* বেড়েছে রিজার্ভ-প্রবাসী আয় * আগস্টের ৩০ দিনে এলো ৩৪ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা * বাড়ছে বেকারত্ব, কমছে কর্মসংস্থান

দেশে শিল্প-বিনিয়োগে ধীরগতি

সবুজ বাংলা রিপোর্ট
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

‘চ্যালেঞ্জটা সহজ হয়ে যায় যদি অর্থনীতি সম্প্রসারিত হয়। রেভেনিউ বেজটা যদি বৃদ্ধি পায়। ওটা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন হবে কাঠামোগত সংস্কার ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। এ ক্ষেত্রে সরকারকে সতর্কভাবে এগোতে হবে’
- ড. জাহিদ হোসেন, অর্থনীতিবিদ

 

ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয় বেড়েছে। রপ্তানিতেও এসেছে সাময়িক গতি। জুলাইয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ইঙ্গিত মিললেও বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্প উৎপাদনে এখনো কাক্সিক্ষত গতি ফেরেনি। ধীরগতিতে চলছে শিল্প ও বিনিয়োগ কার্যক্রম। তবে আমদানি বাড়ার প্রবণতা নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সময়ে বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। চলতি বছরের আগস্টের ৩০ দিনেই দেশে এসেছে ৩৪ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে সতর্কভাবে এগোতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিগত সরকারের ঋণের বোঝা, অর্থনৈতিক মন্দাসহ ভঙুর অবকাঠামোর মধ্যেই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে বিএনপি সরকার। পর্যায়ক্রমে সবখাতই ঘুরে দাঁড়াবে। 
জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণঅভুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলের পতন ঘটে। এরপর ওই বছরের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ঋণ পরিশোধের চাপ আর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের চাপে চরম অস্থিরতার মধ্যে পড়ে ইউনূস সরকার। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চালানো হয় কূটনৈতিক তৎপরতা। একবছর পর দেশের অর্থনীতিতে কিছু স্বস্তি ফিরলেও শঙ্কা নিয়েই এগোতে থাকে বাংলাদেশ। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর চাপে দেড় বছরের মাথায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্টতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। দুই দশক পর ক্ষমতায় এসে অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেয় বিএনপি। বাড়তি বিনিয়োগ টেনে নতুন কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি বন্ধ ও লোকসানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থনীতির মূলধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। 

সংশ্লিষ্টরা জানায়, সরকারের প্রথম ছয় মাসে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি মিললেও বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রে সেই গতি দেখা যায়নি। উৎপাদন ও রপ্তানিতে গতি থাকার মধ্যেই চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট অর্থনীতির জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও অর্থনীতির অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক আমদানিতে গতি এসেছে। তবে নতুন কারখানা স্থাপন, মূলধনী যন্ত্রপাতি কিংবা শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে কাক্সিক্ষত গতি দেখা যায়নি। গত বছরের জুলাইয়ে যেখানে বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশের ঘরে, এক বছরের ব্যবধানে তা নেমেছে অর্ধেকেরও নিচে। বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধির এই গতি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

এদিকে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে। এ সময়ে রেমিট্যান্স বাড়লেও ডলারের বাজারে পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। গত ছয় মাসে নতুন বড় শিল্পকারখানা খুব একটা চালু হয়নি। বরং উৎপাদন বন্ধ হওয়া কিংবা শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা নিয়মিত ঘটেছে। একই সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে নির্মাণ খাত। ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর যে প্রত্যাশা ছিল, সেখানে এখনো কাক্সিক্ষত গতি ফেরেনি।

সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ছয় মাসকে বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা অর্জনের সময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানিতে সাময়িক গতি অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি এনেছে। তবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্প উৎপাদনে এখনো ধীরগতি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পরবর্তী ধাপে বৈদেশিক খাতে অর্জিত স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে গতি ফেরানোই হবে বড় ধাপ। 

এদিকে গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি আগস্টের প্রথম ৩০ দিনে দেশে ২৮৩ কোটি বা ২ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩৪ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি আগস্টের প্রথম দিন থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮৩ কোটি ডলার। যেখানে গত বছরের একই সময়ে দেশে ২২২ কোটি ৯০ লাখ ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। এই হিসাবে বছর ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ২০ দশমিক ৯ শতাংশ। এদিকে চলতি আগস্টের প্রথম ২৯ দিনেও ৮টি ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি। এই ব্যাংকগুলো হলো- রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি (বিডিবিএল), বিশেষায়িত খাতের রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বেসরকারি খাতের আইসিবি ইসলামী ব্যাংক ও পদ্মা ব্যাংক পিএলসি, বিদেশি খাতের ব্যাংক আল ফালাহ, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এক্সিস্টিং বিনিয়োগকারীরাই তাদের বিনিয়োগ সীমিত করে দিচ্ছেন। নতুন বিনিয়োগকারীরা তাদের সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিবে। এলএনজি দিয়ে একটা ফিক্সড করার চিন্তা। বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে আনার চিন্তা, এটা সরকারকে আরও বেশি ঋণগ্রস্ত করবে এবং এখান থেকে তার ফিরে আসা কঠিন হবে।

তবে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, চ্যালেঞ্জটা সহজ হয়ে যায় যদি অর্থনীতি সম্প্রসারিত হয়। রেভেনিউ বেজটা যদি বৃদ্ধি পায়। ওটা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন হবে কাঠামোগত সংস্কার। দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে সতর্কভাবে এগোতে হবে।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL