ইসিএ (ECA) আইন লঙ্ঘন ও হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্য করে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে অবৈধভাবে রাস্তা নির্মাণের প্রতিবাদে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর উদ্যোগে শুক্রবার (২৮ আগস্ট ২০২৬) বেলা ১১টায় ধানমন্ডিস্থ জয়িতা টাওয়ারের সামনে এই কর্মসূচি পালিত হয়।
বাপা’র সহ-সভাপতি জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়ি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সাময়িক উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক স্বার্থে বালিয়াড়ি ধ্বংস করে রাস্তা নির্মাণ করা হলে তা উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।
মানববন্ধনে বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে অপরিকল্পিত ও ব্যয়বহুল প্রকল্প থেকে সরে আসতে হবে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতামতের তোয়াক্কা না করে এবং হাইকোর্টের রায়কে অবজ্ঞা করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সভাপতির বক্তব্যে জনাব জাকির হোসেন বলেন, কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ। সাময়িক উন্নয়নের নামে এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হলে তার ক্ষতি অপূরণীয় হতে পারে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবৈধ দখল, স্থাপনা নির্মাণ এবং বালিয়াড়ি ধ্বংসের কারণে এর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। দেশের পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের কথাকে অগ্রাহ্যকরে উন্নয়নের নামে সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে রাস্তা নির্মাণ জনগণের নিকট মোটেও ভালো বার্তা যাচ্ছেনা।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, আমরা ভারত-রেপালের সম্প্রতি বিপর্যয়গুলো দেখে উপলব্দি করতে পারি প্রকৃতির ক্ষতি করলে কী পরিণতি হতে পারে। এই রাস্তা নির্মাণের পিছনে আছে বানিজ্যিক খেলা। এটি একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রকল্প; কারণ বালির উপর রাস্তা।
বাপা কক্সবাজার জেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম. জাফর আলম দিদার বলেন, সমুদ্রের বালিয়াড়ি শুধু সৈকতের সৌন্দর্যের অংশ নয়; এটি ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও শক্তিশালী ঢেউয়ের বিরুদ্ধে উপকূলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। একই সঙ্গে বালিয়াড়ি সামুদ্রিক,কাঁকড়া, কচ্ছপসহ বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এভাবে নির্বিচারে বালিয়াড়ি কেটে রাস্তা বা স্থাপনা নির্মাণ করলে দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় ভাঙন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও পর্যটন পরিবেশের অবনতি ঘটবে বলে আমরা আসংখ্যা প্রকাশ করছি।
বাপা কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক, মো. আলমগীর কবির বলেন, কক্সবাজারের বিএনপির একজন নেতা সমুদ্রের বালিয়াড়ীতে রাস্তা নির্মাণের বিপক্ষে কথা বলায় পরিবেশের পক্ষে কথাবলায় বাপাকে একটি ভূঁইফোড় সংগঠন হিসেবে বক্তব্য দিচ্ছে শুধু নিজেদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক স্বার্থে। সুগন্ধা বিচ পয়েন্টের বালিয়াড়ির ওপর রাস্তা নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় আমরা চরমভাবে উদ্বিগ্ন। এই প্রকল্প অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানান তিনি।
বাপা কক্সবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক, করিম উল্লাহ কলিম বলেন, মহামান্য হাইকোর্টের রায়কে অবজ্ঞা করে সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে রাস্তা নির্মাণ
করা হবে আত্নঘাতী। বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়ি রক্ষা এবং পরিবেশবিধ্বংসী রাস্তা নির্মাণ বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবী জানান তিনি।
মানববন্ধনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাপা কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ও নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব, বাপা কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি এম. জাফর আলম দিদার, সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম এবং বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি আসাদুজ্জামান খান। এতে কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন শাখা থেকে আগত বাপা’র স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বাপা’র পেশকৃত ৭ দফা দাবি:
১. সুগন্ধা বিচসহ সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে চলমান রাস্তা নির্মাণ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
২. হাইকোর্টের মামলা নং ২২৬/২০১১-এর রায় ও নির্দেশনা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
৩. ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনা ও দখল উচ্ছেদ করতে হবে।
৪. বালিয়াড়িতে কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ও বিশেষজ্ঞ মতামত বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৫. বালিয়াড়ি, সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজননক্ষেত্র ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
৬. পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭. কক্সবাজারে অবৈধভাবে টিলা ও পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে।