তরমুজ চাষ : লাল-সবুজের কৃষিতে অপার সম্ভাবনা

হাসান সাইফ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

বাংলার চিরচেনা গ্রামীণ প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের আগমনী বার্তা কেবল তীব্র দাবদাহ আর কালবৈশাখীর ঝটিকা বার্তাই নিয়ে আসে না, এর সঙ্গে যুক্ত হয় রসালো ফলের এক অতুলনীয় সমাহার। আর এই ফলের বাজারে রাজকীয় আসনে অধিষ্ঠিত থাকে তরমুজ। সবুজ খোসা ভেদ করে লাল টকটকে, মিষ্টি ও রসালো শাঁসযুক্ত তরমুজ ছাড়া যেন বাঙালির গ্রীষ্মকাল কোনোভাবেই পূর্ণতা পায় না। এক সময় আমাদের দেশে তরমুজ চাষ কেবল নদীমাতৃক অববাহিকার চর অঞ্চলে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে হয়ে থাকত এবং এর মৌসুমও ছিল বেশ সংক্ষিপ্ত। কিন্তু আধুনিক কৃষিকৌশল, উন্নত জাতের উদ্ভাবন এবং এ দেশের কৃষকদের অদম্য উৎসাহ ও পরিশ্রমের ফলে আজ তরমুজ চাষের রূপ ও পরিধি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এটি কেবল শখের বশে করা কোনো ঋতুভিত্তিক চাষাবাদ নয়, বরং দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক সম্ভাবনাময় ও অত্যন্ত লাভজনক কৃষিপণ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় লবণাক্ত মাটি থেকে শুরু করে বরেন্দ্রভূমির শুষ্ক প্রান্তর এবং উত্তর জনপদের পলিমাটি—সবখানেই আজ তরমুজের সবুজ পাতার অন্তহীন সমারোহ দেখা যায়, যা আমাদের কৃষির বহুমুখীকরণের এক উজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। তরমুজ চাষের এই বিস্ময়কর বিস্তার কেবল কৃষকদের জীবনযাত্রার মানই উন্নত করছে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের অনুকূল আবহাওয়া ও বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি তরমুজ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ও সম্ভাবনাময়। সাধারণত শীতের ঠিক পর পরই, অর্থাৎ মাঘ-ফাল্গুন মাসে তরমুজের বীজ বপন করা হয় এবং বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ফসল তোলার উপযুক্ত সময় হয়। তবে বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তন এবং কৃষকদের নতুন নতুন কৌশল অবলম্বনের কারণে এই সময়সীমায় বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন জানুয়ারি মাস থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগাম জাতের তরমুজ বাজারে আসতে শুরু করে, যা ভোক্তাদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কৃষকদের অধিক মুনাফা অর্জনের সুযোগ করে দিচ্ছে। বেলে ও বেলে-দোআঁশ মাটি তরমুজ চাষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। কারণ এ ধরনের মাটিতে গাছের শেকড়ের বিস্তার খুব সহজে ঘটে এবং বর্ষা বা অতিরিক্ত সেচের পানি জমে গাছের ক্ষতি করতে পারে না। তরমুজের সুস্বাদু হওয়ার পেছনে প্রচুর সূর্যালোকের ভূমিকা রয়েছে। গাছের বৃদ্ধিকালীন সময়ে পর্যাপ্ত রোদ এবং পরিপক্বতার সময়ে একটু কম আর্দ্রতা ও উষ্ণ আবহাওয়া তরমুজে শর্করার পরিমাণ ও মিষ্টি ভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে, বিশেষ করে ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর ও নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলে বর্ষার পর পলি জমে উর্বর হওয়া মাটি তরমুজের ফলন বাড়াতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের শুষ্ক আবহাওয়ায় আধুনিক সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে এখন অত্যন্ত মিষ্টি ও আকর্ষণীয় তরমুজ উৎপাদিত হচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের মাটিতেই তরমুজের অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে।

Advertisement

তরমুজ চাষের অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনে জাত নির্বাচনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অতীতে আমাদের দেশের কৃষকেরা মূলত দেশীয় জাতের তরমুজ চাষ করতেন, যেগুলোর আকার কিছুটা লম্বাটে হতো, খোসা হালকা সবুজ রঙের এবং ভেতরের অংশ হালকা লাল ও অনেক সময় প্রচুর বিচিযুক্ত হতো। সময়ের বিবর্তনে এবং ভোক্তাদের রুচির পরিবর্তনে এখন বাজারে হাইব্রিড বা সংকর জাতের তরমুজের একচ্ছত্র আধিপত্য লক্ষ্য করা যায়। থাইল্যান্ড, তাইওয়ান ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত এবং দেশীয় গবেষণাকেন্দ্রে উদ্ভাবিত হাইব্রিড জাতগুলো এ দেশের কৃষকদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এসব জাতের মধ্যে ব্ল্যাক ডায়মন্ড, ড্রাগন কিং, বিগ ফ্যামিলি, সোনালী বা হলুদ রঙের তরমুজ এবং হানি ডিউ অত্যন্ত জনপ্রিয়। ব্ল্যাক ডায়মন্ড জাতের তরমুজগুলো গাঢ় সবুজ বা কালচে রঙের হয়, আকৃতিতে কিছুটা গোল এবং এর খোসা বেশ শক্ত হওয়ায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পরিবহন করা অত্যন্ত সহজ হয়। অন্যদিকে, হলুদ রঙের শাঁসযুক্ত তরমুজগুলো দেখতে যেমন অসাধারণ সুন্দর, তেমনি স্বাদেও বেশ মিষ্টি এবং এর ভেতরের গঠন বেশ আকর্ষণীয়। হাইব্রিড জাতের তরমুজগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এগুলোর ফলন প্রচলিত জাতের তুলনায় অনেক বেশি হয়, রোগবালাই সহ্য করার ক্ষমতা বেশি থাকে এবং নির্দিষ্ট ও কম সময়ের মধ্যে পরিপক্বতা লাভ করে। ফলে কৃষকেরা খুব কম সময়ে জমি থেকে ফসল তুলে বাজারে বিক্রি করে অধিক মুনাফা অর্জন করতে পারছেন এবং একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের সুযোগ পাচ্ছেন।
মাটি তৈরি থেকে শুরু করে ফসল তোলা পর্যন্ত তরমুজ চাষের প্রতিটি ধাপে নিখুঁত পরিচর্যা ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সঠিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। জমি প্রস্তুত করার জন্য প্রথমে ভালোভাবে কয়েকবার চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে ও সমতল করে নিতে হয়। এরপর মাটির উর্বরতা ও পুষ্টিগুণ বাড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জৈব সার যেমন পচা গোবর, কেঁচো সার বা ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহার করা হয়। রাসায়নিক সারের মধ্যে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি এবং জিপসাম নির্দিষ্ট অনুপাতে প্রয়োগ করতে হয়, যার মধ্যে পটাশিয়াম সারের ভূমিকা তরমুজের মিষ্টি ভাব, আকার বৃদ্ধি এবং খোসা শক্ত করতে অপরিসীম। বীজ বপনের জন্য সাধারণত জমিতে নির্দিষ্ট দূরত্বে মাদা বা গর্ত তৈরি করা হয়। প্রতিটি মাদায় তিনটি থেকে চারটি সুস্থ ও সবল বীজ বপন করা হয়। চারা গজানোর পর দুর্বল চারাগুলো ফেলে দিয়ে প্রতিটি মাদায় কেবল সবচেয়ে সবল দুই বা তিনটি চারা রেখে দেওয়া হয়। তরমুজ গাছ লতানো প্রকৃতির হওয়ায় গাছ বড় হওয়ার সাথে সাথে মাচায় তোলার ব্যবস্থা করলে গাছের রোগবালাই কম হয় এবং ফল অনেক বেশি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন থাকে, যদিও মাটিতে ছড়িয়ে চাষ করার প্রচলনই এখনো বেশি। মাটিতে চাষ করলে ফলের নিচে পচন ধরার ঝুঁকি থাকে, তাই কৃষকরা ফলের নিচে শুকনো খড় বা পলিথিন বিছিয়ে দেন যাতে মাটির আর্দ্রতা সরাসরি ফলে না লাগে। নিয়মিত ও পরিমিত সেচ দেওয়া তরমুজ চাষের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দিক। গাছ বাড়ার সময় পরিমিত পানি দরকার হলেও ফল ধরার পর অতিরিক্ত পানি দেওয়া অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এতে ফলের মিষ্টি ভাব কমে যায় এবং খোসা ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়।
যেকোনো লাভজনক ফসলের মতো তরমুজ চাষেও নানা ধরনের মারাত্মক রোগবালাই এবং ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা দিতে পারে, যা কৃষকদের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। তরমুজ গাছে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে মোজাইক ভাইরাস, অ্যানথ্রাকনোজ, ডাউনি মিলডিউ এবং গোড়া পচা রোগ। অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার কারণে ছত্রাকের আক্রমণ খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যার ফলে গাছের পাতা হলুদ হয়ে শুকিয়ে যায় এবং তরমুজ গাছসহ ফল নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া এফিড, থ্রিপস, মাছি পোকা এবং লাল মাকড়সার উপদ্রব তরমুজের কচি পাতা, ফুল ও ছোট ফল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এসব প্রতিকূলতা সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য কৃষকদের এখন প্রচলিত অন্ধ রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম পদ্ধতির প্রতি বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সঠিক সময়ে রোগাক্রান্ত পাতা বা গাছ জমি থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলা, জমির সুষম নিষ্কাশন ব্যবস্থা সর্বদা উন্নত রাখা এবং প্রতিষেধক হিসেবে অনুমোদিত মাত্রায় জৈব বা জৈব-বালাইনাশক স্প্রে করার মাধ্যমে ফসলকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়। আধুনিক কৃষিকৌশলে মালচিং পদ্ধতির বৈপ্লবিক ব্যবহার তরমুজ চাষে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। কালো রঙের পলিথিন দিয়ে মাটির উপরিভাগ নিখুঁতভাবে ঢেকে দেওয়ার এই পদ্ধতিতে আগাছার উপদ্রব প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে, মাটির প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকে এবং ফলের গায়ে মাটির কোনো সংস্পর্শ না লাগায় ফল পচে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না।
উৎপাদন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিতে তরমুজ চাষের অর্থনীতি অত্যন্ত গতিশীল ও বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করেছে। বর্তমানে তরমুজ চাষ কেবল কৃষকদের পারিবারিক চাহিদার খোরাক মেটানোর মধ্যে সম্পূর্ণ সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি অত্যন্ত লাভজনক ও বৃহৎ বাণিজ্যিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রত্যন্ত ও বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের কৃষকদের জীবনযাত্রার আর্থসামাজিক মান পরিবর্তনে তরমুজ চাষ বর্তমানে একটি কার্যকর চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করছে। এক বিঘা জমিতে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করতে যে পরিমাণ খরচ হয়, সঠিক পরিচর্যা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মুনাফা অর্জন করা সম্পূর্ণ সম্ভব। ফলন ভালো হলে কৃষকরা প্রতি বিঘায় হাজার হাজার টাকা নিট আয় করতে পারেন, যা তাদের সারা বছরের পারিবারিক আর্থিক সচ্ছলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তবে এই অত্যন্ত লাভজনক ফসলের বিপণন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তরমুজ অত্যন্ত রসালো, ভারী এবং সংবেদনশীল ফল হওয়ায় এবং এর খোসা তুলনামূলক নরম হওয়ায় পরিবহনের সময় সামান্য অসাবধানতায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। অনেক সময় অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পাইকারি বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতেই বহু তরমুজ ট্রাকে বা গাড়িতে ফেটে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে অনেক সময় প্রকৃত ও পরিশ্রমী কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। এই সমস্যা উত্তরণে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার সুবিধা, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা এবং কৃষকদের জন্য সরাসরি বাজারজাতকরণ বা সমবায় ভিত্তিক বিক্রয়কেন্দ্রের সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
তরমুজ চাষের অর্থনৈতিক গুরুত্ব কেবল স্থানীয় বাজারের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর বিশাল রপ্তানি সম্ভাবনাও দিন দিন উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আমাদের দেশের উর্বর মাটি এবং অনুকূল আবহাওয়ায় উৎপাদিত তরমুজের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ আন্তর্জাতিক মানের হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অফসিজনে বা আগাম উৎপাদিত তরমুজ বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে একটি নতুন খাতের সূচনা করতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সরকারের নীতিগত সহায়তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক বিস্তার। বিদেশে রপ্তানির জন্য প্রয়োজন বিশ্বমানের মান নিয়ন্ত্রণ, সঠিক গ্রেডিং এবং প্যাকহাউস সুবিধা। কৃষকদের আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন কৌশল সম্পর্কে ধারণা দিতে পারলে আমাদের তরমুজ একদিন বিশ্ববাজারে এক অনন্য ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। পাশাপাশি, তরমুজ চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। বীজ বপন থেকে শুরু করে জমি তৈরি, সেচ দেওয়া, নিড়ানি দেওয়া, পরিচর্যা করা, ফল সংগ্রহ এবং বাজারজাতকরণ—প্রতিটি পর্যায়েই বহু শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। এর ফলে গ্রামীণ বেকারত্ব হ্রাস পাচ্ছে এবং দিনমজুর ও প্রান্তিক চাষিরা কাজের সুযোগ পাচ্ছে। নারীদের অংশগ্রহণও এই খাতে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর ফলে সৃষ্ট নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বর্তমান সময়ে তরমুজ চাষের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৌসুমের শুরুতে হঠাৎ অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, কালবৈশাখী ঝড় কিংবা তীব্র খরা তরমুজ চাষের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং জলোচ্ছ্বাসের কারণে অনেক সময় খেতের পর খেত তরমুজ নষ্ট হয়ে যায়। এই বৈরী প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে কৃষি বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং জলবায়ু সহনশীল ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করছেন। এই গবেষণার সুফল মাঠপর্যায়ে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। কৃষকদের শুধু বীজ ও সার দিলেই চলবে না, বরং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের আধুনিক আবহাওয়া পূর্বাভাস ও দুর্যোগ মোকাবিলা করার কৌশল শিখিয়ে দিতে হবে। এছাড়া শিলাবৃষ্টির হাত থেকে ফসল রক্ষা করার জন্য আধুনিক পলিটানেল বা ছায়া জাল ব্যবহারের প্রযুক্তি জনপ্রিয় করে তুলতে হবে, যা বড় ধরনের লোকসানের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে পারে।
তরমুজ চাষের পেছনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অনেক সময় প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষকদের পক্ষে পর্যাপ্ত মূলধন সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না বিধায় তারা উচ্চ সুদে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন, যা তাদের লাভের বড় একটি অংশ গ্রাস করে নেয়। এই দুষ্টচক্র থেকে কৃষকদের মুক্ত করার জন্য সহজ শর্তে ও কম সুদে কৃষি ঋণ বা ব্যাংক ফাইন্যান্সিংয়ের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যদি বিশেষ কৃষি ঋণের আওতায় সহজ প্রক্রিয়ায় তরমুজ চাষিদের জন্য ঋণ মঞ্জুর করে, তবে চাষাবাদের পরিধি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে সমবায় ভিত্তিক চাষাবাদ পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে, যেখানে এলাকার কৃষকেরা একত্রিত হয়ে যৌথভাবে জমি প্রস্তুত, উন্নত বীজ ক্রয় এবং পাইকারি বাজারে পণ্য বিক্রয় করতে পারবেন। এতে উৎপাদন খরচ অনেক কমে যাবে এবং কৃষকেরা তাদের পণ্যের ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হবেন। সমবায়ের শক্তির মাধ্যমে তারা বড় বড় পাইকারি ক্রেতা বা সুপারশপগুলোর সাথে সরাসরি চুক্তি করতে পারবেন, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণ থেকে তাদের চিরতরে মুক্তি দেবে।
পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের দিক থেকেও তরমুজের গুরুত্ব অপরিসীম, যা ভোক্তা সাধারণের মাঝে তরমুজের চাহিদা সবসময় তুঙ্গে রাখে। তরমুজে প্রচুর পরিমাণে পানি, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, লাইকোপেন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। তরমুজে থাকা লাইকোপেন নামক উপাদান হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে এবং ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অত্যন্ত উপকারী। এছাড়া এতে ক্যালোরির পরিমাণ খুবই কম থাকায় ওজন নিয়ন্ত্রণে ইচ্ছুকদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ফল। ভোক্তা পর্যায়ে নিরাপদ ও বিষমুক্ত তরমুজ সরবরাহ নিশ্চিত করাও বর্তমান সময়ের একটি বড় দাবি। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের লোভে অপরিপক্ব তরমুজে হরমোন বা কেমিক্যাল প্রয়োগ করে দ্রুত পাকানোর চেষ্টা করেন, যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই ধরনের ভেজাল ও ক্ষতিকারক প্রবণতা রোধে সরকারের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। কৃষকদের সচেতন করতে হবে যাতে তারা সঠিক সময়ে পরিপক্ব হওয়া ফলই বাজারে নিয়ে আসেন এবং কেমিক্যালমুক্ত প্রাকৃতিক উপায়ে চাষাবাদ অব্যাহত রাখেন।
বাংলাদেশের কৃষির বর্তমান উজ্জ্বল প্রেক্ষাপটে তরমুজ চাষ একটি অনন্য ও অনুকরণীয় সাফল্যের গল্প লিখে চলেছে। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে আমাদের দেশের কৃষকরা নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণে কখনোই পিছিয়ে নেই এবং তারা সময়ের সাথে সাথে নিজেদের চাষাবাদ কৌশলকে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক করে তুলছেন। দেশের সাধারণ মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি তরমুজ আজ গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করে তোলার অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। তবে এই অর্জিত সম্ভাবনাকে দীর্ঘস্থায়ী ও পূর্ণতা দিতে হলে প্রয়োজন সরকারি, বেসরকারি এবং কৃষক সমাজের সম্মিলিত ও সুসংহত প্রচেষ্টা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান, উন্নতমানের রোগমুক্ত বীজ ও মানসম্মত সার ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহ এবং সহজ শর্তে জামানতবিহীন কৃষি ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করলে দেশের প্রতিটি প্রান্তে তরমুজ চাষ আরও বহুগুণ প্রসার লাভ করবে। একই সাথে জলবায়ু সহনশীল ও অধিক ফলনশীল নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের পরিধি আরও বাড়াতে হবে, যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগেও তরমুজ চাষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সবশেষে বলা যায়, আমাদের সবুজ বাংলার মাঠে মাঠে সোনালী, হলুদ ও কালচে সবুজ রঙের এই রসালো ফল কেবল মানুষের মনের তৃষ্ণা ও পুষ্টির খোরাকই মেটাচ্ছে না, বরং এটি আমাদের গ্রামীণ জনপদে সোনালী ভবিষ্যতের এক অদম্য ও সম্ভাবনাময় নতুন দিগন্তের উন্মোচন করছে।
E-mail:dailysabujbangla26@gmail.com 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL