০৬:৪৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ভয়াবহরূপে বাড়ছে শব্দদূষণ

◉ ২০৫০ সালে আড়াই বিলিয়ন মানুষ কানে শোনার সমস্যায় ভুগবে
◉কানে শোনার যন্ত্রের প্রয়োজন হবে ৭০০ মিলিয়নের
◉ঢাকায় শব্দের মাত্রা থাকা দরকার ৫০ ডেসিবল, আছে ১১৯
◉হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার পরেও বাজছে হাইড্রোলিক হর্ন
◉সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুরা, পঙ্গু হচ্ছে গর্ভের সন্তান
◉ দেশের ৮ শতাংশ মানুষ কানে শোনার সমস্যায় ভুগছে

 

 

 

 

‘এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে, চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে’ কবি শামসুর রাহমান তার পণ্ডশ্রম কবিতায় এভাবেই কানের কারণে চিলের পেছনে ছোটার গল্প বর্ণনা করেছেন। কবির সেই কবিতায় চিলে কান নেয়নি। কান মাথার সঙ্গেই লেগে ছিল। কিন্তু বর্তমানে আমাদের বাংলাদেশিদের কান নষ্ট করছে হাইড্রোলিক হর্ন এবং অন্যান্য শব্দদূষণ।

 

ছোট্ট সুমাইয়া মেহজাবীন মায়ের সঙ্গে রিকশায় চড়ে স্কুলে যাচ্ছে। তাদের রিকশাটা আজিমপুর মোড়ে এসে দাঁড়াতেই বড় একটি বাস জোরে হর্ন বাজিয়ে চলে যায়। আর সেই শব্দে সুমাইয়া কানে আঙ্গুল দেয়। শুধু সুমাইয়া নয়, দেশের রাজধানীসহ বড় বড় নগরগুলোতে রাস্তায় বের হলেই শিশু থেকে শুরু করে, তরুণ, বৃদ্ধ প্রত্যেককে এই হর্নের যন্ত্রণায় ভুগতে হচ্ছে। এই অবস্থা পরিবর্তন না হলে তা শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব ভয়াবহ রূপ নেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

 

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০৫০ সালে বিশে^ প্রায় আড়াই বিলিয়ন মানুষ কানে শোনার সমস্যায় ভুগবে। ৭০০ মিলিয়ন মানুষ কানে শোনার যন্ত্রের প্রয়োজন হবে। কানে হেড ফোন লাগিয়ে বা উচ্চৈঃস্বরে গান শোনার কারণে প্রায় ১ বিলিয়নের বেশি তরুণের কান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে বা কানের শোনার ক্ষমতা হ্রাস পাবে। বিশ^ব্যাপী শুধু একজনের কানের চিকিৎসার জন্য বছরে কমপক্ষে ১.৪০ ইউএস ডলার খরচের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। এ খরচ প্রতি ১০ বছরে বেড়ে ১৬ ইউএস ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

 

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদনে ঢাকার শব্দের মানমাত্রা ১১৯ ডেসিবল পর্যন্ত উঠেছে।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা কুদরাত-ই-খোদা। তিনি বলেন, আমি তো গ্রামে বড় হয়েছি তখন গ্রামের শতবর্ষী মানুষদেরও দেখেছি তারা কানে স্পষ্ট শুনতে পেত। কিন্তু আমার নিজের বাবার বেলায় দেখলাম মাত্র ৬০ বছর বয়সেই তার শ্রবণশক্তি হারিয়ে গেল। এটা সম্পূর্ণ গাড়ির হর্নের কারণে হয়েছে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দরকার। একটা সভ্য সমাজে কেউই এভাবে হর্ন বাজাতে পারে না। না, গাড়ির চালক, না মোটরসাইকেল চালক। আমার বাবার কানের চিকিৎসা করাতে প্রচুর খরচ করতে হয়েছে। আর কানে শোনার যে যন্ত্র এটার দামও প্রচুর।

 

 

আমিতো আর্থিকভাবে সচ্ছল তাই বাবার কানে যন্ত্র লাগাতে পেরেছি। কিন্তু যাদের আয় স্বল্প তাদের কথা আমি তো চিন্তাই করতে পারি না। তারা এই বিপদ কি করে সামলাবে? তিনি অবিলম্বে গাড়ির হর্ন বন্ধ করে শব্দদূষণ প্রতিরোধে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট গ্রুপ অব বাংলাদেশ অ্যান্ড ইয়ার ফাউন্ডেশনের গবেষণা জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশের হিয়ারিং লস আছে। তাদের মধ্য থেকে দেশে দুই হাজার রোগীর অপারেশন করেছে ফাউন্ডেশনটি। একটি বেসিক মডেলের কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্টের গড় মূল্য দাঁড়ায় ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। উচ্চতর মডেলের ক্ষেত্রে এর মূল্য ২০-৩০ লাখ টাকা হয়ে থাকে।

 

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ২০০৬ সালে বিধিমালা করা হয়েছে। এতে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬-এর বিধি ৮(১), ১৮(২) অনুযায়ী মানমাত্রা অতিক্রম করে হর্ন বাজানোর অপরাধে অনধিক ১ (এক) মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ৫(পাঁচ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার কথা বলা হয়েছে।

 

বিধিমালায় নীরব এলাকায় দিনে ৫০ ডেসিবল, রাতে ৪০ ডেসিবল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ডেসিবল, রাতে ৪৫ ডেসিবল, মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ ডেসিবল রাতে ৫০ ডেসিবল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ডেসিবল রাতে ৬০ ডেসিবল, শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ডেসিবল ও রাতে ৭০ ডেসিবল শব্দের মানমাত্রা থাকার কথা বলা হয়েছে।

 

 

বিধিমালা ২ এর (ব)তে ‘হর্ন অর্থ উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী নিউম্যাট্রিক, হাইড্রোলিক বা মাল্টি টিউনড হর্ন’Ñ বোঝানো হয়েছে। ধারা (দ) তে বলা হয়েছে, ‘শব্দদূষণ অর্থ শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী এমন কোনো শব্দ সৃষ্টি বা সঞ্চালন যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বা ক্ষতির সহায়ক হইতে পারে।’

 

গবেষকদের মতে, ২০১৭ সালে হাইকোর্টের নির্দেশে গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৯ সালে সচিবালয় এলাকাকে হর্নমুক্ত এলাকা ঘোষণা করা হয়। এখনও সেখানে এ সংক্রান্ত সাইনবোর্ড শোভা পায় কিন্তু এটির কোনো বাস্তবভিত্তি দেখা যায়নি।

২০১৭ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে শব্দদূষণ নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে। যে জরিপে দেখা যায়, বিভিন্ন শহরের শিল্প (কল-কারখানা) থেকে শব্দদূষণের কারণ হিসেবে মেশিনের শব্দ অন্যতম প্রধান উৎস। এছাড়া বাসাবাড়ি ও শপিংমলে জেনারেটর ও উচ্চ শব্দে মিউজিক প্লেয়ার বাজানোও শব্দদূষণের কারণ। সভা-সমাবেশ এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত মাইক থেকেও শব্দদূষণ হচ্ছে। হর্ন গণনার ফলাফল অনুযায়ী রংপুর বাস টার্মিনাল হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ৮১০টি হর্ন বাজানো হয়, যার মধ্যে ৩৯৩টি হাইড্রালিক হর্ন এবং ৪১৭টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়।

 

রাজশাহীতেও একই কারণে শব্দদূষণ হচ্ছে। বিন্দুর মোড় এলাকায় নগরীর সবচেয়ে বেশি শব্দদূষণ হয়, সেখানে ১০ মিনিটে ৫৭৩টি হর্ন বাজাতে দেখা যায়, যার মধ্যে ১২০টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ৪৫৩টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়।

ময়মনসিংহের ‘ব্রিজ মোড়’ এলাকা হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ৯৩৫টি হর্ন বাজাতে দেখা যায়, যার মধ্যে ৩৯৫টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ৪৫৩টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়।

রাজধানী ঢাকার শ্যামলী এলাকায় নির্ধারিত স্থানটি হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ৫৯৮টি হর্ন বাজানো হয়, যার মধ্যে ১৫৮টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ৪৪০টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়। চট্টগ্রামের বহদ্দার হাট হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ৬৭২টি হর্ন বাজানো হয়, যার মধ্যে ৮৭টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ৫৮৫টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়। বরিশালের রূপাতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নির্ধারিত স্থানটি হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ৪২৭টি হর্ন বাজাতে দেখা যায়, যার মধ্যে ২০৯টি হাইড্রালিক হর্ন এবং ২১৬টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়। সিলেটের রিকাবী বাজার এলাকায় নির্ধারিত স্থানটি হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ১১২১টি হর্ন বাজাতে দেখা যায়, যার মধ্যে ১০৮টি হাইড্রোলিক হর্র্ন এবং ১০১৩টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়। খুলনার গল্লামারী এলাকা হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ৮১৬টি হর্ন বাজানো হয়, যার মধ্যে ৫৬টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ৭৬০টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, একটা ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে, সারাদেশেই শব্দদূষণ বাড়ছে। পরিবেশের বিষয়গুলো উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকে। একারণে উন্নয়ন হলে পরিবেশের বিভিন্ন উদ্বেগও বাড়ে। আমরা সেগুলো কতটুকু ম্যানেজ করতে পারলাম এটাই বিষয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজ এটাই এগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। দেশের উন্নয়ন অবশ্যই হবে, এরসঙ্গে যে দূষণগুলো হবে সেগুলো আমরা কিভাবে ম্যানেজ করব। সবসময় আমরা এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তাও না। তবু এর চেষ্টাটা করে যাওয়া। ২০১৭ সালের জরিপের সময় আমরা বুঝতে পেরেছি দেশে শব্দদূষণ বাড়ছে। এখনও এটা আসলে বাড়ছে।

 

স্নায়ুরোগ চিকিৎসক ডা. মুহম্মদ শফিকুল হকের মতে, শব্দদূষণের কারণে হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, বুক ধড়ফড়, মাথাব্যথা, খিটখিটে মেজাজ, পেপটিক আলসার, অস্থিরতা, উৎকণ্ঠা, অমনোযোগী ভাব, ঘুমে ব্যাঘাত, শ্রবণশক্তি, স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, এমনকি মেয়েদের পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

 

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অধ্যাপক ডা. চৌধুরী ইয়াকুব জামাল বলেন, একটি নির্দিষ্ট ডেসিবলর ওপর শব্দ গেলে তা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এটা শিশুদের বিরক্তি বাড়িয়ে দেয়। তখন নির্দিষ্ট কোনও কাজে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। মনোসংযোগ চলে যাওয়াই স্বাভাবিক। একটা বয়স পরে এসব শিশুর কানে বধিরতা দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমাদের দেশে হাইড্রোলিক হর্ন সর্ম্পূণ নিষিদ্ধ। এটা তাহলে দেশে কিভাবে আসছে? এটার আমদানি বন্ধ করতে হবে। গাড়ির ফিটনেসের সময় প্রয়োজনে একটা ডিভাইস যুক্ত করে দেয়া হোক। যা ড্রাইভারের হর্নের তথ্য দ্রুত সার্ভারে পাঠাবে। যখন পরপর তিনবার একজন ড্রাইভার হর্ন বাজাবে। আর এরজন্য তার তিন হাজার টাকা জরিমানা হবে, সে আর কখনোই এই কাজ করবে না।

 

তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি যাচ্ছে, আমরা ধীরে ধীরে একটা বধির জাতিতে পরিণত হচ্ছি। এখন ছোট শিশুদের কানের সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এটা সম্পূর্ণ শব্দদূষণের কারণে হচ্ছে। মানসিক সমস্যা শিশুদের পাশাপাশি বড়দেরও দেখা যাচ্ছে। এই অবস্থা আমাদের অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে।

 

হর্ন প্রতিরোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রম :

পরিবেশ অধিদপ্তরের গত ফেব্রুয়ারি মাসের কার্যক্রমে দেখা যায়, তারা সারা দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছে। শব্দদূষণ প্রতিরোধে হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে এবং বিভিন্ন এলাকায় জরিমানা আদায় করেছে। এর মধ্যে গত ৪ ফেব্রুয়ারি পরিবেশ অধিদপ্তরের নীলফামারী জেলা কার্যালয় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মানমাত্রাতিরিক্ত হর্নে শব্দদূষণের দায়ে ৪টি যানবাহন থেকে মোট ৩ হাজার ৫শ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ৭টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে। ৫ ফেব্রুয়ারি গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ জেলা কার্যালয় ৭টি যানবাহন থেকে মোট ১৯ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। এসময় ১৩টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে।

৮ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনা, জামালপুর, বরিশাল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কার্যালয় ১৪টি যানবাহন থেকে ২৪ হাজার ৫শ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ১৩টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি পাবনা জেলা কার্যালয় শব্দদূষণের দায়ে ৩টি যানবাহন থেকে মোট ৩ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ৩টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে।

১৩ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল ও ঝিনাইদহ জেলা কার্যালয় ৬টি যানবাহন থেকে মোট ২০ হাজার টাকা জরিমানা ধার্যপূর্বক আদায় করেছে। পাশাপাশি ৮টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম ও খুলনা জেলা কার্যালয় ৬টি যানবাহন থেকে মোট ১১ হাজার ৫শ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ৮টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে।

১৫ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালী জেলা কার্যালয় ৫টি যানবাহন থেকে মোট ৩ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ৩টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়েছে।

১৮ ফেব্রুয়ারি ভোলা জেলা কার্যালয় ৭টি যানবাহন থেকে মোট ১ হাজার ৫শ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। ২০ ফেব্রুয়ারি খুলনা, পঞ্চগড় ও পাবনা জেলা কার্যালয় ৬টি যানবাহন থেকে মোট ২ হাজার ৭ শত টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ১১টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে। ২২ ফেব্রুয়ারি ১০টি যানবাহন থেকে মোট ১২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ১৪টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে।
২৫ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া জেলা কার্যালয় ১৬টি যানবাহন থেকে মোট ১৩ হাজার ৯শ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ৩৬টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়েছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনা জেলা কার্যালয় ৪টি যানবাহন থেকে মোট ৪ হাজার ৫শ টাকা জরিমানা ধার্যপূর্বক আদায়সহ ৮টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ফেনী জেলা কার্যালয় ২টি যানবাহন থেকে মোট ২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ৪টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়েছে।

 

শব্দদূষণ প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত আন্দোলনকারীরা বলছেন, বিদ্যমান আইন প্রয়োগের পাশাপাশি যানবাহন সংক্রান্ত শব্দ হ্রাসে সড়কের পাশে গাছ লাগিয়ে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা, শব্দের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে আনতে কার্যকরী উপায় বের করা, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে গবেষণা ও এর ফলাফল সেমিনার ও সম্মেলনের মাধ্যমে জনগণকে জানানো, জনসাধারণের মাঝে শব্দদূষণের ক্ষতি, প্রতিকার এবং বিদ্যমান আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে দেশ থেকে শব্দদূষণ চিরতরে দূর করা সম্ভব।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ভয়াবহরূপে বাড়ছে শব্দদূষণ

আপডেট সময় : ০৪:৪৪:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল ২০২৪

◉ ২০৫০ সালে আড়াই বিলিয়ন মানুষ কানে শোনার সমস্যায় ভুগবে
◉কানে শোনার যন্ত্রের প্রয়োজন হবে ৭০০ মিলিয়নের
◉ঢাকায় শব্দের মাত্রা থাকা দরকার ৫০ ডেসিবল, আছে ১১৯
◉হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার পরেও বাজছে হাইড্রোলিক হর্ন
◉সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুরা, পঙ্গু হচ্ছে গর্ভের সন্তান
◉ দেশের ৮ শতাংশ মানুষ কানে শোনার সমস্যায় ভুগছে

 

 

 

 

‘এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে, চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে’ কবি শামসুর রাহমান তার পণ্ডশ্রম কবিতায় এভাবেই কানের কারণে চিলের পেছনে ছোটার গল্প বর্ণনা করেছেন। কবির সেই কবিতায় চিলে কান নেয়নি। কান মাথার সঙ্গেই লেগে ছিল। কিন্তু বর্তমানে আমাদের বাংলাদেশিদের কান নষ্ট করছে হাইড্রোলিক হর্ন এবং অন্যান্য শব্দদূষণ।

 

ছোট্ট সুমাইয়া মেহজাবীন মায়ের সঙ্গে রিকশায় চড়ে স্কুলে যাচ্ছে। তাদের রিকশাটা আজিমপুর মোড়ে এসে দাঁড়াতেই বড় একটি বাস জোরে হর্ন বাজিয়ে চলে যায়। আর সেই শব্দে সুমাইয়া কানে আঙ্গুল দেয়। শুধু সুমাইয়া নয়, দেশের রাজধানীসহ বড় বড় নগরগুলোতে রাস্তায় বের হলেই শিশু থেকে শুরু করে, তরুণ, বৃদ্ধ প্রত্যেককে এই হর্নের যন্ত্রণায় ভুগতে হচ্ছে। এই অবস্থা পরিবর্তন না হলে তা শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব ভয়াবহ রূপ নেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

 

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০৫০ সালে বিশে^ প্রায় আড়াই বিলিয়ন মানুষ কানে শোনার সমস্যায় ভুগবে। ৭০০ মিলিয়ন মানুষ কানে শোনার যন্ত্রের প্রয়োজন হবে। কানে হেড ফোন লাগিয়ে বা উচ্চৈঃস্বরে গান শোনার কারণে প্রায় ১ বিলিয়নের বেশি তরুণের কান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে বা কানের শোনার ক্ষমতা হ্রাস পাবে। বিশ^ব্যাপী শুধু একজনের কানের চিকিৎসার জন্য বছরে কমপক্ষে ১.৪০ ইউএস ডলার খরচের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। এ খরচ প্রতি ১০ বছরে বেড়ে ১৬ ইউএস ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

 

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদনে ঢাকার শব্দের মানমাত্রা ১১৯ ডেসিবল পর্যন্ত উঠেছে।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা কুদরাত-ই-খোদা। তিনি বলেন, আমি তো গ্রামে বড় হয়েছি তখন গ্রামের শতবর্ষী মানুষদেরও দেখেছি তারা কানে স্পষ্ট শুনতে পেত। কিন্তু আমার নিজের বাবার বেলায় দেখলাম মাত্র ৬০ বছর বয়সেই তার শ্রবণশক্তি হারিয়ে গেল। এটা সম্পূর্ণ গাড়ির হর্নের কারণে হয়েছে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দরকার। একটা সভ্য সমাজে কেউই এভাবে হর্ন বাজাতে পারে না। না, গাড়ির চালক, না মোটরসাইকেল চালক। আমার বাবার কানের চিকিৎসা করাতে প্রচুর খরচ করতে হয়েছে। আর কানে শোনার যে যন্ত্র এটার দামও প্রচুর।

 

 

আমিতো আর্থিকভাবে সচ্ছল তাই বাবার কানে যন্ত্র লাগাতে পেরেছি। কিন্তু যাদের আয় স্বল্প তাদের কথা আমি তো চিন্তাই করতে পারি না। তারা এই বিপদ কি করে সামলাবে? তিনি অবিলম্বে গাড়ির হর্ন বন্ধ করে শব্দদূষণ প্রতিরোধে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট গ্রুপ অব বাংলাদেশ অ্যান্ড ইয়ার ফাউন্ডেশনের গবেষণা জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশের হিয়ারিং লস আছে। তাদের মধ্য থেকে দেশে দুই হাজার রোগীর অপারেশন করেছে ফাউন্ডেশনটি। একটি বেসিক মডেলের কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্টের গড় মূল্য দাঁড়ায় ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। উচ্চতর মডেলের ক্ষেত্রে এর মূল্য ২০-৩০ লাখ টাকা হয়ে থাকে।

 

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ২০০৬ সালে বিধিমালা করা হয়েছে। এতে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬-এর বিধি ৮(১), ১৮(২) অনুযায়ী মানমাত্রা অতিক্রম করে হর্ন বাজানোর অপরাধে অনধিক ১ (এক) মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ৫(পাঁচ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার কথা বলা হয়েছে।

 

বিধিমালায় নীরব এলাকায় দিনে ৫০ ডেসিবল, রাতে ৪০ ডেসিবল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ডেসিবল, রাতে ৪৫ ডেসিবল, মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ ডেসিবল রাতে ৫০ ডেসিবল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ডেসিবল রাতে ৬০ ডেসিবল, শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ডেসিবল ও রাতে ৭০ ডেসিবল শব্দের মানমাত্রা থাকার কথা বলা হয়েছে।

 

 

বিধিমালা ২ এর (ব)তে ‘হর্ন অর্থ উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী নিউম্যাট্রিক, হাইড্রোলিক বা মাল্টি টিউনড হর্ন’Ñ বোঝানো হয়েছে। ধারা (দ) তে বলা হয়েছে, ‘শব্দদূষণ অর্থ শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী এমন কোনো শব্দ সৃষ্টি বা সঞ্চালন যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বা ক্ষতির সহায়ক হইতে পারে।’

 

গবেষকদের মতে, ২০১৭ সালে হাইকোর্টের নির্দেশে গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৯ সালে সচিবালয় এলাকাকে হর্নমুক্ত এলাকা ঘোষণা করা হয়। এখনও সেখানে এ সংক্রান্ত সাইনবোর্ড শোভা পায় কিন্তু এটির কোনো বাস্তবভিত্তি দেখা যায়নি।

২০১৭ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে শব্দদূষণ নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে। যে জরিপে দেখা যায়, বিভিন্ন শহরের শিল্প (কল-কারখানা) থেকে শব্দদূষণের কারণ হিসেবে মেশিনের শব্দ অন্যতম প্রধান উৎস। এছাড়া বাসাবাড়ি ও শপিংমলে জেনারেটর ও উচ্চ শব্দে মিউজিক প্লেয়ার বাজানোও শব্দদূষণের কারণ। সভা-সমাবেশ এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত মাইক থেকেও শব্দদূষণ হচ্ছে। হর্ন গণনার ফলাফল অনুযায়ী রংপুর বাস টার্মিনাল হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ৮১০টি হর্ন বাজানো হয়, যার মধ্যে ৩৯৩টি হাইড্রালিক হর্ন এবং ৪১৭টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়।

 

রাজশাহীতেও একই কারণে শব্দদূষণ হচ্ছে। বিন্দুর মোড় এলাকায় নগরীর সবচেয়ে বেশি শব্দদূষণ হয়, সেখানে ১০ মিনিটে ৫৭৩টি হর্ন বাজাতে দেখা যায়, যার মধ্যে ১২০টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ৪৫৩টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়।

ময়মনসিংহের ‘ব্রিজ মোড়’ এলাকা হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ৯৩৫টি হর্ন বাজাতে দেখা যায়, যার মধ্যে ৩৯৫টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ৪৫৩টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়।

রাজধানী ঢাকার শ্যামলী এলাকায় নির্ধারিত স্থানটি হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ৫৯৮টি হর্ন বাজানো হয়, যার মধ্যে ১৫৮টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ৪৪০টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়। চট্টগ্রামের বহদ্দার হাট হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ৬৭২টি হর্ন বাজানো হয়, যার মধ্যে ৮৭টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ৫৮৫টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়। বরিশালের রূপাতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নির্ধারিত স্থানটি হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ৪২৭টি হর্ন বাজাতে দেখা যায়, যার মধ্যে ২০৯টি হাইড্রালিক হর্ন এবং ২১৬টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়। সিলেটের রিকাবী বাজার এলাকায় নির্ধারিত স্থানটি হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ১১২১টি হর্ন বাজাতে দেখা যায়, যার মধ্যে ১০৮টি হাইড্রোলিক হর্র্ন এবং ১০১৩টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়। খুলনার গল্লামারী এলাকা হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে সবার শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ৮১৬টি হর্ন বাজানো হয়, যার মধ্যে ৫৬টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ৭৬০টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, একটা ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে, সারাদেশেই শব্দদূষণ বাড়ছে। পরিবেশের বিষয়গুলো উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকে। একারণে উন্নয়ন হলে পরিবেশের বিভিন্ন উদ্বেগও বাড়ে। আমরা সেগুলো কতটুকু ম্যানেজ করতে পারলাম এটাই বিষয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজ এটাই এগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। দেশের উন্নয়ন অবশ্যই হবে, এরসঙ্গে যে দূষণগুলো হবে সেগুলো আমরা কিভাবে ম্যানেজ করব। সবসময় আমরা এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তাও না। তবু এর চেষ্টাটা করে যাওয়া। ২০১৭ সালের জরিপের সময় আমরা বুঝতে পেরেছি দেশে শব্দদূষণ বাড়ছে। এখনও এটা আসলে বাড়ছে।

 

স্নায়ুরোগ চিকিৎসক ডা. মুহম্মদ শফিকুল হকের মতে, শব্দদূষণের কারণে হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, বুক ধড়ফড়, মাথাব্যথা, খিটখিটে মেজাজ, পেপটিক আলসার, অস্থিরতা, উৎকণ্ঠা, অমনোযোগী ভাব, ঘুমে ব্যাঘাত, শ্রবণশক্তি, স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, এমনকি মেয়েদের পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

 

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অধ্যাপক ডা. চৌধুরী ইয়াকুব জামাল বলেন, একটি নির্দিষ্ট ডেসিবলর ওপর শব্দ গেলে তা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এটা শিশুদের বিরক্তি বাড়িয়ে দেয়। তখন নির্দিষ্ট কোনও কাজে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। মনোসংযোগ চলে যাওয়াই স্বাভাবিক। একটা বয়স পরে এসব শিশুর কানে বধিরতা দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমাদের দেশে হাইড্রোলিক হর্ন সর্ম্পূণ নিষিদ্ধ। এটা তাহলে দেশে কিভাবে আসছে? এটার আমদানি বন্ধ করতে হবে। গাড়ির ফিটনেসের সময় প্রয়োজনে একটা ডিভাইস যুক্ত করে দেয়া হোক। যা ড্রাইভারের হর্নের তথ্য দ্রুত সার্ভারে পাঠাবে। যখন পরপর তিনবার একজন ড্রাইভার হর্ন বাজাবে। আর এরজন্য তার তিন হাজার টাকা জরিমানা হবে, সে আর কখনোই এই কাজ করবে না।

 

তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি যাচ্ছে, আমরা ধীরে ধীরে একটা বধির জাতিতে পরিণত হচ্ছি। এখন ছোট শিশুদের কানের সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এটা সম্পূর্ণ শব্দদূষণের কারণে হচ্ছে। মানসিক সমস্যা শিশুদের পাশাপাশি বড়দেরও দেখা যাচ্ছে। এই অবস্থা আমাদের অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে।

 

হর্ন প্রতিরোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রম :

পরিবেশ অধিদপ্তরের গত ফেব্রুয়ারি মাসের কার্যক্রমে দেখা যায়, তারা সারা দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছে। শব্দদূষণ প্রতিরোধে হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে এবং বিভিন্ন এলাকায় জরিমানা আদায় করেছে। এর মধ্যে গত ৪ ফেব্রুয়ারি পরিবেশ অধিদপ্তরের নীলফামারী জেলা কার্যালয় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মানমাত্রাতিরিক্ত হর্নে শব্দদূষণের দায়ে ৪টি যানবাহন থেকে মোট ৩ হাজার ৫শ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ৭টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে। ৫ ফেব্রুয়ারি গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ জেলা কার্যালয় ৭টি যানবাহন থেকে মোট ১৯ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। এসময় ১৩টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে।

৮ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনা, জামালপুর, বরিশাল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কার্যালয় ১৪টি যানবাহন থেকে ২৪ হাজার ৫শ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ১৩টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি পাবনা জেলা কার্যালয় শব্দদূষণের দায়ে ৩টি যানবাহন থেকে মোট ৩ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ৩টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে।

১৩ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল ও ঝিনাইদহ জেলা কার্যালয় ৬টি যানবাহন থেকে মোট ২০ হাজার টাকা জরিমানা ধার্যপূর্বক আদায় করেছে। পাশাপাশি ৮টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম ও খুলনা জেলা কার্যালয় ৬টি যানবাহন থেকে মোট ১১ হাজার ৫শ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ৮টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে।

১৫ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালী জেলা কার্যালয় ৫টি যানবাহন থেকে মোট ৩ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ৩টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়েছে।

১৮ ফেব্রুয়ারি ভোলা জেলা কার্যালয় ৭টি যানবাহন থেকে মোট ১ হাজার ৫শ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। ২০ ফেব্রুয়ারি খুলনা, পঞ্চগড় ও পাবনা জেলা কার্যালয় ৬টি যানবাহন থেকে মোট ২ হাজার ৭ শত টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ১১টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে। ২২ ফেব্রুয়ারি ১০টি যানবাহন থেকে মোট ১২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ১৪টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে।
২৫ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া জেলা কার্যালয় ১৬টি যানবাহন থেকে মোট ১৩ হাজার ৯শ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ৩৬টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়েছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনা জেলা কার্যালয় ৪টি যানবাহন থেকে মোট ৪ হাজার ৫শ টাকা জরিমানা ধার্যপূর্বক আদায়সহ ৮টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ফেনী জেলা কার্যালয় ২টি যানবাহন থেকে মোট ২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পাশাপাশি ৪টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়েছে।

 

শব্দদূষণ প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত আন্দোলনকারীরা বলছেন, বিদ্যমান আইন প্রয়োগের পাশাপাশি যানবাহন সংক্রান্ত শব্দ হ্রাসে সড়কের পাশে গাছ লাগিয়ে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা, শব্দের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে আনতে কার্যকরী উপায় বের করা, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে গবেষণা ও এর ফলাফল সেমিনার ও সম্মেলনের মাধ্যমে জনগণকে জানানো, জনসাধারণের মাঝে শব্দদূষণের ক্ষতি, প্রতিকার এবং বিদ্যমান আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে দেশ থেকে শব্দদূষণ চিরতরে দূর করা সম্ভব।