গুমের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে দেয়ার দাবি মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএস’র

নিজস্ব প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতেই রাখার প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটি বলেছে, কোনও আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনী বা তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন কোনও সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া যাবে না। স্বাধীন তদন্ত সংস্থা, স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অথবা বিশেষ গুম তদন্ত কর্তৃপক্ষকে এ দায়িত্ব দিতে হবে। শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এক আলোচনা সভায় সংগঠনের নেতারা এসব কথা বলেন। আগামীকাল রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে সভার আয়োজন করে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। এতে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ দুই আইনেই স্বতন্ত্র তদন্তপ্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন বলে মত দেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, তদন্ত করার প্রক্রিয়াটা যদি পরিবর্তন না হয় তাহলে আসলে একভাবে ধোঁকা দেয়া হবে সবাইকে। কারণ, নিজের বিচার কখনও নিজে করা যায় না। একই সঙ্গে দুটি আইনই প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

সারা হোসেন বলেন, প্রতিবেশী এমন কোনও দেশ নেই যেখানে এ রকম একটা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এখন সামনে বড় পরীক্ষা হলো সংসদে স্থায়ী কমিটি আইন দুটি নিয়ে কী করবে সেটা। তারা বিশেষজ্ঞদের মতামত কতটা আমলে নেবেন, তা এখন দেখার বিষয়।

আদালতের ভূমিকাও আরেকটি বড় পরীক্ষা বলেও মনে করেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, আমাদের আদালত তো ব্যর্থ হয়েছে। আদালতের কাছে প্রায় কেউই যেতে পারেনি। যারা গেছেন তারা কিন্তু কোনও ধরনের সুরাহা সেখান থেকে পাননি। এটা সরকারের জন্যও বড় পরীক্ষা যে তারা আগের মতোই নীরবতা পালন করবেন? আদালতকে কোনও ধারণা দেবেন না। তারা কি পুরা প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করবেন? নাকি সেখানে এসে তারা একটা জবাবদিহিতার সুযোগ তৈরি করে দেবেন প্রথমবারের মতো।

গুমসংক্রান্ত সাবেক তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, মানবাধিকার কমিশনের হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগঠিত গুমের ঘটনা তদন্তের কার্যকর ক্ষমতা না থাকলে এমন আইন থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। তিনি বলেন, এত পয়সাকড়ি খরচ করে আমরা পাঁচজন কমিশনারকে পালব, গাড়ি দেব, সিকিউরিটি দেব, অফিস দেব, কোনো দরকার নেই।

নূর খান বলেন, প্রস্তাবিত আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগঠিত গুমের ঘটনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতা দিতে হবে। শুধু বাহিনীর কাছ থেকে তথ্য নেয়া বা তাদের মাধ্যমে অনুসন্ধানের ব্যবস্থা রেখে কমিশনকে কার্যত নির্ভরশীল করে রাখা হলে তা কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করবে না।

ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার ভুক্তভোগী মীর আহমাদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান) বলেন, বর্তমান সংসদ হলো মজলুমদের মিলনমেলা। সেখানে এমন কোনও সংসদ সদস্য নেই, যিনি বা তার পরিবার গত ১৭ বছরে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হননি। সেই মজলুমদের হাত দিয়ে এমন একটি আইন পাস হতে চলেছে, যা গুমের পথকে সুগম করবে।

আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, বলা হয় যে নিরাপত্তা বাহিনীর সুবিধার্থে আইনগুলো সেভাবে করা হচ্ছে। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীরাই তো এই জিনিসগুলো করে। এবং যারা নির্বাচিত প্রতিনিধি, তাদের দায়িত্ব এই নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করা। তারা যদি নিয়ন্ত্রণ না করে নিরাপত্তা বাহিনীর ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালনা করেন, তাহলে তারা আর জনপ্রতিনিধি থাকলেন না। শহিদুল আলম বলেন, সরকারকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে...নিরাপত্তা বাহিনীকে খুশি করা আপনাদের কাজ না, আপনাদের নিজের স্বার্থ দেখা আপনাদের কাজ না; জনগণ যারা আপনাদের এনেছে, তাদের স্বার্থেই আপনাদের কাজ করার কথা।

সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, ‘আমরা তো গুম করব না, তাহলে এত চিন্তা কেন?’ যদি গুম না–ই করবেন, তাহলে দরজাটা খোলা রাখছেন কেন? যদি দরজা খোলা থাকে, কেউ না কেউ সে দরজা দিয়ে একসময় ঢুকবে।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL