আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা জালে রাজধানী ঢাকা

এসএম দেলোয়ার হোসেন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

 

  • জঙ্গি সন্দেহে আটক ২৩ জনের মধ্যে ছাড়া পেল ১১ জন
  • প্রবেশ পথসহ দুইশ’র বেশি পয়েন্টে চেকপোস্ট
  • নিষিদ্ধ দলের ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণকারীদের খুঁজছে পুলিশ

“সাম্প্রতিক সময়ে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়া নগরবাসীর জন্য অশনি সংকেত। এগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যও বিব্রতকর। অপরাধ দমনে প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে”
— ড. তৌহিদুল হক, সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কার্যকর নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের ঝটিকা মিছিল ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় নগরজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। একই সঙ্গে সরকারের কঠোর নির্দেশনায় রাজধানীজুড়ে কঠোর নজরদারি শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথগুলোতে বসানো হয়েছে দুই শতাধিক চেকপোস্ট। পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চেকপোস্ট স্থাপন করে যানবাহন ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি চালাচ্ছে। বাড়ানো হয়েছে পুলিশের টহলও। এদিকে গত কয়েকদিনে নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তারের পর অপরাধের ধরণ বুঝে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে পুলিশ। গুলশানে ঝটিকা মিছিলের পর ব্যর্থতার দায়ে থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হলেও এবার গুলশান বিভাগের এডিসিসহ পুলিশের ৪ কর্মকর্তাকে রদবদল করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ১৮ সেপ্টেম্বর তেজগাঁজ কলেজ মসজিদ থেকে জঙ্গি সন্দেহে ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করলেও যাচাই-বাছাই শেষে ১১ জনকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। ১২ জনকে রিমান্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এদিন যাত্রাবাড়ীতেও বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে মিরপুর-১ ও মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে পৃথক ঘটনায় যাত্রীবাহী ২টি বাসে আগুন লেগেছে। তবে এগুলো দুর্ঘটনা, নাকি নাশকতা তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এছাড়া গত ২৪ ঘন্টায় নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে ৫১৫ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে ৪৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এদিকে সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়া নগরবাসীর জন্য অশনি সংকেত। এগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যও বিব্রতকর। অপরাধ দমনে প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, আগের তুলনায় অপরাধ অনেকটাই কমে এসেছে। তবে অপরাধ দমনে ও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে সেখানে স্বেচ্ছায় নির্বাসন গ্রহণ করেন। ২০২৫ সালের ৮ মে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের দেশত্যাগ সমগ্র দেশে বিতর্কের সৃষ্টি করে, যার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান চলাকালে জুলাই গণহত্যার নির্দেশ প্রদানের অভিযোগ করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সরকারের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে তখন জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ সরকারপ্রধান তথা অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারি বাসভবন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচির সূচনা করেন। যা পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যের ব্যানারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনে পরিণত হয়। আন্দোলন তিনটি দাবির উপর ৮ মে হতে ১১ মে পর্যন্ত চলমান ছিল। সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে রাজনৈতিক দলের বিচারের বিধান অন্তর্ভুক্তি এবং জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র জারি। চলমান আন্দোলনের মাঝে ২০২৫ সালের ১০ মে সরকার কর্তৃক কোনো রাজনৈতিক দল, তার অঙ্গসংগঠন বা সমর্থক গোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়ার বিধান রেখে আইন সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১২ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারকার্য শেষ হয়ে রায় না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর সকল সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং রাজনৈতিক দলটির নিবন্ধন স্থগিত করা হয়। এরপর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগষ্টিতা পেয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি। একই সঙ্গে দলটি চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী হন তারেক রহমান। এরপর থেকেই নানা ইস্যুতে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েনে উত্তাপ শুরু হয় রাজনৈতিক অঙ্গনে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের চাপের মুখেও পড়ে বিএনপির সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে ভারতে আশ্রিত পতিত আওয়ামী লীগ সরকার প্রধান শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারের পর দেশের জনমনে এক ধরনের বিরুপ প্রভাব পড়তে শুরু করে। অপরদিকে নিষিদ্ধ এ দলটি আবারও সংঘটিত হওয়ার চেষ্টায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল বের করে। এমনকি বিভিন্ন স্থানে গোপন বৈঠকেও মিলিত হয়। একদিকে সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেদের মনোবল চাঙ্গা করতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ব্যস্ত থাকার মধ্যেই নগরীর বিভিন্ন স্থানে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ সামাজিক অপরাধের পরিধিও ক্রমেই বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংস্থায় ব্যাপক রদবদলও করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি অভিজাত গুলশানে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও গত ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত রাজধানীর অন্তত আটটি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পরপরই সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর নির্দেশনার পর তৎপর হয়ে ওঠে ঢাকা মহানগর পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সংস্থা। এর মধ্যেই গতকাল শনিবার রাজধানীর মিরপুরে দুই বাসে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। সন্ধ্যার পর মিরপুর-১১ নম্বর ও মিরপুর-১ নম্বরে আলাদাভাবে দুই যাত্রীবাহী বাসে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে মিরপুর-১ নম্বর মোড়ে অভিজাত পরিবহনের বাসটিতে আগুনের ঘটনা ঘটে। তবে মিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাফিজুর রহমান বলেছেন, আগুন দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। এদিকে একই দিন সন্ধ্যা ৭টা ১৩ মিনিটে মিরপুর-১১ নম্বরে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। জমজম টাওয়ারের বিপরীত পাশে শিকড় পরিবহনের ওই বাসে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার রাশেদ বিন খালিদ। তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যা ৭টা ১৩ মিনিটে আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। পরে কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। চলন্ত অবস্থায় বাসটিতে আগুন লেগেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত বা আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে তিনি কিছু জানাতে পারেননি তিনি। এদিকে পুলিশ বলছে, বিষয়টি দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজধানীর সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রাজধানী ‘ঢাকা’য় কঠোর গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় এনে কাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই ঢাকার সবকটি প্রবেশপথে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তল্লাশি ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। চেকপোস্টগুলোতে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদও করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
এদিকে গতকাল শনিবার দুপুরে শেরেবাংলা নগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ইমাউল হক জানান, গত ১৮ সেপ্টেম্বর জুম্মার নামাজের পর রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের মসজিদ থেকে জঙ্গি সম্পৃক্ততার সন্দেহে আটক ২৩ জনের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১১ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। অন্য ১২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের হেফাজতে নেয়া হয়েছে। তিনি জানান, গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের মসজিদে গোপন বৈঠক করার সময় ২৩ জনকে আটক করে পুলিশ। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার সন্দেহে এ অভিযান চালানো হয়। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, নিষিদ্ধ একটি জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে তেজগাঁও কলেজের মসজিদে একত্রিত হতে পারেন। ওই তথ্যের ভিত্তিতেই মসজিদটিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় ২৩ জনকে আটক করা হয়। পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, আটক ব্যক্তিরা একই সংগঠনের সদস্য কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের পরিচয়, কর্মকাণ্ড এবং সম্ভাব্য সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা যাচাই করে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই মূলত তাদের আটক করা হয়েছে। আটকদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তদন্তের পর তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) পর এবার সরানো হলো গুলশান জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. সরোয়ার হোসাইনকে। ডিবির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. আমিনুল হক বাপ্পীকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। গতকাল শনিবার ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এ তথ্য জানা গেছে। একই আদেশে চারজন অতিরিক্ত উপ-কমিশনারের দায়িত্বে রদবদল আনা হয়েছে।
আদেশ অনুযায়ী, ডিএমপির ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. জাহিদুল ইসলামকে মিরপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ও মিরপুর বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ফারজিনা নাসরিনকে গোয়েন্দা-মিরপুর বিভাগের পল্লবী জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আমিনুল হক বাপ্পীকে গুলশান জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে ও গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. সারোয়ার হোসাইনকে গোয়েন্দা-ওয়ারী বিভাগের ডেমরা জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে মিছিল করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ। এই ঘটনায় পুলিশের গোয়েন্দা ব্যর্থতা ফুঁটে উঠেছে; যা নিয়ে পুলিশ বাহিনীতে তোলপাড় শুরু হয়। এ ঘটনার পর গুলশানের ডিসি ও ওসিকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।
এদিকে ডিএমপির জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) নিয়াজ মেহেদী জানান, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৫১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে এ তথ্য জানানো হয়। এসব অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মোট ৪৭টি মামলা করা হয়েছে।
ডিএমপির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে রমনা বিভাগে ৩০ জন, লালবাগ বিভাগে ৩৪ জন, ওয়ারী বিভাগে ৬৪ জন, মতিঝিল বিভাগে ৭৬ জন, তেজগাঁও বিভাগে ৯২ জন, মিরপুর বিভাগে ১২০ জন, গুলশান বিভাগে ৩৭ জন, উত্তরা বিভাগে ৪৬ জন এবং গোয়েন্দা বিভাগে ১৬ জন রয়েছেন। অভিযানকালে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, মাদক ও বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে রয়েছে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও ১০টি গুলি। এ ছাড়া তিনটি চাপাতি, পাঁচটি চাকু, বিস্ফোরিত ককটেলের অংশবিশেষ এবং ৫৩টি লোহার পেরেক। মাদকবিরোধী অভিযানে ৯৪ কেজি ৩৫০ গ্রাম গাঁজা, ১১ হাজার ১৬৭টি ইয়াবা এবং ১২১ দশমিক ৩ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি তিন বোতল মদ ও ২০ ক্যান বিয়ারও উদ্ধার করা হয়। অভিযানে একটি প্রাইভেটকার, পাঁচটি মোবাইল ফোন এবং নগদ ৭ হাজার ২০০ টাকা জব্দ করা হয়েছে।
এদিকে ডিএমপি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন্ন কিছু ঘটনার পর সরকারের উপর মহলের নির্দেশে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে ডিএমপির বিভিন্ন ইউনিট। এ রই ধারাবাহিকতায় রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দুই শতাধিক চেকপোস্ট পরিচালনা করছে পুলিশ। একই সঙ্গে ঢাকায় প্রবেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ মুখেও বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে। এসব পথে রাজধানীতে প্রবেশ ও বের হওয়া যানবাহন পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সন্দেহজনক ব্যক্তি ও যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। 
পুলিশের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানান, ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেয়ার ঘটনায় ইতোমধ্যে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও মামলা করা হয়েছে। ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। এছাড়া পুলিশের পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে রাত থেকে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় তাদের টহলও বাড়ানো হয়েছে। নগরীর সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
এদিকে নগরীর নিরাপত্তাসহ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বিষয়য়ে জানতে চাইলে অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক জানান, সাম্প্রতিক সময়ে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়া নগরবাসীর জন্য অশনি সংকেত। এগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যও বিব্রতকর। অপরাধ দমনে প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, আগের তুলনায় অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে অপরাধ দমনে ও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL