রাজনীতিতে নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা হয় প্রতিকূল সময়ে। যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে, তখন দলের সঙ্গে থাকা অনেকের পক্ষেই সম্ভব, কিন্তু চাপ, জেল জুলুম মামলা হামলা-গ্রেপ্তার কিংবা সাংগঠনিক সংকটের সময়ে কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোই একজন নেতার রাজনৈতিক চরিত্রকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। বিএনপির রাজনীতিতে সাইফুল আলম নিরবকে ঘিরে আলোচনার অন্যতম কারণও এখানেই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্রভাবে ভোট করেন এবং দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় বহিষ্কার হন তিনি। তারপরও দলের সহকর্মী-সমর্থকদের ত্যাগ করেননি সাইফুল আলম নিরব।
সমর্থকদের কাছে নিরব শুধু একটি সাংগঠনিক পদে থাকা নেতা নন, বরং মাঠের রাজনীতির অভিজ্ঞতা থাকা একজন সংগঠক। তাদের প্রত্যাশা, অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবার উত্তর মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে দলের কাজে লাগবে সাইফুল আলম নিরবকে। আর তাই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, ত্যাগ এবং দলের কঠিন সময়ে পাশে থাকার অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে মহানগরী উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে তার নেতৃত্বকে নতুন করে মূল্যায়ন করার কথা ভাবছে বিএনপি। এমনটিই সর্বত্র শোনা যাচ্ছে।
কেন আলোচনায় নিরব?
একজন নেতার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা সাধারণত একদিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘসময়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক, দলের প্রতি আনুগত্য এবং প্রতিকূল সময়ে অবস্থান- সবকিছুর সমন্বয়েই তৈরি হয় নেতৃত্বের ভিত্তি। সাইফুল আলম নিরবকে নিয়ে দলীয় পর্যায়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসে তার ত্যাগী রাজনৈতিক ভূমিকার বিষয়টি। সমর্থকদের দাবি, দলের কঠিন সময়ে তিনি সংগঠনের সঙ্গে ছিলেন এবং কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। তাদের দৃষ্টিতে, রাজনীতির সুবিধাজনক সময়ের চেয়ে সংকটের সময়ে একজন নেতার ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ অভিজ্ঞতাই এখন তার নেতৃত্বের অন্যতম বড় সম্পদ। কারণ মহানগর পর্যায়ের রাজনীতিতে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বোঝা এবং সেই অনুযায়ী সংগঠন পরিচালনা করা।
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় এমন অনেক সময় এসেছে, যখন দলটির নেতাকর্মীদের কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এসব সময়ে মাঠপর্যায়ের নেতাদের দায়িত্ব ছিল কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখা। নিরবের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে এ অভিজ্ঞতার বিষয়টি যুক্ত করে দেখছেন তার অনুসারীরা। তাদের মতে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সংগঠন ধরে রাখার অভিজ্ঞতা একজন নেতাকে বাস্তববাদী করে তোলে। সেই অভিজ্ঞতা এবার বৃহত্তর সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালনায় কাজে লাগানোর সুযোগ এসেছে। তবে অতীতের ত্যাগ ভবিষ্যতের সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। বরং সেই ত্যাগকে সাংগঠনিক দক্ষতায় রূপ দিতে পারাই হবে প্রকৃত পরীক্ষা।
ঢাকা মহানগরী উত্তর বিএনপির দায়িত্ব কোনোভাবেই সহজ নয়। বিশাল সাংগঠনিক পরিসর, বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতৃত্ব, কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন- সব মিলিয়ে এখানে নেতৃত্বকে একসঙ্গে বহু ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ আরো শক্তিশালী করা। কেন্দ্রীয় বা মহানগর পর্যায়ের সিদ্ধান্ত তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পায়। এক্ষেত্রে নিরবের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগতে পারে। কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, সাংগঠনিক সমস্যার কথা শোনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তার নেতৃত্বের কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে। অনেকের মতে, সাইফুল আলম নিরবের সামনে তাই সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় তৈরির বড় দায়িত্ব রয়েছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে সাংগঠনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করা, যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মীদের মূল্যায়ন এবং তৃণমূলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে পারলে সাইফুল আলম নিরবের নেতৃত্ব আরো গ্রহণযোগ্য হতে পারে। দলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, নেতৃত্বের পর্যায়ে এসে নিরব যেন তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি না করেন। যারা দীর্ঘদিন রাজনৈতিক মাঠে ছিলেন, তাদের মূল্যায়ন, কর্মীদের সমস্যা শোনা এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে মাঠপর্যায়ের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তারা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। একজন নেতার জনপ্রিয়তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবসম্মত- সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই কর্মীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন হবে বাস্তবভিত্তিক সাংগঠনিক পরিকল্পনা।
দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন আলোচিত- ত্যাগী নেতাকর্মীরা কি যথাযথ মূল্যায়ন পাবে? দলের কঠিন সময়ে যারা পাশে থাকেন, তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বের কাঠামোতে কতটা প্রতিফলিত হয়? সাইফুল আলাম নিরবকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রত্যাশার একটি অংশ এ প্রশ্নের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তার সমর্থকরা মনে করেন, ত্যাগ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন হিসেবে নেতৃত্বের সুযোগ পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে জানতে বিএনপির সাবেক নেই নিরবের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো সাড়া মেলেনি। তবে তার অনুসারীরা বলছে, বিএনপি ভুল সুধরে দলের ও সাংগঠনিক কার্যক্রমকে গতিশীল রাখতে তৃণমূলের ত্যাগী নেতা সাইফুল আলম নিরবকে পূনঃমূল্যায়ন করে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনবেন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।