ডেঙ্গু চিকিৎসার ব্যয় বহনে দিশেহারা নিম্নবিত্তরা

এসএম দেলোয়ার হোসেন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

★ সরকারি হাসপাতালে রোগীপ্রতি ন্যূনতম খরচ ১২-৩৫ হাজার টাকা
★ বেসরকারি হাসপাতালে রোগীপ্রতি ব্যয় হচ্ছে লাখ টাকার ওপরে
★ অসুস্থতায় কাজ করতে না পারায় চাকরি হারানোর শঙ্কায় শ্রমিকরা

“যেসব রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে ঢাকায় আসছে, তাদের সঙ্গে থাকা পরিবারের যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার খরচ চিকিৎসা সামগ্রীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যয় বাড়ছে। জ্বরে একটা মানুষ মারা যাবে, এটা মানাটা কঠিন। দায়িত্বশীলদের বিষয়টি ভাবা দরকার”
— অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বরে কেউ না কেউ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। এ রোগ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না কোমলমতি শিশু থেকে শুরু করে নানা বয়সের নারী-পুরুষ। বিশেষ করে ডেঙ্গু রোগে বিত্তশালীরা আক্রান্ত হলে ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করলেও খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। অর্থাভাবে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকেই। প্রাণঘাতী ডেঙ্গুরোগে আক্রান্তদের বেশিরভাগ মানুষই মধ্য ও নিম্নবিত্তরা। এসব পরিবারের কেউ এ রোগে আক্রান্ত হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ চিকিৎসা সামগ্রীসহ অন্যান্য উপকরণ কিনতে গিয়ে প্রতিনিয়তই হিমশিম খাচ্ছেন। আয়ের সঙ্গে ডেঙ্গু চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকছেন অনেকে। অর্থের যোগান দিতে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন নিম্নবিত্তরা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডেঙ্গুর ধরা পড়লে সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিনের ওষুধপত্রসহ অন্যান্য খরচ বহন করতে দৈনিক-মাসিক বেতনের টাকা বাদ দিয়েও বাড়তি টাকা ঋণ করে চিকিৎসার খরচ যোগাতে হচ্ছে। তাদের দাবি, সরকারের উদ্যোগে ডেঙ্গু চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে ও সহজিকরণে ব্যয়ের পরিধি কমিয়ে আনতে হবে। এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বর ধনী-গরিব বোঝে না। পরিস্কার বা অপরিচ্ছন্ন স্থানেও কোনো না কোনো ত্রুটি বা অসচেতনতার কারণে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটতে পারে। তবে এ রোগ থেকে নিরাপদে থাকতে হলে প্রথমত, জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণসহ ডেঙ্গুর বিস্তাররোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। তৃণমূলেও তদারকির পরিধি বৃদ্ধি করা জরুরি। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বলছেন, যেসব রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে ঢাকায় আসছে, তাদের সঙ্গে থাকা পরিবারের যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার খরচ চিকিৎসা সামগ্রীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যয় বাড়ছে। জ্বরে একটা মানুষ মারা যাবে, এটা মানাটা কঠিন। দায়িত্বশীলদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখা দরকার। ঢাকা মেডিকেলসহ সরকারি- বেসরকারি বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে রোগী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

ঢাকা মেডিকেলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা মেডিকেলের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে এক সপ্তাহ ধরে ভর্তি থেকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিচ্ছেন  
নারায়ণগঞ্জের অপু শিকদার। তিনি বলেন, গত দুই সপ্তাহ আগে আমার শরীরে থেমে থেমে জ্বর উঠতে থাকে। প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসিতে জ্বর উপশমের ট্যাবলেট সেবন করেন। এভাবে চলতে থাকলেও কিছুদিনের মধ্যেই অস্থিরতা ও শরীর দুর্বল হয়ে ওঠে। পরে নারায়ণগঞ্জ সদর হাসপাতালে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এক চিকিৎসককে দেখাই। পরে রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টে আমার শরীরে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। এরপর সেখানে ভর্তি থেকে কিছুদিন চিকিৎসা নিলেও কোনো উন্নতি না হওয়ায় ঢাকা মেডিকেলে এক সপ্তাহ আগে ভর্তি হয়েছি। চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছি। এক প্রশ্নের জবাবে অপু শিকদার বলেন, আমি পেশায় নারায়ণগঞ্জের একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক। তার শয্যাপাশে বসে সুস্থতার জন্য মাতায় হাত বুলাচ্ছেন অপুর স্ত্রী। তিনি জানান, গত একসপ্তাহ যাবৎ ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করছেন তার স্বামী পোশাকশ্রমিক অপু শিকদার। এরমধ্যেই স্বামীর চিকিৎসায় খরচ হয়েছে অন্তত ২৫ হাজার টাকা। শেষ পর্যন্ত এ খরচ কততে গিয়ে ঠেকে, তা অনিশ্চিত। তবে এই ব্যয় মেটাতে হিমশিম অবস্থা পুরো পরিবারের। অপু শিকদারের স্ত্রী বলেন, এখন পর্যন্ত ধরেন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা গেছে। আর রিলিজ দিলে হয়তো বাসা পর্যন্ত যাইতে যাইতে ৩০ হাজার টাকার ওপরে খরচ হয়ে যাবে। তবে চিকিৎসক বলেছেন, শারীরিক সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আরও প্রায় দুই সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। এখন চাকরি থাকে কি-না তা নিয়েও যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। শুধু অপু শিকদারই নয়; ঢাকা মেডিকেলে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এমন অন্তত ১০-১৫ জনের সঙ্গে চিকিৎসমার ব্যয় নিয়ে কথা হয়। নানা শ্রেণিপেশার এসব রোগীদের তথ্যমতে, প্রথমেই যারা সরাসরি সরকারি মেডিকেলে এসেছেন, তাদের খরচ হয়েছে অন্তত ১২ থেকে ১৫ হাজার। ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীদের ক্ষেত্রে এ খরচ ৩৫ থেকে ৪০ হাজার। সরকারি হাসপাতালে স্যালাইন, প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ বিনামূল্যে পেলেও খরচ হয় খাবার, যাতায়াত, বিভিন্ন পরীক্ষায়। রোগীদের মধ্যে রেহানা নামের একজন বলেন, ‘যে রক্তের প্লাটিলেটটা তো অনেক কমে যায়। ওইটা আরকি দেখার জন্য প্রতিদিন সিবিসি করা লাগে। অন্য একজন বলেন, এই পর্যন্ত গাড়ি-ঘোড়া ভাড়া দিয়ে মনে করেন দেখা গেছে যে আমার ১৫-১৬ হাজার টাকা শেষ হয়ে গেছে। তবে রিলিজ পাওয়ার আগপর্যন্ত আরও কত ব্যয় হবে তা এখনও নিশ্চিত নই।

এদিকে ঢাকা মেডিকেল কর্তৃপক্ষ বলছে, ঢামেক হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ২৫-৩০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা সেবা নিতে আসছেন। এদের কাউকে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা ও জরুরি করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দিয়ে তাৎক্ষণিক ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ভর্তি ২৫০ জনের বেশি ডেঙ্গু রোগী রয়েছেন। চিকিৎসায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি আছে বলেও দাবি তাদের।

সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট র্সূত্রে জানা যায়, সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসায় একজন রোগীর ব্যয় হচ্ছে কমপক্ষে ১২ হাজার টাকা, আর ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীদের ক্ষেত্রে অন্তত ৩৫ হাজার টাকা। এদিকে, বেসরকারি হাসপাতালে এ ব্যয় বেড়ে লাখ লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। এছাড়া চিকিৎসার সময় ও চিকিৎসা পরবর্তী শারীরিক দুর্বলতায় কাজ করতে না পারায় চাকরি যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন কারখানা শ্রমিক থেকে শুরু করে নিম্নবিত্তরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা বলছে, বেসরকারি বি ক্যাটাগরির হাসপাতালে খরচ অন্তত ৫০ হাজার। প্রথম শ্রেণির হাসপাতালে সেটি কয়েক লাখ পর্যন্ত হতে পারে। প্রতিরোধযোগ্য এমন ব্যয়ে বাড়তি বোঝা তৈরি করছে সাধারণ মানুষের।

ঢাকা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আতিকুল্লাহ বলেন, এ ব্যাপারে যথেষ্ট মানে কর্তৃপক্ষ সজাগ রয়েছে। ম্যানেজমেন্ট মানে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য প্রিপেয়ার্ড। তিনটা ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ডেডিকেটেড ওয়ার্ড করা হয়েছে। পেশেন্ট আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো সাপোর্ট পাচ্ছে। কোনো সংকট এই মুহূর্তে তেমন নাই।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ঢাকার প্রগতি সরণির এ এম জেড হাসপাতালের ডেঙ্গুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা.আহমেদুল কবিরের মতে, এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বর ধনী-গরিব বোঝে না। পরিস্কার বা অপরিচ্ছন্ন স্থানেও কোনো না কোনো ত্রুটি বা অসচেতনতার কারণে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটতে পারে। তবে এ রোগ থেকে নিরাপদে থাকতে হলে প্রথমত, জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণসহ ডেঙ্গুর বিস্তাররোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। তৃণমূলেও তদারকির পরিধি বৃদ্ধি করা জরুরি। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, বাইরে থেকে রোগী যদি আসে, তাহলে তাদের আসা-যাওয়া, থাকা, অ্যাটেনডেন্টের খরচ, এগুলো বেড়ে যায়। এ ক্যাটাগরি হাসপাতালে তাহলে তো এক লাখের ওপরে যেত। এটা থেকে বড় জিনিস যেটা, সেটা হচ্ছে যে তিন-চার দিনে জ্বরে একটা মানুষ মারা যাবে, এটা তো কোনো সভ্য সমাজের জন্য মেনে নেয়াটা কঠিন, তাই না? এটা যদি হতো যে এটাকে প্রিভেন্ট করা যাচ্ছে না, যেকোনো প্রিভেন্টের উপায় নাই, আমরা অসহায় হয়ে গেছি, তাহলে এক কথা ছিল। সেটা তো না। চিকিৎসায় সরাসরি ব্যয়ের সঙ্গে কাজে অনুপস্থিতি, সুস্থ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় শারীরিক দুর্বলতা, এমনকি পুরো পরিবার রোগীর সঙ্গে থাকায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের। বাড়তি আর্থিক বোঝা বছরজুড়ে বয়ে নিতে হচ্ছে বলে মনে করছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি আরও বলেন, যেসব রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে ঢাকায় আসছে, তাদের সঙ্গে থাকা পরিবারের যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার খরচ চিকিৎসা সামগ্রীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যয় বাড়ছে। জ্বরে একটা মানুষ মারা যাবে, এটা মানাটা কঠিন। দায়িত্বশীলদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখা দরকার।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL