* একদিনে প্রাণ কাড়ল আরও ৫ শিশুর
* মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫৫ জনে
* গত ২৪ ঘন্টায় আক্রান্ত ১০৩১ জন
“হাম নিয়ন্ত্রণে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তৃণমূলে শিশু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি”
- অধ্যাপক ডা. মো. আবিদ হোসেন মোল্লা, শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল
দেশজুড়ে হাম ও হামের উপসর্গের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই বাড়ছে। এর ফলে প্রাণঘাতী এ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও প্রাণহানি ও হাসপাতালে ভর্তির খবর শোনা যাচ্ছে। এতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রাণঘাতী এ রোগে প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। নবজাতক ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এর প্রধান লক্ষণ হলো উচ্চ জ্বর, সর্দি, কাশি, লাল ও পানিযুক্ত চোখ এবং মুখ ও গলার ভেতরে ছোট সাদা দাগ ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তৃণমূলে শিশু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, বিগত সরকারের সময় যথাযথ টিকাদাম কর্মসূচি চালু না থাকায় এর প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। তবে বর্তমানে টিকাদান কর্মসূচি চালু করায় এখন তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এদিকে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সেই সঙ্গে একই সময়ে নতুন করে আরও ১ হাজার ৩১ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই ভিড় করছে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শত শত কোমলমতি শিশু। এদের বয়স ২ মাস থেকে প্রায় ৫ বছর। নিজের সন্তানকে এ রোগ থেকে বাঁচাতে দেশের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুঁটছেন অভিভাবকরা। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকদের পরামর্শে জরুরি প্রয়োজনীয় সেবাও গ্রহণ করছে আক্রান্ত শিশুরা। এছাড়া কিশোর-যুবকরাও আক্রান্ত হচ্ছেন হাম ও হামের উপসর্গে।
হামে আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকরা বলছেন, হামের প্রাদুর্ভাব রোধে সরকারের পরিকল্পনায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা ও যথাযথ চিকিৎসা সেবা নেই। ঢাকা শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিনই নানা রোগে আক্রান্ত শত শত শিশু ঢাকা শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে ভিড় করছে। অনেক অভিভাবক চিকিৎসকদের নির্ধারিত কক্ষের বাইরে রোগাক্রান্ত শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কক্ষের ভেতরে শিশুদের আর্তনাদ। পরম আদরে কান্নারত শিশুটিকে বুকে আগলে রেখে কোমলস্পর্শে কান্না থামানোর চেষ্টা করছেন অনেক মায়েরা। সেবা নিতে আসা রাজধানীর মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের বাসিন্দা গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার বলেন, আমার ছেলের বয়স প্রায় দেড় বছর। কিছুদিন ধরে আমার ছেলে খাবার খাচ্ছে না। প্রায়ই অস্বস্তিবোধ করে কান্না করতে থাকে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে লালচে ফুসকুড়ি উঠেছে এবং জ¦রও রয়েছে। তাই ফার্মাসিস্ট ও প্রতিবেশীদের পরামর্শে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত কিনা, তা নিশ্চিত হতে ঢাকা শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে এক চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এসেছি। আবার অনেক শিশুর মায়েরা বলছেন, চিকিৎসক জরুরি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে কিছু ওষুধপত্র লিখে একটি প্রেসক্রিপশন হাতে তুলে দেন। এরপর বলেছেন, পরীক্ষার রিপোর্ট তাকে দেখাতে। এছাড়া ওষুধগুলো নিয়মিতভাবে সেবন করিয়ে একসপ্তাহ পর আবার দেখা করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে কি সমস্যা তা পরীক্ষার রিপোর্ট না দেখে বলতে পারবেন না বলে জানান। একই কথা জানালেন আরও অনেক অভিভাবক।
এমন দৃশ্য দেখা গেছে রাজধানীর সেগুন বাগিচায় বারডেম-২ মা ও শিশু হাসপাতালে। সেখানেও শিশু ওয়ার্ড ও বহির্বিভাগে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের ডাক্তার দেখাতে ভিড় করেছেন। কেউ কেউ ডাক্তারের পরামর্শ ও ওষুধপত্র নিয়ে পরীক্ষাগারে ছুটে যাচ্ছেন। তবে পরীক্ষায় ব্যয় বেশি বলেও জানান ভুক্তভোগী কয়েকজন অভিভাবক।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নবজাতক ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ বারডেম জেনারেল হাসপাতাল এবং ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. মো. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এর প্রধান লক্ষণ হলো উচ্চ জ্বর, সর্দি, কাশি, লাল ও পানিযুক্ত চোখ এবং মুখ ও গলার ভেতরে ছোট সাদা দাগ ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিশুদের প্রচুর বিশ্রাম দিতে হবে, পুষ্টিকর তরলজাতীয় খাবার দিতে হবে। জ¦র হলে সিরাপ বা ট্যাবলেট না খাইয়ে ভেজা কাপড় দিয়ে বারবার শরীর মুছে দিতে হবে। ঠাণ্ডা পানীয়, স্যুপ ও ফলের জুস খাওয়াতে হবে। বিশেষ প্রয়োজনে অবহেলা না করে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এছাড়া এ রোগটি কিশোর-যুবকদের শরীরেও দেখা দিতে পারে। তাই ভয় না পেয়ে শিশুদের প্রতি অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তৃণমূলে শিশু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে টিকাদান কর্মসূচি মনিটরিং করাও জরুরি।
চিকিৎসকদের মতে, হামের সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে- উচ্চ জ্বর, কাশি, সর্দি এবং চোখ লাল হওয়া। পরে কানের পেছন থেকে শুরু করে শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়। রোগ জটিল আকার ধারণ করলে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস, অন্ধত্ব কিংবা কানের সংক্রমণ হতে পারে। শ্বাসকষ্টকে বিপজ্জনক লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দেশের বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মূল কারণ ছিল কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটা। তৎকালীন সরকারের সময়ে লকডাউন, সরবরাহ সংকট এবং টিকা নিয়ে দ্বিধার কারণে সে সময় অনেক শিশু নির্ধারিত ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে শুধু ঢাকা বিভাগেই ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গে আরও ২ শিশুর প্রাণহানি হয়েছে। তাদের নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও উপসর্গে মোট ৯৫৫ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গে ৮৫৬ জন ও হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে আরও ৯৫৬ জনের মধ্যে রোগটির উপসর্গ দেখা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৯২ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে মোট ১৮ হাজার ৭২৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৯ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন।