ঘন কুয়াশা আর হিমেল বাতাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলের জনজীবন। শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতায় হাড় কাঁপানো শীত অনুভূত হচ্ছে সর্বত্র। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে থাকছে পুরো অঞ্চল। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না সাধারণ মানুষ।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আজ বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সকালে রংপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা শৈত্যপ্রবাহের আওতায় পড়ে। হিমেল বাতাসের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কুয়াশা থাকায় শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশার ঘনত্ব এতটাই বেশি থাকে যে, কয়েক হাত দূরের কিছুই দেখা যায় না। আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, সকাল ১০টায় রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়—পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ১২ ডিগ্রি, ঠাকুরগাঁওয়ে ১২ দশমিক ৪ ডিগ্রি, নীলফামারীর সৈয়দপুরে ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি, রংপুরে ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি, ডিমলায় ১৩ ডিগ্রি, দিনাজপুরে ১২ দশমিক ১ ডিগ্রি, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ১২ দশমিক ২ ডিগ্রি, লালমনিরহাটে ১৩ ডিগ্রি এবং গাইবান্ধায় ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ঘন কুয়াশার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে যান চলাচল। মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে ধীরগতিতে চলাচল করছে যানবাহন। অনেক সময় দিনের বেলাতেও বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে দেখা যাচ্ছে। এতে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে গেছে।
শীতের প্রকোপে সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছে নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া শ্রমজীবীরা। সকালে কাজে বের হতে না পারায় অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। ইটভাটা, কৃষিক্ষেত, নির্মাণকাজসহ খোলা জায়গার কাজ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ছিন্নমূল মানুষ, বয়স্ক ও শিশুরা শীতের তীব্রতায় মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে শীতজনিত রোগীর চাপ। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, “শীতের তীব্রতায় শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল সমস্যা দেখা দিচ্ছে। হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে। চাপ সামাল দিতে আমরা বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছি। জরুরি সেবায় চিকিৎসক ও নার্সদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে।”
অন্যদিকে আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া আগামী মাসেও অব্যাহত থাকতে পারে। রাতের তাপমাত্রা আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে, ফলে শীতের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান বলেন, “এমন পরিস্থিতি জানুয়ারি মাসে আরও বাড়তে পারে। ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব এখনই কাটার সম্ভাবনা নেই। সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”
এমন অবস্থায় শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সচেতন মহল। ইতোমধ্যে কিছু সংগঠন শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম আরও জোরদারের দাবি জানানো হয়েছে।
ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে উত্তরাঞ্চলের জনজীবন এখন চরম দুর্ভোগের মুখে।
এমআর/সবা


























