★ সাবেক যুবদল নেতা নূর আলম সাইবার দলের সাজ্জাদসহ গ্রেপ্তার ১৭
রাজধানীর শাহ আলী এলাকার রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সংম্পৃক্ততার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেছেন। এছাড়া এ ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের আরেক সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলির নামও আলোচনায় উঠে এলেও এখনও অধরা রয়েছেন মূল হোতারা। তবে এ ঘটনায় পুলিশ আরও দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এরা হলেন- শাহআলী থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নূর আলম (৩৮) এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সাইবার দলের সহ-সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন মিশু মোল্লা (৩৬)। এ নিয়ে ওই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের চিহ্নিত করাসহ গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
পুলিশ জানায়, গতকাল শুক্রবার (২ অক্টোবর) ভোরে মিরপুরের ছোট দিয়াবাড়ী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া শনিবার (৩ অক্টোবর) মিরপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে হামলা-ভাঙচুরের এ ঘটনায় শাহআলী থানা ছাত্রদলের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা কমিটির সদস্য এবং বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সাইবার দলের সহ-সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন মিশু মোল্লাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। পুলিশের দাবি, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় নূর আলম ও সাজ্জাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। সাজ্জাদকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো।
শাহ আলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রাজীব বলেন, হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে এখনও কাজ করছে পুলিশ। গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার শাহ আলী থানায় মামলা করেন। মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কারও কারও বিরুদ্ধে রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। সবাইকে একসঙ্গে রিমান্ডে আনা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ এবং স্থানীয় সূত্রের তথ্যের মাধ্যমে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতাকর্মী এবং সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির কয়েকজন রয়েছেন। গত এক সপ্তাহে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম খোকন শাহ আলী থানা বিএনপির সদস্য এবং মো. আলম শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সভাপতি। স্থানীয় বিএনপি ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য, এই দুজন সরাসরি হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ঘটনাস্থলে তাদের উপস্থিতির তথ্যও নিশ্চিত হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দিতে ব্যবহৃত এক্সক্যাভেটর বহনকারী বড় গাড়ির চালক শহীদুল ইসলামকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভাঙচুরে ব্যবহৃত এক্সক্যাভেটরটি হেমায়েতপুর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এক্সক্যাভেটরটি কারা ভাড়া করেছিলেন, তাদের নাম-পরিচয় এখনো জানতে পারেননি তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন- সমিতির সম্পাদক শাহ আলম, অফিস সহকারী শাহাদাত এবং সদস্য আতিকুর ও কামরুল। এ ছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন শাহ আলী মাজার এলাকার ভাসমান তরুণ।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ওই তরুণেরা টাকার বিনিময়ে ভাঙচুরে অংশ নিয়েছিলেন। তবে তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অন্যদিকে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত ১৪ জনের মধ্যে কয়েকজনেরও হামলায় সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন- শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, সি ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, দারুস সালাম থানার ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সদস্য সচিব শান্ত রহমান, শাহ আলী থানা অটোরিকশা শ্রমিক দলের সদস্য হুজাইফা এবং দারুস সালাম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব হাফিজুর রহমান। তবে তাদের কাউকেই এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা হানিফ মিয়াসহ বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের আরও কয়েকজনের নাম উঠে আসছে। ন্যাক্কারজনক ওই ঘটনায় ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে গুঞ্জন রয়েছে- ওই ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি ও স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ আরও কয়েকজন জড়িত রয়েছে। তবে তাদের কাউকেই এখনও গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ।
পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই ঘটনায় যেই জড়িত থাককু না কেন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবেনা। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি’র ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তবে অনেকে এখনও অধরা থাকলেও তাদের চলাফেরা ও গতিবিধি অনুসরণ করে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততার নিশ্চিত তথ্য মিললেই তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রাকিব খাঁন জানান, রাড্ডা ভাঙচুরের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সাজ্জাদ হোসেন মিশু মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ প্রক্রিয়াধীন। অন্যান্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান গোয়েন্দা পুলিশের এই কর্মকর্তা।
এর আগে, গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছিল, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য হানিফ মিয়া, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব মোস্তফা জগলুল পাশা পাপেলসহ আরও অনেকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছিল পুলিশ। পুলিশ আরও জানায়, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে জাতীয় সংসদ সচিবালয় তার আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সূত্রের বরাতে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাতে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের বিষয়ে নির্দেশনা দেন। দ্রুত পদত্যাগ না করলে দল থেকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথাও জানানো হয়। এর পরদিনই পদত্যাগ করেন মিষ্টি।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন ধরে সমমনা দোকান মালিক সমিতির ব্যানারে রাড্ডার জমি দখলে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বিদেশি একটি রাষ্ট্রের অর্থায়নে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে ১০ কাঠা ওই জমিতে শিশু ও মাতৃসেবা দিয়ে আসছে রাড্ডা ক্লিনিক। গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুর-১ নম্বরে শাহআলী থানাধীন সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরে ভারী যন্ত্র দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির স্থাপনাও গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। ওই হামলার সঙ্গে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। হামলা ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকে তারসহ আরও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার অনুসারী বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।