বিশ্লেষণ

ইশরাক ইস্যুতে অন্যরা কী বার্তা পেলেন?

শামসুর রহমান
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, রাজপথের আন্দোলন ও মেয়র হওয়ার লড়াই—সব মিলিয়ে আলোচনায় ছিলেন ইশরাক হোসেন। প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা তাঁকে বিতর্কের মুখে ফেলে। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন পদত্যাগের এই ঘোষণা দেন। সংবাদ সম্মেলনের নির্ধারিত সময়ের আধা ঘণ্টা আগেই জাতীয় প্রেসক্লাবে উপস্থিত হন ইশরাক। এ সময় তাঁর সঙ্গে শত শত নেতাকর্মী ছিলেন। প্রেসক্লাবে আসার পর নেতা-কর্মীরা ইশরাক হোসেনের পক্ষে নানা স্লোগান দিতে থাকেন। তাঁরা ‘ইশরাক ভাইয়ের ভয় নাই। রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘ইশরাক ভাই এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে’ স্লোগান দেন। নেতা-কর্মীদের কারও কারও হাতে ফুলের তোড়াও দেখা যায়। ইশরাক হোসেন প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে এলে নেতা-কর্মী ও গণমাধ্যমের কর্মীরা তাঁকে ঘিরে ধরেন। এরপর নেতা-কর্মী বেষ্টিত হয়ে প্রেসক্লাবের তৃতীয় তলায় আবদুস সালাম হলে যান ইশরাক হোসেন। তখনো হলের ভেতরে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন নেতা-কর্মীরা। এর আগে বেলা পৌনে ২টার দিকে ইশরাক হোসেন কালো রঙের গাড়িতে করে প্রেসক্লাবের ফটক দিয়ে ঢোকেন। এর আগে সকাল সাড়ে আটটার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে ইশরাক হোসেন জানান, তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেবেন। পোস্টে ইশরাক হোসেন লিখেছেন, তিনি আজ (সোমবার) বেলা দুইটায় জাতীয় প্রেসক্লাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন এবং সাংবাদিকদের মুখোমুখি হবেন। ‘ফেসবুকে কিছু সুশীল মানুষকে উল্লাসসূচক লেখালেখি করতে দেখলাম। আশা করি, ভবিষ্যতে কখনো আন্দোলন-সংগ্রামের প্রয়োজন হলে তাঁরা জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিদেশ থেকে দেশে এসে সেই আন্দোলনে যোগ দেবেন। ‘এবার সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে শতগুণ বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করব, ইনশা আল্লাহ। ‘পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি আরও জোরদার হবে। ‘দেশব্যাপী প্রজন্ম দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলা সফর করতে পারব।
‘মন্ত্রী নয়, মাদক নির্মূল!
‘মাদক নির্মূল, মাদক নির্মূল!’
এবার আসি মূল আলোচনায়। ইশরাকের এই পরিণতি ক্ষমতাসীন বিএনপির অন্য নেতা ও মন্ত্রীদের জন্য কী বার্তা বহন করছে? বিএনপি সরকারের বয়স আট মাস। মন্ত্রিসভায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের মেয়াদও ছিলো প্রায় আট মাস। রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তাঁর উপস্থিতির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরদিনই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে ডেকে পদত্যাগ করতে বলেন। রোববার রাতে এই ঘটনা নিয়ে কয়েকটি মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ হলে ইশরাকের পক্ষ থেকে তখন ফেসবুকে একাধিক পোস্ট করা হয়েছিলো, ‘‘পদত্যাগের খবর অসত্য, গুজব, এসব খবরে বিশ্বাস না রাখার জন্য’’...। কিন্তু গতকাল সোমবার সকালের পর পদত্যাগ ইস্যুতে ইশরাকের অবস্থান পরিবর্তন ঘটে। তিনি ফেসবুক পোস্টে ঘোষণা দেন, তিনি পদত্যাগ করবেন। এবং শেষ পর্যন্ত তিনি তাই করলেন। দুপুর ২টার পর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে মুক্তিযোদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের  ঘোষণা দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইশরাক হোসেনের ঘটনাটিকে কেবল একজন তরুণ প্রতিমন্ত্রীর বিতর্কে জড়িয়ে পড়া কিংবা মন্ত্রিসভা থেকে বিদায়ের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও মন্ত্রীদের আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং ক্ষমতা প্রয়োগের সীমা সম্পর্কে একটি সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসানের পর দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়। ক্ষমতার অপব্যবহার, শক্তি প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতি থেকে রাজনীতিকেরা কতটা বেরিয়ে আসতে পারেন, তা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ ১৮ বছর পর বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান।
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দলীয় নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান কী হয়, তা নিয়ে নজর ছিল। এর আগে গত মাসে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। এবার ইশরাকের ক্ষেত্রেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের বিষয়টি সামনে এসেছে।
ইশরাকের অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনাটি জনপরিসরে আলোচনার জন্ম দেওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা নিয়েও দেশে-বিদেশে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। তাঁকে পদত্যাগ করতে বলার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দল ও সরকারের অন্যদেরও সতর্ক করেছেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। 
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও উত্থান
ইশরাক হোসেনের বয়স ৩৯ বছর। তাঁর বাবা মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা, সাবেক মন্ত্রী এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র। পুরান ঢাকায় তাঁর শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল। ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর বাবার মৃত্যুর পর সেই রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক উত্তরাধিকারের ওপর দাঁড়িয়েই সামনে আসেন ইশরাক।
পেশায় ব্যবসায়ী ইশরাক প্রকৌশলে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। পরে ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পুরান ঢাকায় দলীয় কর্মসূচি, সরকারবিরোধী আন্দোলন ও নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তরুণ নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাও অর্জন করেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ইশরাক। এরপর তাঁকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই মন্ত্রিসভায় জায়গা পাওয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বড় অর্জন ছিল।
তবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি কেবল সংসদ নির্বাচন কিংবা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস জয়ী হন। ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে আইনি লড়াই শুরু করেন ইশরাক। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মেয়র ঘোষণা করেন। পরে নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করে। তবে শপথ গ্রহণ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ২০২৫ সালের মে মাসে শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করার দাবিতে ইশরাকের সমর্থকেরা নগর ভবন ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, ব্যাহত হয় সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবা। ইশরাকও আন্দোলনে যোগ দেন এবং সরকারের উদ্দেশে কঠোর বক্তব্য দেন। শপথের ব্যবস্থা না করলে নিজেই শপথ নিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর যুক্তি ছিল, আদালতের রায় কার্যকর করা এবং ঢাকাবাসীর ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
এই আন্দোলনের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ছিল ভিন্ন ভিন্ন। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল নির্বাচনী অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। অন্যদিকে নগর ভবনের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং নাগরিক দুর্ভোগের কারণে তাঁর সমালোচনাও হয়। দলের ভেতরেও তাঁর রাজনৈতিক কৌশল ও পরিপক্বতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি ইশরাক। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
ইশরাকের সাম্প্রতিক বিতর্কের আগেও তাঁর আচরণ নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা হয়েছে। গত জুলাইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রধান অতিথি ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তথ্যচিত্রে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি—এমন অভিযোগ তোলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। এ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে তাঁরা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। এমন পরিস্থিতিতে উত্তেজনা প্রশমনের বদলে ইশরাক বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে কঠোর বক্তব্য দেন।
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কি নিজেদের জাহির করার জন্য এসেছেন? ডকুমেন্টারি দেখানোর জন্য এসেছেন? কী করছেন আপনারা? শহীদদের জন্য কী করেছেন? শহীদদের জন্য আপনারা কিছুই করেননি।’ তাঁর এই বক্তব্যের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ব্যক্তিদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান এবং যাঁদের বক্তব্য আছে, তাঁদের মঞ্চে এসে তা তুলে ধরতে বলেন। এনসিপি নেতা আখতার হোসেনও বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
এর আগে গত জুলাইয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাকও। ওই সময় তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে তাঁকেও স্যালুট দিতে দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ও উপহাসের সৃষ্টি হয়।
পরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ইশরাক লেখেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা উঠলে শ্রদ্ধায় আমার হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্যালুটে উঠে যায়। আমার হাত দিয়ে আমি বীর শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্যালুট দিয়েছি। হাত আমার, সম্মান জানিয়েছি সর্বজনশ্রদ্ধেয় বীরদের। দেশ আমার গণতান্ত্রিক; আমার ইচ্ছায় আমি স্যালুট দিয়েছি। যতবার ইচ্ছা হবে, যখন ইচ্ছা হবে, আমি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্যালুট জানাব।’
এসব ঘটনা একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে ইশরাকের রাজনৈতিক আচরণ, জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়ার ধরন এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংযমের প্রশ্ন সামনে আসে। বিশেষ করে একজন প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তাঁর উপস্থিতি সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
গেন্ডারিয়ায় অস্ত্রহাতে মাদকবিরোধ অভিযান
তবে শুধু ভিডিও বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যের ভিত্তিতে কোনো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা যায় না। গেন্ডারিয়ার অভিযানে কী ঘটেছিল, ইশরাকের ভূমিকা কী ছিল এবং সংশ্লিষ্ট কোনো আইন লঙ্ঘিত হয়েছে কি না—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের দায়িত্ব, স্থানীয়দের অভিযোগ এবং উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর বিষয়েও স্বচ্ছতা থাকা দরকার। মাদক নির্মূলের প্রয়োজনীয়তা যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আইনি প্রক্রিয়া ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হয়।
অন্যদের জন্য কী বার্তা?
ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগ করানোর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকারের অন্যদের জন্য যে বার্তা দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে, তার মূল কথা হলো—রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক উত্তরাধিকার কিংবা দলের প্রতি আনুগত্য কাউকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখে না। মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধিদের আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তার রাজনৈতিক পরিণতি হতে পারে।
এই বার্তার কার্যকারিতা অবশ্য নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। কোনো ব্যক্তিকে পদত্যাগে বাধ্য করাই যথেষ্ট নয়; অভিযোগের সত্যতা যাচাই, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং একই ধরনের ঘটনায় সবার ক্ষেত্রে অভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করাও জরুরি। দলীয় পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে।
তবে, ইশরাকের রাজনৈতিক জীবন অবশ্য এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তাঁর সামনে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান পুনর্গঠনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অল্প সময়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া এবং দ্রুত সেই পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনাটি তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের অন্য নেতা ও মন্ত্রীদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
ক্ষমতা পাওয়া যেমন রাজনৈতিক অর্জন, তেমনি সেই ক্ষমতা দায়িত্বশীলভাবে প্রয়োগ করাও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ইশরাকের ঘটনাটি থেকে অন্যরা কতটা শিক্ষা নেবেন, তা নির্ধারিত হবে তাঁদের পরবর্তী আচরণে—এবং সরকার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে কতটা স্বচ্ছতা, সংযম ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে, তার ওপর।

লেখক: কলামিস্ট ও সাংবাদিক
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL