“বাসের সংখ্যা কম থাকা কোনো মালিক যদি বেশি বাসের মালিকের সমান অংশীদারত্ব দাবি করেন, তাহলে তা বাস্তবসম্মত হবে না। নতুন কোম্পানিতে শেয়ার বণ্টনের পদ্ধতি কী হবে, তা মালিক সমিতি নির্ধারণ করবে”
— কাজী জোবায়ের মাসুদ, দপ্তর সম্পাদক, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি
“চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ ছয়টি রুটের মধ্যে এক বা দুটি রুটের বাস পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে কার্যক্রম শুরু হবে। আগামী দুই মাসের মধ্যে পুরো রাজধানীতে বাস রুট রেশনালাইজেশন পদ্ধতিতে বাস পরিচালনার সম্ভাবনা রয়েছে”
— মোহাম্মদ মসিউর রহমান, নির্বাহী পরিচালক, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ
প্রতিদিনই ঢাকার বিভিন্ন সড়কে চলছে যাত্রীবাহী বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, একই রুটে বিভিন্ন কোম্পানির বাস চলাচল এবং অব্যবস্থাপনা। এসব যেন রাজধানীবাসীর নিত্যদিনের ভোগান্তি। এমন বিশৃঙ্খলা এড়াতে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রম বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় অবশেষে আলোর মুখ দেখছে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রম। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর ছয়টি রুটে চলবে একটি কোম্পানির বাস। তবে বাসমালিকদের মধ্যে শেয়ার বণ্টন নিয়ে মতবিরোধ শুরু হয়েছে। এ মতবিরোধ এখন পরিবহন ব্যবসায়ী মহলে আলোচনার তুঙ্গে। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, বিভিন্ন রুটে কারও বাসের সংখ্যা কম, আবার কারও বেশি রয়েছে। সুতরাং বাসের সংখ্যা কম থাকা কোনো মালিক যদি বেশি বাসের মালিকের সমান অংশীদারত্ব দাবি করেন, তাহলে তা বাস্তবসম্মত হবে না। নতুন কোম্পানিতে শেয়ার বণ্টনের পদ্ধতি কী হবে, তা মালিক সমিতি নির্ধারণ করবে। এদিকে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) বলছে, চলতি সপ্তাহেই এ কার্যক্রমের বাস্তবায়ন শুরু হবে। যদিও বাসমালিকদের মধ্যে শেয়ার বণ্টন নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানী ঢাকায় মোট অনুমোদিত বাস রুট রয়েছে ৪১৮টি। তবে এর মধ্যে বর্তমানে নিয়মিত চালু রয়েছে ৯৮টি রুট। (প্রস্তাবিত নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী এই ৯৮টি রুটকে পুনর্বিন্যাস করে ভবিষ্যতে ৩২টি রুটে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে)। চালু থাকা এসব রুটে ৬৬টি কোম্পানির প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাস চলাচলের আনুষ্ঠানিক অনুমতি রয়েছে। এর বাইরে নিবন্ধিত অনেক বাস থাকলেও নিয়মিত নির্দিষ্ট রুটে চলাচল করে প্রায় ৩ হাজার ৪২৭টি বাস।
বিআরটিএ ও পরিবহন মালিক সমিতির দেওয়া তথ্যে ভিন্ন থাকলেও ঢাকা মহানগরী ও এর আশেপাশের সংযোগকারী এলাকা মিলিয়ে বিআরটিএ-এর প্রধান বাস রুট বা কোম্পানির রুট পারমিট রয়েছে ১১০টিরও বেশি (অন্যান্য লোকাল ও সাব-রুট মিলিয়ে বিভিন্ন অনলাইন ডিরেক্টরিতে প্রায় ১৮০টির মতো রুটও দেখা যায়)। তথ্য বলছে, ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এই বিপুল সংখ্যক রুটকে কমিয়ে ৩২টি ক্লাস্টারে বা প্রধান রুটে রূপান্তর করার কাজ ও নতুন বাস নামানোর পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে সরকার।
বিআরটিএ-এর সর্বশেষ প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা সিটিতে রুট পারমিট প্রাপ্ত নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৭৯৪টি। তবে এর মধ্যে ৮৭০টিরও বেশি বাসের যথাযথ ফিটনেস ক্লিয়ারেন্স নেই। অন্যদিকে, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দাবি অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন রুটে সব মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার পর্যন্ত সচল ও অননুমোদিত বাস যাত্রী পরিবহন করছে। ঢাকার যাত্রী বহনের বাসগুলোকে প্রধানত ৩টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে, সেগুলো হলো- ১. নির্দিষ্ট কোনো কাউন্টার বা স্টপেজ ছাড়াই যেকোনো স্থানে যাত্রী ওঠানামা করায়। ২. সিটিং বা গেটলক সার্ভিস: নির্দিষ্ট স্টপেজ ও আসন ফাঁকা থাকা সাপেক্ষে যাত্রী তোলে। এবং ৩. কাউন্টার ও এসি বাস: নির্দিষ্ট টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে যাতায়াত করতে হয়। সম্প্রতি ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি বিভিন্ন রুটে আরও ৬৯০টি নতুন এসি বাস নামানোর অনুমোদন দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যাত্রী ওঠানামানোর ক্ষেত্রে প্রতিদিনই সড়ক অসম প্রতিযোগিতায় নামে বিভিন্ন রুটের একাধিক বাস। কে কার আগে বেশি যাত্রী তুলবে, এমন ভাবনা থেকেই সড়কের নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়াই ঢাকার ব্যস্ততম সড়কে যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী তুলছে-নামাচ্ছে পরিবহন শ্রমিকরা। আবার চালক নিজের ইচ্ছেমতো যাত্রীর অপেক্ষায় অনির্ধারিত স্থানেও আধঘন্টার মতো অপেক্ষায় থেকে কখনও আবার অন্য পরিবহনকে যাতায়াতের সুযোগ না দিয়ে এলোমেলোভাবে বাস থামিয়ে সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে সড়কে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। এতে কর্মজীবীদের একদিকে যেমন কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে যাত্রী ভোগান্তির পাশাপাশি সড়কে দীর্ঘ যানজটে আটকা পড়ছে মুমুর্ষ রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সও। এমন পরিস্থিতিতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে দীর্ঘদিন ধরেই বাস রুট রেশনালাইজেশনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট রুটে একটি কোম্পানির বাস চলাচল করবে। অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে সেই উদ্যোগ। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর ছয়টি রুটে এ পদ্ধতি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিববাড়ী থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির, গাবতলী থেকে ডেমরা, দুয়ারীপাড়া থেকে সদরঘাট, ঘাটারচর থেকে ডেমরা, ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর এবং মিরপুর-১২ থেকে মাওয়া, এই ছয়টি রুটে চলাচলকারী বাসগুলো একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির নামে পরিচালিত হবে। বাসগুলোর জন্য থাকবে আলাদা রং। এর মধ্যে অন্তত দুটি রুটে চলতি সপ্তাহেই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক কাজী জোবায়ের মাসুদ বলেন, সব বাসমালিকের বাসের সংখ্যা সমান নয়। কারও বাসের সংখ্যা বেশি, আবার কারও কম। এ অবস্থায় বাসের সংখ্যা কম থাকা কোনো মালিক যদি বেশি বাসের মালিকের সমান অংশীদারত্ব দাবি করেন, তাহলে তা বাস্তবসম্মত হবে না। নতুন কোম্পানিতে শেয়ার বণ্টনের পদ্ধতি কী হবে, তা মালিক সমিতি নির্ধারণ করবে। তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট বাসমালিকদের একত্র করার পর নির্দিষ্ট রুটে চলাচলকারী বাসের সংখ্যা অনুযায়ী কোম্পানিগুলোর শেয়ারের শতাংশ বণ্টন করা যায় কি না, সে বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, যে কোম্পানির বাসের সংখ্যা যে রুটে বেশি, নতুন কোম্পানিতে তাদের অংশীদারত্বও সেই অনুপাতে নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান জানান, চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ ছয়টি রুটের মধ্যে এক বা দুটি রুটের বাস পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে কার্যক্রম শুরু করা হবে। তবে একাধিক পরিবহন কোম্পানিকে একত্র করে একটি কোম্পানি গঠন এবং নতুন কোম্পানির নিবন্ধনসংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাসমালিকদের মধ্যে শেয়ার বণ্টন। একই রুটে একাধিক অপারেটরের বাস চলাচল করায় মালিকদের বাসের সংখ্যা ও বিনিয়োগের পরিমাণে পার্থক্য রয়েছে। ফলে নতুন কোম্পানিতে কার কত অংশ থাকবে, তা নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
মোহাম্মদ মসিউর রহমান আরও বলেন, কোনো মালিককে নির্দিষ্ট রুটে বাস পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হলে তিনি সেই রুটে বাস চালাতে চাইবেন কি না, তা নিয়ে শুরুতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল। একইভাবে, একজনকে একটি রুটে দায়িত্ব দেয়া হলে অন্যজনকে ভিন্ন রুটে দায়িত্ব দেয়ার ক্ষেত্রেও আপত্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবে এ চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে পুরো রাজধানীতে বাস রুট রেশনালাইজেশন পদ্ধতিতে বাস পরিচালনা করতে চায় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ।