দীর্ঘ আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে মতপার্থক্য কাটিয়ে যৌথ বিবৃতির খসড়ায় ঐকমত্যে পৌঁছেছে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো। এর মধ্য দিয়ে নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র গ্রহণের পথ তৈরি হয়েছে, যা ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
আজ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেন, ব্রিকসের নয়াদিল্লি ঘোষণা গৃহীত হয়েছে।
মোদি বলেন, ‘আজকের আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে বিশ্ব বদলে যাচ্ছে এবং আমাদের পুরোনো পদ্ধতির দ্বারা প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়।’
এ সময় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় মোদিকে ছবি তুলতে দেখা যায়।
তিনি বলেন, ‘প্রতিনিধিত্ব, সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা এবং নিয়ম প্রণয়ন—তিনটিই প্রয়োজন। আমরা এ বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছি যে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি এবং এসব প্রযুক্তির জন্য নিয়ম প্রণয়নে গ্লোবাল সাউথের অংশগ্রহণও সমান হওয়া উচিত। সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার বাস্তব ফলাফলের মধ্যকার দূরত্ব কমাতে অংশীদারত্ব ও সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
মোদি আরও বলেন, ‘আজ নয়াদিল্লি ঘোষণা আমাদের সব সিদ্ধান্তের জন্য একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এখন এসব সিদ্ধান্তকে কার্যকর ফলাফলে রূপ দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।’
সমাপনী বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ‘সেতুবন্ধন তৈরিতে আপনাদের মূল্যবান অবদান, গঠনমূলক মনোভাব এবং দক্ষতার জন্য আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। এর মধ্য দিয়ে আমি আজকের অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করছি।’
ইরান যুদ্ধ নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দূর করতে ভারত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ায় বৈঠকের আলোচনা আজ ভোররাত পর্যন্ত গড়ায়। সংঘাত নিয়ে ঘোষণার ভাষা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য ছিল বিশেষভাবে তীব্র।
ব্রিকসের সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে এ বিষয়ে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য দেখা দেয়। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরে উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশে ইরানের পাল্টা হামলার মধ্য দিয়ে আরও বিস্তৃত হয়। যুদ্ধের এ পর্যায়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিন্ন অবস্থান নেয়।
এদিকে নয়াদিল্লি সম্মেলন ঘিরে একটি ছবিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ছবিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের হাত ধরে থাকতে দেখা যায়। তাঁদের পাশে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাকে হাঁটতে দেখা যায়।
‘দ্য ওয়্যার’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ মোকাবিলায় ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছেন মোদি। কংগ্রেস নেতারা ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য তাঁর সরকারের সমালোচনা করেছেন।
নয়াদিল্লিতে ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনের আগে ইরান যুদ্ধের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কারণ, এর আগে অনুষ্ঠিত প্রতিটি ব্রিকস সম্মেলনই একটি যৌথ ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।
ইরান ইস্যুতে মতপার্থক্যের কারণে মে মাসে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। এর পরিবর্তে ভারত ‘চেয়ারম্যানের বিবৃতি’ প্রকাশ করে। ওই বৈঠকে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিদের মধ্যেও তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়েছিল।
ব্রিকসের বাণিজ্যমন্ত্রী ও যোগাযোগমন্ত্রীদের বৈঠকেও এই মতপার্থক্যের প্রভাব দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিশেষ দূতদের বৈঠকেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং সেখানেও যৌথ ঘোষণার পরিবর্তে চেয়ারম্যানের বিবৃতি দেওয়া হয়েছিল।