০১:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পুলিশ সদস্যদের আজই কর্মস্থলে ফেরার নির্দেশ নতুন আইজিপির

  • ছাত্র-জনতা-পুলিশসহ প্রতিটি হত্যার তদন্তের প্রতিশ্রুতি
  • ডিএমপি কমিশনার-র‌্যাব ডিজিসহ শীর্ষপর্যায়ে রদবদল

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক অরাজকতা। প্রাণভয়ে পালিয়ে যান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ মাঠ পর্যায়ের সদস্যরা। পরিস্থিতি উত্তরণে দায়িত্ব গ্রহণ করে সেনাবাহিনী। এরপরই বন্ধ হয়ে যায় দেশের সব থানার সেবা কার্যক্রম। এমন পরিস্থিতিতে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধানের উদ্যোগে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ-র‌্যাবের শীর্ষপর্যায়ে ব্যাপক রদবদল করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে মো. ময়নুল ইসলাম, ডিএমপি কমিশনার হিসেবে মো. মাইনুল হাসান ও র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে একেএম শহিদুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর নবনিযুক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম বলেছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র, সাধারণ মানুষ ও পুলিশসহ প্রতিটি হত্যার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে। দায়িত্ব গ্রহণ শেষে গতকাল বুধবার বিকালে পুলিশ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। একই সঙ্গে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সারা দেশের সব পুলিশ সদস্যকে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার মধ্যে স্ব-স্ব পুলিশ লাইন্স, দপ্তর, পিওএম ও ব্যারাকে ফেরার নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের নবনিযুক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম।

নবনিযুক্ত আইজিপি মো. ময়নুল ইসলাম বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের যৌক্তিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশবাসীর প্রত্যাশা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। এ কারণে অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। অনেকেই স্ব-স্ব ইউনিটে নেই। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা নতুন করে সব শুরু করতে চাই। তাই সবাইকে আজ সন্ধ্যার মধ্যে স্ব-স্ব কর্মস্থলে ফেরার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। ছাত্র আন্দোলন দমনে অপারেশনাল ভুলত্রুটি থাকার কথা স্বীকার করে আইজিপি বলেন, ছাত্র-সাধারণ মানুষ, পুলিশসহ অনেকেই নিহত হয়েছেন। সবকিছুর জন্য আইজিপি হিসেবে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।
তিনি বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব মেট্রোপলিটন, জেলা, নৌ, রেলওয়ে ও হাইওয়ে থানার অফিসার ও ফোর্সকে স্ব-স্ব পুলিশ লাইন্সে যোগদানের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও জেলার পুলিশ সুপাররা স্ব-স্ব অধিক্ষেত্রের থানা এলাকায় জ্যেষ্ঠ নাগরিক, পেশাজীবী, ছাত্র প্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে নাগরিক নিরাপত্তা কমিটি গঠন করবেন। আমরা জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, বর্ণিত কমিটি থানা ও থানা এলাকার নিরাপত্তা বিধানে আপৎকালীন সহায়ক ভূমিকা রাখবে এবং পরবর্তীতে এর চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে। আমি পুলিশ বাহিনীর শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে সর্বস্তরের সহকর্মীকে সামাজিক মাধ্যমে কোনও প্রকার ব্যক্তিগত, সমিতি, ব্যাচ, অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে কোনো দাবি, মন্তব্য, প্রতিউত্তর প্রদানে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করছি। তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র, সাধারণ মানুষ, পুলিশসহ প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতি ফিরিয়ে আনতে আমরা সর্বাত্মকভাবে সচেষ্ট রয়েছি। বাংলাদেশ পুলিশ সর্বদা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করছে। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই রাষ্ট্রের মূল শক্তি। তাই, আমরা সবসময় জনগণের পাশে থেকে জনগণকে সর্বোচ্চ সেবা প্রদানে বদ্ধপরিকর। আপনাদের সুচিন্তিত মতামতকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি দক্ষ, জনবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক পেশাদার পুলিশ সংস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধে উজ্জীবিত হয়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা সবাই একযোগে কাজ করে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবো, ইনশাআল্লাহ।
নতুন আইজিপি বলেন, আমাদের কতিপয় উচ্চাভিলাষী, অপেশাদার কর্মকর্তার কারণে এবং কর্মকৌশল প্রণয়নে বলপ্রয়োগের স্বীকৃত নীতিমালা অনুসরণ না করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করা ও নেতৃত্বের ব্যর্থতায় আমাদের অনেক সহকর্মী আহত, নিহত এবং নিগৃহীত হয়েছেন। এই সন্ধিক্ষণে আমি সব পুলিশ সদস্যকে আন্তরিকভাবে আহ্বান জানাই, আপনারা দেশ ও জাতির প্রয়োজনে শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে আত্মনিয়োগ করুন। আপনাদের জীবনমানের উন্নয়ন এবং সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিতকরণে আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত একটি ঐতিহ্যবাহী পেশাদার ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। দেশের প্রয়োজনে যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে এই বাহিনী সবসময় সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। বর্তমান বৈষম্যবিরোধী যৌক্তিক আন্দোলনে আমাদের পূর্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দেশবাসীর প্রত্যাশা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এজন্য বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে আমি পুলিশপ্রধান হিসেবে আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমরা এখন হতে আমাদের উপর অর্পিত আইনি সব দায়িত্ব পালনে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।

এর আগে গতকাল বুধবার বিকালে পুলিশ সদরদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নবনিযুক্ত আইজিপি মো. ময়নুল ইসলাম বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র, সাধারণ মানুষ ও পুলিশসহ প্রতিটি হত্যার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতি ফিরিয়ে আনতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। বাংলাদেশ পুলিশ সর্বদা জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিরলসভাবে কাজ করছে।
নতুন আইজিপি কে এই ময়নুল ইসলাম : বাংলাদেশ পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মো. ময়নুল ইসলামকে। গত ৬ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ পুলিশ-১ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ নিয়োগ দেওয়া হয়।
গণআন্দোলনে ক্ষমতার পালাবদলের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন ভেঙে পড়েছে, তখন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে সরিয়ে পুলিশের শীর্ষ পদে এই পরিবর্তন আনা হয়। ৫৮ বছর বয়সি নতুন আইজিপি ময়নুল ইসলাম পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৯১ সালের ১ জানুয়ারি। এক সময় তিনি র‌্যাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আইজিপির দায়িত্ব পাওয়া ময়নুল ইসলামের স্বাভাবিক অবসরের বয়সে পৌঁছাতে বাকি আছে আর আট মাস। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা বেশ কয়েকজন অতিরিক্ত আইজিপিকে ডিঙিয়ে ট্রাফিক অ্যান্ড ড্রাইভিং স্কুলের কমান্ড্যান্ট ময়নুলকে পুলিশের নেতৃত্বে আনা হলেও সিভিল সার্ভিস ক্যাডারে জ্যেষ্ঠতার বিবেচনায় তিনি অনেকের চেয়ে এগিয়েই ছিলেন। ময়নুল ইসলাম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১২তম ব্যাচের কর্মকর্তা বলে জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ট্রাফিক অ্যান্ড ড্রাইভিং স্কুলের কমান্ড্যান্ট মো. ময়নুল ইসলামকে পুলিশ মহাপরিদর্শক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। এর আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়।
গত ৫ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে আইজিপি হিসেবে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আরও এক বছর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
ডিএমপির নতুন কমিশনার মাইনুল হাসান, র‌্যাব মহাপরিচালক শহিদুর রহমান : ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নতুন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. মাইনুল হাসান। একই সঙ্গে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন পুলিশ অধিদপ্তরে বদলির আদেশপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহিদুর রহমান। গতকাল বুধবার তাদের দু’জনকে এ নিয়োগ দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানকে পুলিশ অধিদপ্তরে অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই প্রজ্ঞাপনে পুলিশ অধিদপ্তরে বদলির আদেশপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহিদুর রহমানকে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। র‌্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্ব চালিয়ে আসা ব্যারিস্টার মো. হারুন-অর-রশিদকে পুলিশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক হিসেবে বদলি করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির দিন গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। অতিরিক্ত বল প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে পুলিশকে ব্যবহারের অভিযোগ উঠে। আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় অনেক শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ ও পুলিশ নিহত হন। সরকার পতনের দুই দিনের মধ্যে আইজিপি হিসেবে চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের নিয়োগ বাতিল করা হয়। এখন পুলিশের অন্যান্য বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও বদলি করা হচ্ছে।

পুলিশ সদস্যদের আজই কর্মস্থলে ফেরার নির্দেশ নতুন আইজিপির

আপডেট সময় : ০৭:৫৯:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৪
  • ছাত্র-জনতা-পুলিশসহ প্রতিটি হত্যার তদন্তের প্রতিশ্রুতি
  • ডিএমপি কমিশনার-র‌্যাব ডিজিসহ শীর্ষপর্যায়ে রদবদল

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক অরাজকতা। প্রাণভয়ে পালিয়ে যান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ মাঠ পর্যায়ের সদস্যরা। পরিস্থিতি উত্তরণে দায়িত্ব গ্রহণ করে সেনাবাহিনী। এরপরই বন্ধ হয়ে যায় দেশের সব থানার সেবা কার্যক্রম। এমন পরিস্থিতিতে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধানের উদ্যোগে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ-র‌্যাবের শীর্ষপর্যায়ে ব্যাপক রদবদল করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে মো. ময়নুল ইসলাম, ডিএমপি কমিশনার হিসেবে মো. মাইনুল হাসান ও র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে একেএম শহিদুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর নবনিযুক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম বলেছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র, সাধারণ মানুষ ও পুলিশসহ প্রতিটি হত্যার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে। দায়িত্ব গ্রহণ শেষে গতকাল বুধবার বিকালে পুলিশ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। একই সঙ্গে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সারা দেশের সব পুলিশ সদস্যকে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার মধ্যে স্ব-স্ব পুলিশ লাইন্স, দপ্তর, পিওএম ও ব্যারাকে ফেরার নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের নবনিযুক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম।

নবনিযুক্ত আইজিপি মো. ময়নুল ইসলাম বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের যৌক্তিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশবাসীর প্রত্যাশা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। এ কারণে অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। অনেকেই স্ব-স্ব ইউনিটে নেই। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা নতুন করে সব শুরু করতে চাই। তাই সবাইকে আজ সন্ধ্যার মধ্যে স্ব-স্ব কর্মস্থলে ফেরার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। ছাত্র আন্দোলন দমনে অপারেশনাল ভুলত্রুটি থাকার কথা স্বীকার করে আইজিপি বলেন, ছাত্র-সাধারণ মানুষ, পুলিশসহ অনেকেই নিহত হয়েছেন। সবকিছুর জন্য আইজিপি হিসেবে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।
তিনি বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব মেট্রোপলিটন, জেলা, নৌ, রেলওয়ে ও হাইওয়ে থানার অফিসার ও ফোর্সকে স্ব-স্ব পুলিশ লাইন্সে যোগদানের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও জেলার পুলিশ সুপাররা স্ব-স্ব অধিক্ষেত্রের থানা এলাকায় জ্যেষ্ঠ নাগরিক, পেশাজীবী, ছাত্র প্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে নাগরিক নিরাপত্তা কমিটি গঠন করবেন। আমরা জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, বর্ণিত কমিটি থানা ও থানা এলাকার নিরাপত্তা বিধানে আপৎকালীন সহায়ক ভূমিকা রাখবে এবং পরবর্তীতে এর চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে। আমি পুলিশ বাহিনীর শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে সর্বস্তরের সহকর্মীকে সামাজিক মাধ্যমে কোনও প্রকার ব্যক্তিগত, সমিতি, ব্যাচ, অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে কোনো দাবি, মন্তব্য, প্রতিউত্তর প্রদানে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করছি। তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র, সাধারণ মানুষ, পুলিশসহ প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতি ফিরিয়ে আনতে আমরা সর্বাত্মকভাবে সচেষ্ট রয়েছি। বাংলাদেশ পুলিশ সর্বদা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করছে। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই রাষ্ট্রের মূল শক্তি। তাই, আমরা সবসময় জনগণের পাশে থেকে জনগণকে সর্বোচ্চ সেবা প্রদানে বদ্ধপরিকর। আপনাদের সুচিন্তিত মতামতকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি দক্ষ, জনবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক পেশাদার পুলিশ সংস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধে উজ্জীবিত হয়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা সবাই একযোগে কাজ করে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবো, ইনশাআল্লাহ।
নতুন আইজিপি বলেন, আমাদের কতিপয় উচ্চাভিলাষী, অপেশাদার কর্মকর্তার কারণে এবং কর্মকৌশল প্রণয়নে বলপ্রয়োগের স্বীকৃত নীতিমালা অনুসরণ না করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করা ও নেতৃত্বের ব্যর্থতায় আমাদের অনেক সহকর্মী আহত, নিহত এবং নিগৃহীত হয়েছেন। এই সন্ধিক্ষণে আমি সব পুলিশ সদস্যকে আন্তরিকভাবে আহ্বান জানাই, আপনারা দেশ ও জাতির প্রয়োজনে শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে আত্মনিয়োগ করুন। আপনাদের জীবনমানের উন্নয়ন এবং সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিতকরণে আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত একটি ঐতিহ্যবাহী পেশাদার ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। দেশের প্রয়োজনে যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে এই বাহিনী সবসময় সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। বর্তমান বৈষম্যবিরোধী যৌক্তিক আন্দোলনে আমাদের পূর্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দেশবাসীর প্রত্যাশা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এজন্য বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে আমি পুলিশপ্রধান হিসেবে আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমরা এখন হতে আমাদের উপর অর্পিত আইনি সব দায়িত্ব পালনে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।

এর আগে গতকাল বুধবার বিকালে পুলিশ সদরদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নবনিযুক্ত আইজিপি মো. ময়নুল ইসলাম বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র, সাধারণ মানুষ ও পুলিশসহ প্রতিটি হত্যার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতি ফিরিয়ে আনতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। বাংলাদেশ পুলিশ সর্বদা জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিরলসভাবে কাজ করছে।
নতুন আইজিপি কে এই ময়নুল ইসলাম : বাংলাদেশ পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মো. ময়নুল ইসলামকে। গত ৬ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ পুলিশ-১ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ নিয়োগ দেওয়া হয়।
গণআন্দোলনে ক্ষমতার পালাবদলের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন ভেঙে পড়েছে, তখন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে সরিয়ে পুলিশের শীর্ষ পদে এই পরিবর্তন আনা হয়। ৫৮ বছর বয়সি নতুন আইজিপি ময়নুল ইসলাম পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৯১ সালের ১ জানুয়ারি। এক সময় তিনি র‌্যাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আইজিপির দায়িত্ব পাওয়া ময়নুল ইসলামের স্বাভাবিক অবসরের বয়সে পৌঁছাতে বাকি আছে আর আট মাস। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা বেশ কয়েকজন অতিরিক্ত আইজিপিকে ডিঙিয়ে ট্রাফিক অ্যান্ড ড্রাইভিং স্কুলের কমান্ড্যান্ট ময়নুলকে পুলিশের নেতৃত্বে আনা হলেও সিভিল সার্ভিস ক্যাডারে জ্যেষ্ঠতার বিবেচনায় তিনি অনেকের চেয়ে এগিয়েই ছিলেন। ময়নুল ইসলাম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১২তম ব্যাচের কর্মকর্তা বলে জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ট্রাফিক অ্যান্ড ড্রাইভিং স্কুলের কমান্ড্যান্ট মো. ময়নুল ইসলামকে পুলিশ মহাপরিদর্শক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। এর আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়।
গত ৫ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে আইজিপি হিসেবে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আরও এক বছর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
ডিএমপির নতুন কমিশনার মাইনুল হাসান, র‌্যাব মহাপরিচালক শহিদুর রহমান : ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নতুন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. মাইনুল হাসান। একই সঙ্গে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন পুলিশ অধিদপ্তরে বদলির আদেশপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহিদুর রহমান। গতকাল বুধবার তাদের দু’জনকে এ নিয়োগ দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানকে পুলিশ অধিদপ্তরে অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই প্রজ্ঞাপনে পুলিশ অধিদপ্তরে বদলির আদেশপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহিদুর রহমানকে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। র‌্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্ব চালিয়ে আসা ব্যারিস্টার মো. হারুন-অর-রশিদকে পুলিশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক হিসেবে বদলি করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির দিন গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। অতিরিক্ত বল প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে পুলিশকে ব্যবহারের অভিযোগ উঠে। আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় অনেক শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ ও পুলিশ নিহত হন। সরকার পতনের দুই দিনের মধ্যে আইজিপি হিসেবে চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের নিয়োগ বাতিল করা হয়। এখন পুলিশের অন্যান্য বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও বদলি করা হচ্ছে।