অনিশ্চয়তায় হকাররা, নতুন স্থান নির্ধারণের দাবি

মিরপুর-১০ এর ফাঁকা ফুটপাতে স্বস্তিতে চলাচল

মো. সালমান সিকদার
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকাগুলোর একটি মিরপুর-১০। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এ এলাকা দিয়ে চলাচল করেন। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত ও সড়কের একটি অংশে হকারদের পসরা, ক্রেতাদের ভিড় এবং পথচারীদের চলাচল ঘিরে তৈরি হতো ব্যস্ততা। এতে অনেক সময় পথচারীদের মূল সড়কে নেমে চলতে হতো, পাশাপাশি যানচলাচলেও তৈরি হতো চাপ। তবে সাম্প্রতিক হকার উচ্ছেদ অভিযানের পর মিরপুর-১০ এলাকার চিত্র পুরোটাই বদলে গেছে। ফাঁকা ফুটপাতে স্বস্তিতেই চলাফেরা করছেন স্থানীয় পথচারীরা। উচ্ছেদের পর থেকেই এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনযাপন করছেন হকাররা। তারা জীবন বাঁচাতে সরকারের কাছে নতুন কর্মসংস্থান বা ফুটপাত নির্ধারণ করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। 


সরেজমিনে দেখা গেছে, ফুটপাত ও সড়কের উল্লেখযোগ্য অংশ এখন অনেকটাই ফাঁকা। পথচারীরা বাধাহীনভাবে চলাচল করছেন। যানবাহনও তুলনামূলক স্বাভাবিক গতিতে চলাচল করছে। ব্যস্ত এই এলাকায় আগের তুলনায় যানজটও কমেছে বলে জানান স্থানীয়দের অনেকেই। মিরপুর-১০ এলাকার বর্তমান চিত্রে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো পথচারীদের চলাচলের জায়গা বেড়ে যাওয়া। ফুটপাত ও সড়কের পাশে পণ্য নিয়ে বসা হকারদের অনুপ¯ি’তিতে মানুষ এখন অপেক্ষাকৃত স্বাচ্ছন্দে হাঁটতে পারছেন।
স্থানীয় এক পথচারী বলেন, আগে ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় বারবার দোকান, পণ্য ও মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলতে হতো। অনেক সময় রাস্তায় নেমে যেতে হতো। এখন রাস্তা ও হাঁটার জায়গা অনেক পরিষ্কার। স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা যাচ্ছে। আরেক পথচারী বলেন, হকারদেরও জীবিকা আছে, বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। তবে ফুটপাত যদি মানুষের হাঁটার জন্য খোলা থাকে, তাহলে সবারই সুবিধা হয়।
মিরপুর-১০ একটি গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানে বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, রিকশা ও পথচারীর চাপ সবসময়ই বেশি থাকে। এর সঙ্গে ফুটপাতের দোকান ও ক্রেতাদের ভিড় যুক্ত হলে সড়কের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়। হকার উচ্ছেদের পর সেই অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমেছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন মার্কেটেরন ব্যবসায়ীরা। রাস্তার পাশে দোকান ও ক্রেতাদের জটলা না থাকায় যানবাহন চলাচলের জায়গা তুলনামূলক উন্মুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে পথচারীরাও রাস্তার ওপর ছড়িয়ে না পড়ে নির্ধারিত চলাচলের জায়গা ব্যবহার করতে পারছেন। ফাঁকা ফুটপাতে নেই হকারদের দৌরাত্ম্য। নির্বিঘ্নে হেঁটে যাচ্ছেন পথচারীরা। যত্রতত্র পার্ক করা গাড়ির সংখ্যাও কমে গেছে। ফলে যানজটও নেই। তবে দোকান না বসালেও আশপাশে আনাগোনা দেখা গেছে হকারদের। তারা মূলত পুলিশের গতিবিধিসহ পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন।
পরিস্থিতি ঠিকঠাক মনে হলে আবার ফুটপাতে দোকান বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় হকারদের হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে। হকারদের দাবি, রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের চাঁদা দিয়েই তারা এতদিন দোকানদারি করেছেন। এখন কেউ দায় নিচ্ছে না। যেসব হকার সংঘর্ষে জড়িয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তাদের আইনের আওতায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবিও জানিয়েছেন। সংঘর্ষে সিটি করপোরেশনের গাড়ি ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ ও পুলিশ বক্সে হামলায় মিরপুর মডেল ও কাফরুল থানায় দায়ের করা চার মামলায় এখন পর্যন্ত ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।


মিরপুরের ১০ নম্বর ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ফুটপাত একেবারেই ফাঁকা। আগে যেখানে সকাল থেকে হকাররা পসরা সাজিয়ে বসতেন, সেখানে কোনো হকার নেই। দুয়েকটি টং দোকানের খাঁচা থাকলেও তাতে কোনো জিনিসপত্র দেখা যায়নি। কিছু হকারকে আশপাশ দিয়ে ঘুরে ঘুরে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে দেখা গেছে। ফুটপাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরার সুবিধা পাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। পথচারী লোকমান শেখ বলেন, ১০ বছর ধরে তিনি মিরপুর গোলচত্বর দিয়ে যাতায়াত করেন। আগে কখনো এ রকম ফাঁকা ফুটপাত দেখেননি তিনি। হকার না থাকায় গত দুদিন স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারছি। তবে এ রকম বেশি দিন থাকে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান তিনি। তার কথা, কেননা, এর আগেও এ এলাকাসহ অনেক এলাকার ফুটপাতে হকার উচ্ছেদ করা হয়েছিল। উচ্ছেদের পরপর বা কয়েকদিন পর ফের দখলে নিয়েছে হকাররা।
বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসের চালক কায়কোবাদ বলেন, মিরপুর-১৪ থেকে শেওড়াপাড়া পর্যন্ত ফুটপাতে বসার পর মূল সড়কেও বসতেন হকাররা। একে তো জনজট, আবার সড়কে দোকান। ফলে এটুকু পথ পারি দিতে কখনো ঘণ্টাখানেক সময় লেগে যেত। কিন্তু গত দুদিন (বৃহস্পতি ও শুক্রবার) সড়ক একদম ফাঁকা। নির্বিঘ্নে গাড়ি চালাতে পারছি।
নিয়মিত চলাচলকারী বাসের এক যাত্রী বলেন, মিরপুর গোলচত্বর পার হতেই আধা ঘণ্টা সময় লেগে যেত। উচ্ছেদকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ এ রকম ঢাকাই চাই। যেখানে আরামে চলাফেরা করা যাবে। শ্বাস নেওয়া যাবে মুক্ত আকাশে। 


উচ্ছেদের পর শেওড়াপাড়া থেকে মিরপুর-১৪, গোলচত্বর থেকে কাফরুলে যাওয়া-আসার সড়কে গাড়ি পার্ক করার প্রবণতাও কমে গেছে। ওই এলাকায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা বলছেন, বিগত সময়ে এ এলাকায় হকারদের দোকান, দোকানে মালামাল কিনতে আসা ক্রেতা, সাধারণ মানুষ আর যানবাহনের চাপে ঠাসা ছিল। যানজট সামলাতে হিমশিম খেতে হতো। তাগাদা দিলে কিংবা মামলার ভয়ে যান্ত্রিক যান দ্রুত চলে যেত ঠিকই। কিন্তু হকার ও তাদের দোকানে আসা ক্রেতাদের তো ফোর্স করে সরানো যেত না। ফলে দিন-রাত যানজট লেগেই থাকত। এখন মানুষজন, যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে সব স্থানেই কমবেশি যানজট থাকে। কিন্তু গতকাল রোববার এ এলাকায় আগের তুলনায় যানজট কমই ছিল। কারণ একটাই-ফুটপাত দখলমুক্ত। এতে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের মাঝেও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। 
হকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফুটপাতে বসতে দেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ। তাদের কারও কারও আয়ের প্রধান উৎস ছিল ফুটপাত, আবার রাজনৈতিক দলের নেতারা দখলে নিয়ে লোক দিয়ে দোকান বসাতেন। গতকাল রোববার মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর, মেট্রো স্টেশন ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। ফুটপাতে স্থায়ী কোনো স্থাপনা কিংবা দোকান দেখা যায়নি। তবে উচ্ছেদের পরও কয়েকটি চৌকিকে লোহার শিকল দিয়ে আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনার সঙ্গে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা গেছে। দুই-একদিনের মধ্যে হকাররা যদি স্বেচ্ছায় সরিয়ে না নেয়, তাহলে সেগুলো তুলে নিয়ে ফেলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি কপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শক।
ফুটপাত ধরে কিছুটা সামনে এগোলে দু-একজন হকারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলেও তাদের স্থায়ীভাবে চৌকি পেতে বা পণ্য সাজিয়ে বসতে দেখা যায়নি। ফুটপাত নিয়ে আলাপ করতে দেখা গেছে তিন ব্যক্তিকে। তারা জানান, গোলচত্বরের পূর্ব পাশের ফুটপাতে তাদের দোকান ছিল। দোকানের আয় দিয়েই তাদের সংসার চলত। বুধবার থেকে একটা টাকাও ইনকাম নেই। কীভাবে চলবেন বুঝতে পারছেন না। তাদের বক্তব্য, তাদের উঠিয়ে দিলেও সমস্যা নেই। তবে স্থান নির্ধারণ করে বসার সুযোগ করে দেওয়া হোক, সরকার স্থায়ী পুনর্বাসন করুক।
গোলচত্বর থেকে মিরপুর-১৪ নম্বরের দিকে যেতে কয়েকজনের আনাগোনা দেখা গেছে। জানতে চাইলে তারা প্রথমে হকার নন বলে জানান। পরক্ষণেই হকার পরিচয় দেন এবং নাম প্রকাশ না করে তাদের একজন বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি ওই এলাকায় বাচ্চাদের ড্রেস বিক্রি করে আসছিলেন। রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের দৈনিক এবং সাপ্তাহিক চাঁদা দিয়েই দোকান করতেন। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারাও টাকা নিতেন। তিনি বলেন, ‘মধু সবাই খাইতেন, কিন্তু এখন কেউ আমাদের দায়িত্ব নেয় না। আওয়ামী লীগের আমলে আমাদের বলা হতো, আমরা বিএনপির লোক, এখন বিএনপির আমলে আমাদের আওয়ামী লীগের তকমা দেওয়া হচ্ছে। আরও কয়েকজন হকার জানিয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে যেসব নেতাকর্মী ফুটপাত থেকে চাঁদা নিতেন, তারাই গত বুধবার পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। অথচ চাঁদার ভাগ বিভিন্ন সেক্টরে যেত, থানা-পুলিশও লাইনম্যান দিয়ে দৈনিক টাকা নিতো। আরেক হকার বলেন, সামনে লোক আছে। পুলিশ আসতে দেখলে খবর দেবে। তবু যদি রক্ষা না হয়, মাইর খাওয়া লাগবে আরকি।
এদিকে মিরপুর ও কাফরুল থানা পুলিশ জানিয়েছে, ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে। মিরপুর মডেল থানায় তিনটি, কাফরুল থানায় একটি। পুলিশ বাদী হয়ে দুটি এবং ডিএনসিসির কর্মকর্তারা বাদী হয়েছেন দুটি মামলার। চার মামলায় মোট আসামি ২ হাজার। আসামিদের মধ্যে ২০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এজাহারভুক্ত একজনসহ মোট ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাফিজুর রহমান বলেন, সিটি করপোরেশন বাদী হয়ে গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় একটি, পুলিশ বাদী হয়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় একটি এবং ট্রাফিক পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করেছে। তিন মামলায় অজ্ঞাতপরিচয়ের আসামি ৪০০ থেকে ৫০০ জন। ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন এজাহারভুক্ত আসামি রয়েছে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আর হকাররা যেন ফুটপাতে বসতে না পারেন, সেজন্য আমাদের পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
কাফরুল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, সিটি করপোরেশনের গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে মামলা করেছে। এতে ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত শুক্রবার তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া বাকি আসামিদের ধরতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অভিযান চলামান রয়েছে।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL