৩৬ বছর ধরে সিঙ্গারা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে হারিছ কুমার

সাদেকুর রহমান সোহাগ, ভালুকা (ময়মনসিংহ)
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

 
জীবনের যুদ্ধটা শুরু হয় সেই নব্বই দশকে। শারীরিক প্রতিবন্ধী ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে হারিছ কুমার ভালুকা উপজেলার পাবলিক হলের (শাপলা সিনেমা) সামনে ভাজাপোড়ার দোকান করেন। সংসারের দারিদ্রতা গুচাতে প্রতিবন্ধী ভাইকে নিয়ে নেমে পড়েন জীবন সংগ্রামে। হারিছ কুমার ভালুকা উপজেলার দক্ষিণ রাংচাপড়া গ্রামের আবদুল কুমারের ছেলে।
মঙ্গলবার দুপুরে পৌর এলাকার পাবলিক হল রোডের ওই হারিছ কুমারের ভাজাপোড়ার দোকানে যাই। হারিছ কুমারের দোকানটি যেমনি জরাজীর্ণ এবং তেমনি আকারেও ছোট। রোডের পাশেই আমার স্কুটিটি পার্ক করে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম হারিছ কুমার তার সিলভারের বড় ডিস থেকে গোলাই করা ময়দা বের করে একটি টেবিলে টুকরো টুকরো করে রাখছেন। পাশেই আলু ভেঁজে রাখা হয়েছে আরেকটি ডিসে। বেলাইন দিয়ে ময়দা টেনে তাতে আলু ভর্তি করে ডুবা তেলে কড়াইয়ে ঢালছেন। চূলায় লাকড়িগুলো দাউ দাউ করে জ¦লছিল। গরম তেলের ভেতর সিঙ্গারাগুলো মাঝে মধ্যেই নেড়ে চেড়ে দিচ্ছেন হারিছ কুমার। সোনালী বাদামী রঙ আসতেই সেগুলো আরেকটি পাত্রে তুলে রাখছেন। গরম গরম সিঙ্গারার গন্ধ পেয়ে অনেক মানুষই আসতে শুরু করেছেন হারিছ কুমারের দোকানে। জায়গা তেমন নেই, কষ্ট করে আমিও বসলাম। দোকানি হারিছ কুমারকে বললাম আমিও সিঙ্গারা খাবো। হারিছ কুমার আমাকেও সাতটি সিঙ্গারা আরেকটি ভাজা শুকনা মরিচ একটি বাটিতে আমার সামনে দিল। আমি খেয়ে দারুন স্বাদ পেলাম। মন চাইছিল আরও কয়েকটা সিঙ্গারা নিই, কিন্তু পেটে এসিডিটি হতে পারে ভেবে আর নিইনি। পাশেই কয়েক ভদ্রলোক সিঙ্গারা খেতে আসছেন। জিজ্ঞাস করলাম কোথা থেকে আসছেন। ভদ্রলোক বললেন আমি উপজেলা কৃষি অফিস থেকে আসছি। সুযোগ পেলেই এই হারিছ কুমারের দোকানে আসি। তার এখানে সিঙ্গারা খেতে খুব স্বাদ। মাঝে মধ্যে বাড়িও নিয়ে যাই। একে একে অনেক লোকজন আসছেন বসে সিঙ্গারা খেয়ে যাচ্ছেন আবার কেউ বাসায়ও নিয়ে যাচ্ছেন। মূহুর্তের মাঝেই ভাজা সিঙ্গারাগুলো শেষ হয়ে গেল। হারিছ কুমার আবারও ময়দা বের করে সিঙ্গারা ও লুচি ভাজা শুরু করলো।
দীর্ঘক্ষণ বসে হারিছ কুমার সিঙ্গারা ভাজা এবং বিক্রি দেখছিলাম। পাবলিক হল রোডে অনেক প্রাইভেট স্কুল ও কোচিং সেন্টার রয়েছে। সেখানকার কোমলমতি শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষজন এই হারিছ কুমারের সিঙ্গারা খেতে পছন্দ করেন।
কাজের ফাঁকে হারিছ কুমারকে জিজ্ঞাসা করলাম- এই ব্যবসার বয়স কত হল আপনার। হারিছ কুমার জানালো প্রায় ৩৬ থেকে ৩৭ বছর হবে। আগে তো ছোট ভাইকে নিয়ে শুরু করি। তখন এক টাকা, পরে দুই টাকা করে বিক্রি হতো। এখন তিন টাকা করে বিক্রি করছি। আপনার সিঙ্গারা তো আকারে অনেক ছোট জিজ্ঞেস করতেই তিনি উত্তর দেন এখন তো জিনিসপত্রের দাম অনেক। পুষাতে পারিনা। দিন শেষে কত থাকে জানতে চাইলে তিনি বলেন- দিন শেষে হাজার- বারশো থাকে। আবার কোনো দিন সাত- আটশো থাকে। সব দিনতো সমান যায় না। হারিছ মিয়া আরও জানান, ওই দোকানটি বিদ্যুত বিলসহ তিনি এগারশো টাকা ভাড়া দেন। ভাড়া দিয়ে কোনোমতে চলে যাচ্ছে তার। সংসারে তার এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। ছেলে মেয়ে স্কুল কলেজে পড়াশুনা করছে। বাড়ি তার স্ত্রী রয়েছেন। বোরো মৌসুমে চাষাবাদ ছাড়াও বাড়ি গরু ছাগল পালন করেন। এভাবে সংসার তার ভালই চলে যাচ্ছে। তিনি এই দোকানটি বড় করবেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, এভাবেই করতে চাই। বড় করে লাভ নেই, সব খরচ মিটিয়ে দেখা যাবে আমার কিছু থাকবেনা। আমি একা একাই যা পারি যতদিন পারি করবো। সৎ ভাবে চলতে পারলেই হয়।
হারিছ কুমার একজন হাসিখুশি মানুষ। কারো সাথেই খারাপ ব্যবহার করে না। অনেক শিশুরা তার সিঙ্গারা খেতে চাইতে তাদেরকে বিনে পয়সাতেও খেতে দেন। তিনি এই সাধারণ ভাবে অল্প রোজগারেই খুশি। তার স্বপ্ন উচ্চবিলাসী না হলেও সুন্দর করে চলতে চান। হারিছ কুমার মনে করেন অনেক দরিদ্র ঘরের যুবকরা বেকার অবস্থায় ঘুরছে। কিছু করতে না পেরে নানা অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। সমাজে কোনো পেশাই খারাপ না। যদি সৎ ভাবে পরিশ্রম করে কিছু একটা করা যায় তাতেই সফলতা পাওয়া যায়। জীবনকে এগিয়ে নেওয়া যায়। মানুষের পরিশ্রম আর সুৎ চিন্তা ভাবনার মাঝেই একটি সুন্দর সমাজ গড়ে উঠতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL