এবার বিমানবাহী রণতরী থেকে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টায় মার্কিন সেনারা

ডেস্ক রিপোর্ট
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে রেকর্ড সময় সাগরে অবস্থান করছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’। জাহাজে অবস্থানরত ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন সেনার মধ্যে তীব্র মানসিক স্বাস্থ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাদের পরিবার ও মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যরা। খবর: গার্ডিয়ান।

সামরিক খাতের শীর্ষস্থানীয় দুই সংবাদপত্র ‘নেভি টাইমস’ এবং ‘স্টার্স অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধজাহাজটিতে চরম প্রতিকূল পরিবেশ ও মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে কয়েকজন নাবিক সমুদ্রের পানিতে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন। প্রায় ৯ মাস ধরে সাগরে অবস্থানরত জাহাজটির ক্রুরা টানা ২৫০ দিন তীরের দেখা পাননি।

‘স্টার্স অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সান দিয়েগোতে নৌবাহিনীরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক আবেগঘন মতবিনিময় সভায় পরিবারগুলো তাদের উদ্বেগের কথা জানান। ২০০ জন স্বজনের উপস্থিতিতে আয়োজিত ওই সভায় এক স্ত্রী জানান, তার স্বামী ওই দিনই তাকে মেসেজে লিখেছেন- তিনি আশা করছেন যেন আগামীকাল তার আর ঘুম না ভাঙে।

ভারপ্রাপ্ত নৌসচিব হাং কাওসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সামনেই পরিবারের সদস্যরা তাদের ক্ষোভ উগরে দেন। উপস্থিত এক নারী কাওকে সরাসরি বলেন, নৌবাহিনী আমাদের ও নেতৃত্বের মধ্যকার সেই বিশ্বাসের জায়গাটি ভেঙে ফেলেছে।

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে কয়েকজন মার্কিন সেনার আত্মহত্যার চেষ্টার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে ‘নেভি টাইমস’। এ্যানাবেল লোমা নামে এক নারী পত্রিকাটিকে জানান, সাগরে অবস্থানের মেয়াদ বারবার বাড়ানোয় মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে তার স্বামী পানিতে লাফ দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

তিনি বলেন, সে খুব আতঙ্কের মধ্যে আছে। সে ভাবছে তাকে হয়তো চাকরিচ্যুত (ডিজঅনারেবল ডিসচার্জ) করা হবে। শুধু চরম শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির কারণে তার ১৩ বছরের ক্যারিয়ার চোখের পলকে ধ্বংস হয়ে গেল। পত্রিকাটিতে অন্য এক নাবিকের স্ত্রীর মন্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি জানান, তার স্বামী জাহাজে এক সহকর্মীকে পানিতে লাফ দেয়া থেকে ঠেকিয়ে প্রাণ বাঁচান।

ইরানের বিরুদ্ধে পঞ্চম মাসের মতো যুদ্ধ অভিযানে থাকা এই রণতরীর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য মাইক লেভিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ক্রুদের দুর্দশা বর্ণনা করে তিনি লেখেন, ছাতা ধরা গোসলখানা, নষ্ট টয়লেট, সপ্তাহের পর সপ্তাহ বন্ধ থাকা লন্ড্রি ব্যবস্থা, দিনের পর দিন গরম পানির অভাব, আর খাবারের নামে জোটে কেবল আধা কাপ ভাত আর দুটি রুটি। নেই কোনো সাবান, ডিওডোরেন্ট বা টুথপেস্ট।

আফগানিস্তান ও ইরাকে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক আর্মি রেঞ্জার এবং কলোরাডোর ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রো সতর্ক করে বলেছেন, লিংকনে থাকা সামরিক সদস্য ও তাদের পরিবারের ওপর মানসিক চাপ ‘সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে বেড়েই চলেছে’।

চলতি বছরের এপ্রিলে যুদ্ধজাহাজটির করুণ অবস্থা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। নিুমানের ও অপ্রতুল খাবার, পানির তীব্র সংকট, গোসলখানায় ছাতা পড়ে যাওয়া এবং কাপড় ধোয়ার যন্ত্র বিকল হয়ে পড়ার খবর ও ছবি ছড়িয়ে পড়ে।

তবে এসব অভিযোগকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তার বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়ে চলতি সপ্তাহে লেভিন বলেন, এই নারী-পুরুষেরা দেশের সেবা করতেই সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। দেশ হিসেবে তাদের ন্যূনতম প্রাপ্য, একটু গরম পানি, একটি সচল টয়লেট আর এক বেলা ভালো খাবার। হেগসেথ এটুকুর সংস্থানও করতে পারছেন না, অথচ তাদের পরিবারগুলোর চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যাবাদী বলতে তার বাঁধছে না।

সেনাদের পানিতে লাফিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টার বিষয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিল ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘমেয়াদী মোতায়েনের ফলে আমাদের সামরিক সদস্য ও তাদের পরিবারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। সে বিষয়ে আমরা অবগত। তাদের এই সহনশীলতা ও ত্যাগের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।’

প্রসঙ্গত, ইরান যুদ্ধের কারণে গত ফেব্রুয়ারি থেকেই মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের সামুদ্রিক অঞ্চলে অবস্থান করছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। জাহাজটি এখন ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ কার্যকরে ভূমিকা রাখছে। এর আগে এই বিমানবাহী রণতরীতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ৭ মার্কিন সেনা নিহতের খবর জানিয়েছিল ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি। যদিও এ বিষয়ে মার্কিন বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
 

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত