদ্দ মাত্র ২ লাখ টাকা, তাছাড়া নেই পর্যাপ্ত জনবলও। এর ফলে দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে অর্থ ও জনবল সংকটে ধুঁকছে দেশের বৃহত্তর সমুদ্রবন্দরের চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। আমদানিকারকরা বলছেন, এ বিপুল মামলাজট দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ না নিলে মোটা অংকের অর্থ ও পণ্য নষ্টের পাশাপাশি ভবিষ্যতে সংকট আরও বাড়তে পারে। চট্টগ্রাম কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প উপায় খুঁজতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষতে তাগিদ দিয়েছি। কিন্তু সেই কাজে গতি না থাকায় চলমান কার্যক্রমের মুখ থুবড়ে পড়ছে। তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, এমনিতেই সংস্থাটিতে অর্থ ও জনবল সংকট রয়েছে। অপরদিকে বিচারিক কার্যক্রম চলছে। একটা আইনি কাঠামোতেই যেতে হয়, কোনো পক্ষই যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং ন্যায়বিচার যাতে নিশ্চিত হয়, যার কারণে এটা একটু ডিলে হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের ওপর শুল্ক-কর আদায়ের মাধ্যমে দেশের রাজস্ব আয়ের বড় একটি অংশ আসে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে। ফলে আমদানি কার্যক্রমের গতি, পণ্যের মূল্য ও পরিমাণ এবং শুল্ক-কর আদায়ের ওপর কাস্টমসের রাজস্ব আদায় অনেকটাই নির্ভরশীল।
চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর তরুণ শিল্প উদ্যোক্তা ইয়াসির আরাফাত। তার মালিকানাধীন ছোট একটি লবণ কারখানা রয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে পাকিস্তান থেকে ২২ টন রক সল্ট আনেন। প্রায় ৭ লাখ টাকা মূল্যের এ চালানটি আটকে যায় আইনি জটিলতায়। গত ৪ মাসে মামলা, জরিমানাসহ তার ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। কিন্তু এখন এ লবণ পাননি তিনি। এখন তার কারখানা বন্ধের উপক্রম। শ্রমিকরাও বেকার হয়ে পড়ছে।
ওয়ারদা অ্যান্ড জুবায়ের অ্যাগ্রো ইন্ড্রাষ্ট্রিজ লিমিটেডের ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘র মেটেরিয়াল নাই, শিল্পের কাঁচামাল আমার নাই। আমার উৎপাদন অলরেডি বন্ধের পথে। অনেক স্টাফ ছাঁটাই করে দিছি। এ আমাদের মামলার পেছনে পেছনেই তো আমার প্রায় অনেক টাকা চলে গেছে। ১৫-১৬ লাখ টাকা মামলার পেছনে চলে গেছে। আমার ৮ লাখ টাকার মাল, কন্টেইনার ডেমারেজসহ আসছে ৪০-৪৫ লাখ টাকার ওপরে।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে ১০ হাজার ৪৫৯টি মামলায় আটকে আছে হাজার কোটি টাকার পণ্য। এতে সরকারেরই রাজস্ব আটকা পড়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। এসব মামলার মধ্যে হাইকোর্টে আছে ৯ হাজার ২৮৩টি, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ১৬১টি, কাস্টমস-এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালে ৮৬৩টি, কমিশনার আপিলের কাছে ১৪৮টি মামলা। কিছু মামলা চলছে দুই যুগ ধরেও। বছরের পর বছর এসব মামলা পরিচালনা করতে হচ্ছে কাস্টমসকে। ব্যবসায়ীরাও পড়ছেন নানা রকম আইনি জটিলতায়। ব্যবসায়ীরা জানান, আমদানি নীতি ও বিভিন্ন সংস্থার আইনে সমন্বয়হীনতা, এইচএসকোড জটিলতা, রাসায়নিক পরীক্ষা, ভুল ডিক্লারেশনসহ বিবিধ কারণে মামলার পরিধি বাড়ছে। আমদানিকারকরা বলছেন, এ বিপুল মামলাজট দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ না নিলে মোটা অংকের অর্থ ও পণ্য নষ্টের পাশাপাশি ভবিষ্যতে সংকট আরও বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বিলু বলেন, এই মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যই কিন্তু আমাদের বিকল্প আইডিয়াটা দিয়েছি, সেইটা কিন্তুখুব গতিশীল হয়নি, এখন তো মুখ থুবড়ে পড়েছে আমি যতটুকু দেখছি। এখানে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে এটা, যেটাই হয় সেটা যেন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মো. গোলাম রব্বানি বলেন, কয়েক হাজার কন্টেইনার পড়ে আছে, এগুলিকে অকশনে ছেড়ে দেয়ার জন্য, এর জন্য আলাদা টিমও করেছে। এনবিআর তার যৌথ উদ্যোগে, কাস্টমসের সহিত এবং চেম্বারের সহিত যৌথ উদ্যোগে একটা টিম করে দিয়ে এ ব্যাংক গ্যারান্টিগুলি সেটেলমেন্ট করা উচিত বলে আমি মনে করি।
এদিকে, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রায় ১০ হাজার মামলা পরিচালনার জন্য বরাদ্দ বছরে মাত্র ২ লাখ টাকা। লোকবল ৭-৮ জন। সরকার নজর দিলে এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব।
সংস্থাটির অপর একটি সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ১১ কোটি ২৫ লাখ টন পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়ে থাকে। এই বিপুল পরিমাণ পণ্যের ওপর শুল্কায়ন করেই রাজস্ব সংগৃহীত হয়। কাস্টমসের সিংহভাগ রাজস্ব আসে মূলত হাই-স্পিড ডিজেল, অপরিশোধিত তেল, পাম অয়েল, মোটরগাড়ি ও খুচরা যন্ত্রাংশ, ক্যাপিটাল মেশিনারি, ইস্পাত সামগ্রী এবং বিভিন্ন খাদ্যপণ্য আমদানির শুল্ক থেকে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে দৈনিক গড়ে ২২০ থেকে ২৩০ কোটি টাকা রাজস্ব আহরিত হয়। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মোট রাজস্ব এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোর রাজস্ব আদায়ের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে এই হিসাব পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব পরিসংখ্যানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস মোট ৮১,৪৭১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১২.৩৭% বেশি। এছাড়া, সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে ১ মাসেই আদায় হয়েছে ৭,০৯২ কোটি টাকা (যা দৈনিক গড়ে প্রায় ২২৯ কোটি টাকা)। অর্থবছরের শুরুর মাস জুলাইয়ের মন্দা কাটিয়ে আগস্টে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধির মুখ দেখেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। সদ্য সমাপ্ত আগস্ট মাসে ৭ হাজার ৯২ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি। যদিও নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রাজস্ব আদায় ছিল কম। তবে আগস্টের বড় সাফল্যের ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। এই দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) কাস্টম হাউসের মোট রাজস্ব আদায় দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ১৭ কোটি টাকা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে মোট ১৪ হাজার ১৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ১২ হাজার ৯১৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১ হাজার ৯৯ কোটি ৩ লাখ টাকা। তবে দুই মাসে রাজস্ব আদায় বাড়লেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে এখনো পিছিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট মাসের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২১ হাজার ৫৩০ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৪ হাজার ১৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি রয়েছে ৭ হাজার ৫১২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৬ হাজার ৯২৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই মাসে আদায় হয়েছিল ৭ হাজার ৪২৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ফলে জুলাইয়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায় কমেছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা প্রতিকূলতায় প্রথম মাস জুলাইয়ে রাজস্ব আদায় ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ কমেছিল। তবে আগস্ট থেকে বন্দর কার্যক্রম ও আমদানি-রপ্তানি গতি পাওয়ায় রাজস্ব আহরণে এ ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়। দুই মাস মিলে বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সার্বিক আদায়ে ৮.৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের আগস্ট মাসে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য গতি আসে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ওই একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৫ হাজার ৪৮৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আগস্টে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১ হাজার ৬০২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। প্রবৃদ্ধির হারে যা ২৯ দশমিক ২০ শতাংশ।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, আগস্টে রাজস্ব আদায়ে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা ইতিবাচক। রাজস্ব আদায়ের এই ধারা অব্যাহত রাখতে কাস্টমসের কার্যক্রম আরও গতিশীল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমদানি কার্যক্রমের ওপর রাজস্ব আদায় অনেকটাই নির্ভরশীল। আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলে এবং বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা সম্ভব হলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস মোট ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় ওই বছর রাজস্ব আদায়ে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
মামলাজট সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, আমাদের আইন শাখা আছে, তারা অ্যাটর্নি জেনারেল মহোদয়ের অফিসের সঙ্গে আমরা সার্বক্ষণিক আমরা যোগাযোগ রাখছি। তবে যেহেতু বিচারিক প্রক্রিয়া একটা বিধিবদ্ধ আইন এবং একটা সিস্টেমেটিক ওয়েতে এটা যেতে হয়, যাতে কোনো পক্ষই যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং ন্যায়বিচার যাতে নিশ্চিত হয়, যার কারণে এটা একটু ডিলে হয়।