* একদিনে হাম-ডেঙ্গু কাড়ল শিশুসহ আরও ১৩ প্রাণ * এ পর্যন্ত হামে মৃত্যু বেড়ে ১০০৯, একদিনে আক্রান্ত ১১৯৪ * এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ১৩৯, একদিনে আক্রান্ত ১৪৯২

প্রাণঘাতী হাম-ডেঙ্গুর থাবায় দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল

এসএম দেলোয়ার হোসেন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

“হাম ও হামের উপসর্গ এবং এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এ দুটি রোগের লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা উচিৎ। শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা মনিটরিং করা জরুরি”
— অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল-মামুন, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। একই সঙ্গে পাল্ল দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে হাম ও হামের উপসর্গে এবং এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে কেউ না কেউ নতুন করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। প্রনিনিয়তই হাম ও হামের উপসর্গের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে প্রাণঘাতী ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিনই প্রাণঘাতী এ দুটি রোগে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। দেশজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ ও ডেঙ্গু কাড়ল ৭ শিশুসহ ১৩ জনের প্রাণ। এর মধ্যে হামের উপসর্গে ৭ শিশু ও ডেঙ্গুজ্বরে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০০৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এদের সবাই শিশু। গত ২৪ ঘন্টায় প্রাণঘাতী এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে ১১৯৪ জন। অপরদিকে চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গেুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া একদিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৪৯২ জন। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম ও ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত পৃথক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। রোগী ও স্বজনরা বলছেন, হাম ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব রোধে সরকারের পরিকল্পনায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। মাঠপর্যায়ে নেই তদারকি, হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা ও যথাযথ চিকিৎসা সেবা নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল-মামুনের মতে, জনসচেতনতার অভাবে হাম ও হামের উপসর্গ এবং এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এ দুটি রোগের লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা উচিৎ। শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা মনিটরিং করা জরুরি। তবে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে জনগণকে সম্পৃক্ত করে দেশজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারে সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই ভিড় করছে হাম ও হামের উপসর্গ এবং ডেঙ্গু আক্রান্ত শত শত কোমলমতি শিশুসহ নানা বয়সের মানুষ। এসব রোগ থেকে বাঁচাতে দেশের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে রোগী নিয়ে ছুঁটছেন রোগীর স্বজন ও অভিভাবকরা।
ভুক্তভোগী রোগী ও বলছেন, হামের প্রাদুর্ভাব রোধে সরকারের পরিকল্পনায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা ও যথাযথ চিকিৎসা সেবা নেই।

শিশু রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এর প্রধান লক্ষণ হলো উচ্চ জ্বর, সর্দি, কাশি, লাল ও পানিযুক্ত চোখ এবং মুখ ও গলার ভেতরে ছোট সাদা দাগ ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র‌্যাশ ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তৃণমূলে শিশু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।

জনস্বাস্থ্য বিষেশজ্ঞ বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল-মামুনের মতে, জনসচেতনতার অভাবে হাম ও হামের উপসর্গ এবং এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এ দুটি রোগের লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা উচিৎ। তিনি বলেন, অবহেলা করলেই বিপদ আরও বাড়বে। শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা মনিটরিং করা জরুরি। 

এদিকে, বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হামের পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে প্রাণ কাড়ল আরও ৭ শিশুর। এতে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও উপসর্গে মোট মৃত্যু ১ হাজার ৯ জনে দাঁড়াল। এ ছাড়া গত একদিনে নতুন করে ১ হাজার ১৯৪ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ দেখা গেছে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে শুধু ঢাকা বিভাগেই ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে হামের উপসর্গে একজন করে মোট ৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে। তাদের নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও উপসর্গে মোট ১ হাজার ৯ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গে ৯০৯ জন ও হামে আক্রান্ত হয়ে ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে আরও ১ হাজার ১৬৫ জনের মধ্যে রোগটির উপসর্গ দেখা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৫ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে মোট ১৯ হাজার ৯৩৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন।

অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু-বিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদন বলা হয়, দেশজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছর মশাবাহিত রোগটিতে এ পর্যন্ত মোট প্রাণহানি ১৩৯ জনে দাঁড়াল। এ ছাড়া গত একদিনে ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ৪৯২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। 
 
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত একদিনে খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুতে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে একজন করে মোট ৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে। অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৩২৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পাশাপাশি এই সময়ে খুলনা বিভাগে ২৮৪ জন ছাড়াও চট্টগ্রাম বিভাগে ২০২, বরিশাল বিভাগে ১৭৮, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৫১, রাজশাহী বিভাগে ১২২, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৮১, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮০, রংপুর বিভাগে ৫৪ এবং সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু নিয়ে ১৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সবমিলিয়ে চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনসহ শুধু ঢাকা বিভাগেই ডেঙ্গুতে ৭১ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া উল্লেখিত সময়ে খুলনা বিভাগে ২৫ জন ছাড়াও ময়মনসিংহ বিভাগে ১৪, বরিশাল বিভাগে ১২, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯ জন, রাজশাহী বিভাগে ৬ জন এবং রংপুর ও সিলেট বিভাগে ডেঙ্গুতে একজন করে মোট ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে, গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও করণীয় নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে জনগণকে সম্পৃক্ত করে দেশজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভর না করে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। সেই সঙ্গে বাড়িঘর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি জমে থাকা পানি অপসারণ, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার এবং মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে না দেয়ার মতো বিষয়গুলোয় মানুষকে আরও সচেতন করার নির্দেশনা দেন তিনি। 

এ ছাড়াও সভায় প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্ট কর্মীদের সম্পৃক্ত করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, তাদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণকে যুক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে। সভায় উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা সুবিধা ও রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সেই সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের ব্যবহারের জন্য মশারি সরবরাহের বিষয়েও আলোচনা হয়, যাতে আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানো মশার মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো যায়। সভায় নেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাঠে এর প্রতিফলন থাকতে হবে।’ সেই সঙ্গে ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রতিরোধকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়ার কথা জানিয়ে সংশ্লিষ্টদের সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে ব্যাপকভাবে সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেয়ার ওপরও জোর দেন তিনি।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL