★ হাতকড়া ও হেলমেট পরানোয় ক্ষোভ
★ আখতারুজ্জামান জামায়াতের নেতা নন: এটিএম আজহার
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সঙ্কটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে জিজ্ঞেসাবাদের জন্য একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। আদালতে তোলার আগে হাতকড়া ও হেলমেট পরানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীরের আদালতে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এদিকে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতা নন, তিনি দলের প্রাথমিক সদস্য বলে দাবি করেছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম।
এর আগে ঢাকার বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক মাজেদুল ইসলাম আখতারুজ্জামানের পাঁচদিনের রিমান্ড আবেদন করেন।
শনিবার (৩ অক্টোবর) বেলা ১২ টার দিকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিয়ে আসা হয় জামায়াত নেতা মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানকে। আগে থেকে অসংখ্য নেতাকর্মী অবস্থান নেয় কোর্টের সামনে, সরকার বিরোধী নানা স্লোগান দেয় তারা। পরে নিরাপত্তা বিবেচনায় ভিন্ন পথে তাকে আদালতে আনা হয়। এসময় প্রিজন ভ্যানের মধ্যে থেকে সরকারকে উদ্দেশ্য ক্ষোভ ঝারেন আখতারুজ্জামান। প্রিজন ভ্যান থেকে বের করার সময় তাকে হেলমেট পড়াতে গেলে তা ছুড়ে ফেলে দেন এই নেতা। গারদিখানায় না নিয়ে দুপুর একটার তাকে সরাসরি কোর্টে তোলা হয়। এসময়, পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। দুইপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত তার একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আসামীপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাকের দাবি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে ফাঁসানো হয়েছে।
এ সময় প্রিজন ভ্যানের ভেতরে থাকা একজন পুলিশ সদস্যকে আঙুল তুলে শাসাতে দেখা যায় তাকে। পরে প্রিজন ভ্যান থেকে নামার সময় মাথায় থাকা হেলমেট ছুড়ে ফেলেন তিনি। এ সময় তিনি বলেন, আমি আওয়ামী লীগ নই, হেলমেট পরব না। আদালতে শুনানির সময়ও নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিয়ে কথা বলেন আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সোনার বাংলাদেশ ছিল, সবাই লুটেপুটে খাচ্ছে। প্রসিকিউশন প্রমাণ করুক, আমার অপরাধ প্রমাণ করুক, আমি ফাঁসিতে যাব। মামলাটিকে ষড়যন্ত্র দাবি করে তিনি আরও বলেন, এটা ষড়যন্ত্র, মামলা থানায় রুজুর আগেই ডিবি পুলিশ আমার বাসায় হাজির।
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান আরও বলেন, জুলুম, নির্যাতন করে আমাদেরকে থামানো যাবে না। জামায়াত জনগণের জন্য লড়বে, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়বে। তিনি আরও বলেন, ভাইয়েরা, জনগণের অধিকার সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। জনগণের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। আমরা জনগণের জন্য লড়ব ইনশাআল্লাহ।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে হুমকি এবং নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে মারধরের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন আখতারুজ্জামান। গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাত সোয়া ৭টার দিকে তাকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বিমানবন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, ডিবি আখতারুজ্জামানকে থানায় দিয়ে গেছে। তিনি বলেন, বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার মামলায় আখতারুজ্জামানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মামলার তদন্তসহ পরবর্তী আইনি কার্যক্রম বিমানবন্দর থানা পুলিশ পরিচালনা করবে।
এর আগে গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা এবং মারধরের অভিযোগে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম। একই দিন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিব বিমানবন্দর থানায় আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ব্যাপক যাত্রীচাপের কারণে গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) মদিনা থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট ইএ-৩৩৮-এর লাগেজ পেতে বিলম্ব হয়। এতে যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ ঘটনাস্থলে গেলে আখতারুজ্জামান তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, একপর্যায়ে আখতারুজ্জামান নির্বাহী পরিচালককে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার পাশাপাশি মারধরের হুমকি দেন। একই ঘটনায় তিনি বিমানমন্ত্রীকে নিয়েও অশালীন মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় ভিডিও ধারণ শুরু করলে নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন তাদের বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আখতারুজ্জামান তাকে গালাগাল ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, সাধারণ যাত্রীদের জমজমের পানির বোতল ছুড়ে ফেলা এবং বিমান বাংলাদেশ প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন আখতারুজ্জামান। এসব ঘটনায় সরকারি কাজে বাধা, মারধর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে সিসিটিভি ফুটেজ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে।
উল্লেখ্য, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান এর আগে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তিনি একাধিকবার বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।
এদিকে শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে রংপুর নগরীর শাপলা চত্বরে জামায়াতের দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নায়েবে আমির ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতা নন, তিনি দলের প্রাথমিক সদস্য। সংবাদ সম্মেলনে রংপুর বিভাগের জামায়াতের ১৪ জন সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় জামায়াত নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যেই মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে জামায়াতে ইসলামীর নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে। আখতারুজ্জামান জামায়াতের নেতা নন। তিনি সহযোগী সদস্য বা প্রাথমিক সদস্য হয়েছেন। জামায়াতে সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়া তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাথমিক সদস্য হওয়ার পর কর্মী, এরপর সদস্য এবং পরে নেতা হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সে হিসেবে আখতারুজ্জামান ‘সিম্পল’ সদস্য মাত্র।
এটিএম আজহারুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, জামায়াতের কোনো নেতা কোনো বক্তব্য দিলে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয় না। কিন্তু এমন কোনো বক্তব্য বা তথ্য সামনে এলে, যার মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব, তখন তাকে জামায়াতের নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, টকশোতে যারা কথা বলেন, তারাই আবার বলেন যে জামায়াতে গেলেই নেতা হওয়া যায় না। অথচ আখতারুজ্জামানকে জামায়াতের নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য।
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, বিমানবন্দরে প্রতিবাদ করার কারণেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কেন প্রতিবাদ করা হয়েছিল বা তার কী অপরাধ ছিল, তা তদন্তের আগেই তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানিয়ে জামায়াতের এই নেতা অভিযোগ করেন, সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে সরকার আওয়ামী লীগের পথেই হাঁটছে। আইনের আশ্রয় নেয়ার নামে আইনকে ব্যবহার করে বিরোধী দলকে দমনের পথ বেছে নেয়া হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন। এ ধরনের পদক্ষেপ সরকারের জন্য সুখকর হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। বিএনপির উদ্দেশে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, জেল-জুলুম দিয়ে বিরোধী দলকে দমন করা যাবে বলে যদি তারা মনে করে, তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে।