★ ট্রানজিটসহ উড্ডয়ন বাতিল হলো ৬১টি ফ্লাইট
★ চরম অনিশ্চয়তায় দুর্ভোগে ৯ হাজার ২৬৯ যাত্রী
★ এয়ারলাইন্সগুলোকে সতর্কতাসহ জরুরি নির্দেশনা বেবিচকের
“ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি বা অন্যান্য ইমিগ্রেশন সহায়তার প্রয়োজন হলে এয়ারলাইন্সগুলোকে ঢাকার সৌদি দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের সহয়তা প্রদানসহ ফ্লাইট নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্টদের মনিটরিং করতে হবে”
— গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ, নির্বাহী পরিচালক, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে গত শনিবার (১০ অক্টোবর) রাতে সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এ হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১২ জন নাগরিক নিহত ও ৩৫০ জন আহত হয়েছে। এদের মধ্যে গুরুতর আহত ৪ বাংলাদেশিসহ অনেককেই নিবিড় পর্যবেক্ষণে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। ভয়াবহ এ হামলায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় বাংলাদেশসহ বিশ্বনেতারা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। ওই ঘটনার পর থেকে সৌদি কর্তৃপক্ষ যাত্রী ও এয়ারলাইন্সগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে রিয়াদ বিমানবন্দরে সব ধরণের বিমান ওঠা-নামায় সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি অন্যান্য নিরাপদ বিমানবন্দর ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছে। এরই মধ্যে শুধু মক্কা-মদিনা ছাড়া সৌদির বিভিন্ন বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার না করার হুঁশিয়ারি দিয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে হুথি বিদ্রোহীরা। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে বিধিনিষেধের কারণে এ পর্যন্ত ঢাকা থেকে সৌদিগামী ৬১টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে নিরাপত্তা ইস্যুতে চরম এক অনিশ্চয়তা ও চাকরি হারানোর শঙ্কায় দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন ৯ হাজার বেশি যাত্রী। এদিকে বেবিচক বলছে, পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোর ফ্লাইট সময়সূচি পুনর্র্নিধারণের কাজ চলছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ বলছেন, ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি বা অন্যান্য ইমিগ্রেশন সহায়তার প্রয়োজন হলে এয়ারলাইন্সগুলোকে ঢাকার সৌদি দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের সহয়তা প্রদানসহ ফ্লাইট নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্টদের মনিটরিং করতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মধ্যপ্রচ্যে ত্রিমূখী যুদ্ধের জেরে অতি সম্প্রতি ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক সপ্তাহে মোট ৩ বার হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে গত ৮ অক্টোবর বা আগের দিনগুলোতে অর্থাৎ গত সপ্তাহে প্রথম দুটি হামলা চালানো হয়। এতে তিনজন সৌদি নাগরিক নিহত হন এবং একটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্বিতীয় দফায় গত ৮ অক্টোবর রিয়াদের ওপর পরপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি বিমানবন্দরে এবং অন্যটি বিমানে হতাহতের ঘটনা ঘটে। গত শনিবার (১০ অক্টোবর) তৃতীয়বারের মত মারাত্মক প্রাণঘাতী একটি বড় হামলা চালানো হয়। তৃতীয় হামলার দিনে ১২ জন নিহত এবং ৩৫০ জনের বেশি আহত হন। নিহতদের মধ্যে ৪ জন সৌদি নাগরিক, ২ জন বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান, মিসর ও ভারতের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। এই হামলার পর দেশটির কর্তৃপক্ষ কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে হুথি বিদ্রোহীদের ভয়াবহ হামলার পর বর্তমানে সেখানে চরম উত্তেজনা ও অচলাবস্থা বিরাজ করছে। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সব ধরনের ফ্লাইট পরিচালনা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। রিয়াদগামী সব ফ্লাইট বাতিল বা জরুরি প্রয়োজনে দেশটির অন্যান্য বিমানবন্দরে ডাইভার্ট করা হচ্ছে। বিমানবন্দর এলাকায় ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বিমানবন্দরের সব প্রবেশদ্বার ব্লক এবং লাইটগুলো স্তিমিত করে রাখা হয়েছে। নিহত ২ বাংলাদেশিরা হলেন- বগুড়ার মো. শাহেদ আহম্মেদ এবং কুমিল্লার মো. নাসরুল্লাহ। এছাড়া ৪ জন বাংলাদেশিসহ গুরুতর আহত অন্যান্য বিদেশি নাগরিকরা আইসিইউতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স রিয়াদে তাদের ফ্লাইট স্থগিত করেছে। এদিকে হুথি বিদ্রোহীরা আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে সৌদি আরবের আকাশসীমা এড়িয়ে চলার জন্য কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তারা পবিত্র মক্কা ও মদিনার আকাশসীমা ছাড়া পুরো সৌদির আকাশকে ‘সামরিক অভিযানের এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সৌদি জোট এই হামলাকে “যুদ্ধাপরাধ” আখ্যা দিয়ে কঠোর জবাব দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে। ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকারসহ বিশ্বনেতারা।
এদিকে ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম “ফ্লাইটরাডার-২৪”-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলার পর থেকে রিয়াদগামী বিমানগুলোকে অন্য বিমানবন্দরে পাঠানো হয় অথবা বাতিল করা হয়। যাত্রীদের বিমানবন্দরে রওনা হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের অবস্থা জেনে নিতে বলা হয়। কানাডার দূতাবাসও নাগরিকদের রিয়াদ বিমানবন্দরে যাতায়াত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। দূতাবাসের সতর্কবার্তায় চলমান সামরিক তৎপরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রিয়াদের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে একাধিক দেশের যাত্রীদের উপর। যাদের রিয়াদ হয়ে অন্য দেশে যাওয়ার কথা, তাদের কানেক্টিং ফ্লাইটও ব্যাহত হতে পারে। যুক্তরাজ্য দূতাবাসও এই ঘটনাকে একটি “গুরুতর ঘটনা” হিসেবে ঘোষণা করে ব্রিটিশ নাগরিকদের বিমানবন্দর এলাকা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। এই অবস্থায় পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের পরিস্থিতি আরও কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের। ধারাবাহিক প্রাণঘাতী হুতি হামলার পর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্যক্রম স্থগিত রাখার মেয়াদ বাড়িয়েছে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
বার্তা সংস্থা এএফপি এ প্রকাশিত খবরে বলা হয়, সৌদি কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানায়, ‘বিমানবন্দরের স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ও সেগুলো পরিচালনার প্রস্তুতি যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রাখার মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিকভাবে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত এর সময় সীমা নির্ধারণ করা হলেও হুথি বিদ্রোহীদের অব্যাহত হুঁশিয়ারিতে সৌদি কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন। তবে কখন বিমানবন্দরের কার্যক্রম আবার শুরু হবে, সে বিষয়ে বিবৃতিতে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘুরে ভুক্তভোগী যাত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পূর্ব নির্ধারিত সৌদিগামী ফ্লাইট ধরতে প্রতিদিনই শত শত যাত্রী বিমানবন্দরে ভিসা-টিকিট ও পাসপোর্ট নিয়ে ভিড় করছেন যাত্রীরা। এদের অনেকেই আবার ভারতে ট্রানজিট হয়ে সৌদি পৌঁছার কথা। কিন্তু বিমানবন্দরে এসে তারা জানতে পারছেন ঢাকা থেকে সৌদিগামী সব বিমান উড্ডয়ন বন্ধ রয়েছে। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছে ফ্লাইট বন্ধের খবরে যাত্রীরা হতাশায় ভুগছেন। একদিকে ভিসার মেয়াদ শেষ হলে চাকরি হারানোর শঙ্কা, আরেকদিকে ঢাকার বিমানবন্দরের ভেতরে বাইরে অবস্থান নিয়ে থাকা-খাওয়ায় বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে। হামলার তৃতীয় দিনে ১০ অক্টোবর সৌদিগামী ৭টি ফ্লাইট স্থাগিত করে বিমান কর্তৃপক্ষ। এতে ওইদিন বিমানবন্দরে ফ্লাইটের অপেক্ষা করে দিন-রাত চরম দুর্ভোগে পড়েন ২ হাজার ৫৩২ জন যাত্রী। পাশাপাশি নতুন করে টিকিটের তারিখ পরিবর্তন, যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, সৌদিয়া, রিয়াদ এয়ার ও শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সৌদিগামী যাত্রীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ হাজার ২৬৯ জন যাত্রী।
ফ্লাইটের অপেক্ষায় থাকা সৌদিগামী যাত্রীরা জানান, পূর্ব কোনো এসএমএস বা ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে আগার কোনো বার্তা না পাওয়ায় তারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাস, ট্রেন কিংবা ব্যক্তিগত পরিবহনে ঢাকায় এসে বিমানবন্দরে পৌঁছেন। কিন্তু সেখানে এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে তাদের আবারও নতুন করে যাত্রার পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।
বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, রিয়াদগামী যাত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। কেউ টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে নিয়ে এয়ারলাইনসের কাউন্টারে খোঁজ নিচ্ছেন, কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরবর্তী করণীয় জানার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ফ্লাইট কবে কখন চালু হবে, টিকিটের তারিখ কীভাবে পরিবর্তন করতে হবে কিংবা বিকল্প পথে যাত্রা করা যাবে কি না, এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সৌদি গমনেচ্ছুক অনেক যাত্রী। প্রবাসীদের অনেকেই সৌদি আরবের ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট কেটেছেন। ফলে টিকিট পরিবর্তন বা নতুন করে যাত্রার ব্যবস্থা করতে গিয়ে তাদের সংশ্লিষ্ট এজেন্সি ও এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হচ্ছে। কর্মস্থলে নির্ধারিত সময়ে ফিরতে না পারলে চাকরি ও আয় নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন যাত্রীরা।
বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষমান রিয়াদপ্রবাসী জসিম উদ্দিন বলেন, রিয়াদে যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট কেটে আগস্টে দেশে এসেছিলাম। পূর্ব নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে আমার ফ্লাইট ছিল। এখন হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ার খবরে বিপাকে পড়েছি। নোয়াখালী থেকে ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এখন কবে যেতে পারব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। সৌদি আরবে আমার কাজ আছে, সময়মতো ফিরতে না পারলে সমস্যায় পড়তে হবে। ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হলে আমাদের ভোগান্তি কিছুটা কমত। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিজানুর রহমানেরও যাওয়ার কথা ছিল সৌদি আরবের রিয়াদে। তিনি ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের টিকিট কেটেছেন। ভারতের মুম্বাই হয়ে রিয়াদে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তার যাত্রাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ভারতের মুম্বাই হয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখন শুনছি, মুম্বাইয়ে যাদের ট্রানজিট, তাদের বোর্ডিং দেওয়া হচ্ছে না, মুম্বাই থেকে নাকি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এখন টিকিট কেটেও যেতে পারব কি না, সেই নিশ্চয়তা নেই। সরাসরি ফ্লাইট না পেয়ে বিকল্প পথে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। এখন সেই পথও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে আর্থিক ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছি। একের পর এক রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিলের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসী শ্রমিকেরা।
এদিকে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, সৌদির এমন পরিস্থিতির কারণে গত ১০ অক্টোবর রাত থেকে এখন পর্যন্ত সরাসরি ও ট্রানজিট মিলিয়ে মোট ৬১টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২২টি সরাসরি এবং ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট রয়েছে। সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ৯টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ২টি, সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ৪টি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের ৭টি ফ্লাইট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে ট্রানজিট ফ্লাইটগুলোর মধ্যে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের ১৬টি, সালাম এয়ারের ৩টি, ইজিপ্ট এয়ারের ১টি, এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ৯টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৫টি এবং ফ্লাই দুবাইয়ের ৫টি ফ্লাইট প্রভাবিত হয়েছে। এসব ফ্লাইট বাতিল ও ব্যাহত হওয়ার ফলে সর্বমোট ৯ হাজার দুইশ ৬৯ জন বিমানযাত্রী চরম অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোর ফ্লাইট সময়সূচি পুনর্র্নিধারণের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
এদিকে সৌদি আরবের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে দেশটির বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সৌদিগামী বা ট্রানজিট ফ্লাইট পরিচালনাকারী সব এয়ারলাইন্সকে জরুরি ভিত্তিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, এয়ারলাইন্সগুলোকে অবিলম্বে এসএমএস, টেলিফোন কল, ই-মেইল, ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ফ্লাইট বিলম্ব, বাতিল বা সময়সূচি পরিবর্তনের তথ্য প্রভাবিত যাত্রীদের জানাতে হবে। ফ্লাইট নিশ্চিতকরণ ছাড়া যাত্রীদের বিমানবন্দরে না আসার পরামর্শ দিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, ভিসা মেয়াদ বৃদ্ধি বা অন্যান্য ইমিগ্রেশন সহায়তার প্রয়োজন হলে এয়ারলাইন্সগুলোকে ঢাকার সৌদি দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। পাশাপাশি নোটিশ না পাওয়া বা পরিস্থিতির বিষয়ে অবগত না থাকায় বিমানবন্দরে উপস্থিত হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা, পানীয় জল, খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রবীণ, শিশু ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের বিশেষ নজর দেয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি এয়ারলাইন্সকে জরুরি ভিত্তিতে একজন ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা ও প্রয়োজনীয় কর্মী নিযুক্ত করে শাহজালাল বিমানবন্দরের ফ্লাইট ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে জানানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সব এয়ারলাইন্সকে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যাত্রীদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও যোগাযোগ সুনিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে বেবিচক।
ফ্লাইট বাতিল ও যাত্রীদের দুর্ভোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ বলেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটায় দেশটির যেকোনো বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ফ্লাইট বিলম্ব, বাতিল বা সময়সূচি পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা, পরিবর্তিত যাত্রার সময়, পুনরায় টিকিট বুকিং, টিকিটের অর্থ ফেরত এবং অন্যান্য প্রযোজ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিতে হবে। এছাড়া যাত্রীদের চাহিদার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে এয়ারলাইনসগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে বিদ্যমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন ঘটছে বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট পরিচালনাকারী সব এয়ারলাইনসকে অবিলম্বে নির্দেশনাগুলো কার্যকর করতে হবে।
গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ বলেন, ভিসার মেয়াদ বাড়ানো বা অভিবাসন-সংক্রান্ত সহায়তার প্রয়োজন হলে যাত্রীদের সৌদি কর্তৃপক্ষ, ঢাকায় সৌদি দূতাবাস এবং অন্যান্য উপযুক্ত সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা করতে হবে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসকে। এ ছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থানরত কিংবা পরিস্থিতি সম্পর্কে না জানায় বিমানবন্দরে চলে আসা ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। তাদের বসার ব্যবস্থা, পানীয় জল, নাশতা, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্নের বিষয়ে সমন্বয়ের জন্য প্রতিটি সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সকে অবিলম্বে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে। ওই কর্মকর্তার নাম, পদবি, মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানা দ্রুত বিমানবন্দরের ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট বিভাগকে জানাতে হবে। পরিস্থিতি চলাকালে ওই কর্মকর্তাকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।