* রায়ে সন্তোষ জানালেন বাদী, দ্রুত ফাঁসি কার্যকরের দাবি

মাগুরায় শিশু আছিয়া ধর্ষণ-হত্যায় হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল

নিজস্ব প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

মাগুরার বহুল আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। সোমবার (৩১ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। এর আগে, রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৫ আগস্ট রায়ের দিন পিছিয়ে নতুন করে গতকাল দিন ধার্য করা হয়েছিল। এদিকে, হাইকোর্টের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহত শিশু আছিয়ার মা ও মামলার বাদী আয়েশা আক্তার। তবে আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুততম সময়ে হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন তিনি। এ মামলায় আদালতে আসামিপক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হাফিজুর রহমান খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হাসান তারেক। তার সঙ্গে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল রোহানী সিদ্দীকা ও মাহবুবা তাসনিম আঁখি।

হাইকোর্টের রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, হিটু শেখ তার ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা, ব্যর্থ হয়ে ব্লেড দিয়ে তার স্পর্শকাতর স্থান কাটার চেষ্টা, পরে মুখ ও গলা চেপে ধরা এবং ওড়না দিয়ে গলা চেপে ধরার কথা তিনি জবানবন্দিতে বলেছেন। শিশুটি অবচেতন হয়ে যাওয়ার পরও হিটু শেখ তার ওপর যৌন নির্যাতনের চেষ্টা চালিয়ে যান। তার পরিহিত লুঙ্গিতে বীর্য পাওয়া যায় এবং ডিএনএ পরীক্ষায় তার সঙ্গে  সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, হিটু শেখ নিজেও ঘটনার পর পালিয়ে পাশের একটি ক্ষেতে গিয়ে লুকিয়েছিলেন। পরে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। তার ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

পুলিশ কাস্টডিতে থাকা অবস্থায় জবানবন্দি নেওয়ার কারণে এর সাক্ষ্যগত মূল্য নেই বলে আসামিপক্ষ যে যুক্তি দিয়েছিল, সে বিষয়ে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হলে হিটু শেখ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার সময় বিষয়টি উল্লেখ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি এমন কোনো অভিযোগ না করায় আদালত তার জবানবন্দিকে স্বেচ্ছায় দেওয়া ও সত্য বলে গ্রহণ করেছে।

এর আগে, গত ১১ আগস্ট মাগুরার বহুল আলোচিত আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) আবেদন ও আসামির আপিল শুনানি শুরু হয়েছিল।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, রমজানের ছুটিতে শহরের নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে গত বছরের ৫ মার্চ রাতে ধর্ষণের শিকার হয় শিশু আছিয়া। শিশুটির বোনের শ্বশুর হিটু শেখ তাকে ধর্ষণের পর হত্যারও চেষ্টা করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আট বছর বয়সী আছিয়ার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় শিশুটির মা বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। ২৭ এপ্রিল থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ২৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে শেষ হয় মামলার বিচারিক কার্যক্রম। গত বছরের ৭ মে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এরপর ১৩ মে মামলার শেষ দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন উভয়পক্ষের আইনজীবীরা। পরে ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান রায় ঘোষণা করেন। রায়ে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখকে (৪৭) মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। মামলার অপর তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। তারা হলেন- শিশুটির বোনের স্বামী সজীব শেখ (১৯), সজীব শেখের ছোট ভাই (১৭) ও সজীবের মা জাহেদা বেগম (৪০)। 

আইন অনুযায়ী, বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে তা কার্যকর করার আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন। এ জন্য মামলার যাবতীয় নথি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠাতে হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২১ মে এ মামলার নথি উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়। পরে নথিপত্র যাচাই-বাছাই শেষে পেপারবুক তৈরির জন্য বিজি প্রেসে পাঠানো হয়। পেপারবুক প্রস্তুত হওয়ার পর গত ৮ জুন তা হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরপর শুনানির জন্য মামলাটি বিশেষায়িত হাইকোর্ট বেঞ্চের কার্যতালিকায় আসে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) হাইকোর্টে আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণার পর নিহত আছিয়ার মা ও মামলার বাদী আয়েশা আক্তার জানান, হাইকোর্টে হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখায় তিনি খুশি। তবে দ্রুত এ রায় কার্যকর দেখতে চান তিনি। বলেন, আমার মেয়ের হত্যার ন্যায়বিচার পেয়েছি। এখন আমি চাই, দ্রুত ফাঁসির এই রায় কার্যকর করা হোক।

এদিকে হাইকোর্টের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আছিয়ার স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারাও। তাদের প্রত্যাশা, সব আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। এতে শিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হবে বলে মনে করছেন তারা। পরিবার ও স্বজনদের প্রত্যাশা, হাইকোর্টের রায়ের পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে অচিরেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে এবং দেশবাসী শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের একটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে।

উল্লেখ্য, শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি মাগুরায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। মামলার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন সময় স্থানীয়ভাবে প্রতিবাদ ও কর্মসূচি পালন করা হয়। হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকায় দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলো। এখন দণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় আছিয়ার পরিবার ও স্বজনরা।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL