সবুজ বাংলা অনুসন্ধান

অবৈধভাবে চলছে ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার

সবুজ বাংলা রিপোর্ট
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
  • ১৩৬টি  প্রতিষ্ঠানের নেই অনুমোদন
  •  অপচিকিৎসায় ঘটছে প্রাণহানি, বাড়ছে রোগীর সংখ্যা

“মানুষের স্বাস্থ্যসেবা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। লাইসেন্সের নবায়ন ছাড়া যেসব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টার চালু রয়েছে, তাতে অপচিকিৎসায় মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। এর লাগাম টেনে ধরতে তদারকির বিকল্প কিছুই নেই”
— মো. মাহবুবুল আলম সেলিম, সম্পাদক, সুজন, চুয়াডাঙ্গা জেলা কমিটি

“সাধারণ মানুষের নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র, চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যব¯’াপনা এবং সংশ্লিষ্ট সব নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি”
— অধ্যাপক ডা. মাসুদা খাতুন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, 


সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কঠোর নির্দেশনার পরও দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গড়ে ওঠা স্বা¯’্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদন ও লাইসেন্স নবায়ন ছাড়ায় পরিচালনা করা হ”েছ। বিশেষ করে চুয়াডাঙ্গা জেলায় স্বা¯’্য বিভাগের অনুমোদন ও লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই চলছে ১৩৬টি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। জেলার চার উপজেলায় অনলাইনে নিবন্ধিত ১৮৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রায় তিন বছর ধরে নবায়ন করা হয়নি। এরপরও অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে চিকিৎসাসেবা ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রম চালিয়ে যা”েছ। এসব ক্লিনিকের অপচিকিৎসায় প্রাণহানি ঘটছে প্রতিনিয়ত। আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ভুলভাল রিপোর্টে রোগীরা পড়ছেন বিপাকে। অথচ বিষয়গুলো দেখার যেন কেউ নেই। জেলা কমিটির সুজন সম্পাদক বলছেন, মানুষের স্বা¯’্যসেবা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। লাইসেন্সের নবায়ন ছাড়া যেসব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালু রয়েছে, তাতে অপচিকিৎসায় মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। এর লাগাম টেনে ধরতে তদারকির বিকল্প কিছুই নেই। জনস্বা¯’্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষের নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র, চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যব¯’াপনা এবং সংশ্লিষ্ট সব নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। তবে জেলা সিভিল সার্জন বলছে,  
লাইসেন্স নবায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেয়া হয়েছিল। সময়সীমা পার হওয়ার পর নিয়ম না মানা বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালনা করা হ”েছ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে নিয়ম না মানা কিছু প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দেয়া হ”েছ। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ¯’ানীয়দের প্রশ্ন, প্রায় তিন বছর ধরে যেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন হয়নি, সেগুলো কীভাবে নিয়মিতভাবে রোগী দেখা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রম চালিয়ে যা”েছ। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত আগস্টে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিষয়ে সিভিল সার্জনের কাছে জানতে চান। তখন আগস্ট মাস পর্যন্ত সময় দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। কিš‘ আগস্ট পেরিয়ে সেপ্টেম্বরেও বহু লাইসেন্স নবায়নহীন প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
¯’ানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় স্বা¯’্য বিভাগ ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয়া হলেও পরে সেগুলো আবারও কার্যক্রম শুরু করে। ফলে অভিযান ও বন্ধের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, শুধু সাময়িক অভিযান নয়, লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ¯’ায়ী ও কঠোর ব্যব¯’া নিতে হবে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় অনলাইনে নিবন্ধিত বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত মোট ১৮৪টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছিল। এর মধ্যে বর্তমানে ১৩৬টিরই গত প্রায় তিন বছর ধরে লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদরে ১৭টি, আলমডাঙ্গায় ১০টি, দামুড়হুদায় ৬টি এবং জীবননগরে ১০টি প্রাইভেট ক্লিনিক। অন্যদিকে, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদরে ৩৯টি, আলমডাঙ্গায় ২১টি, দামুড়হুদায় ১৫টি এবং জীবননগরে ১৮টির লাইসেন্স নবায়নহীন অব¯’ায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকা, চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যব¯’াপনায় অনিয়ম, নির্ধারিত নীতিমালা না মানাসহ নানা কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন আটকে আছে। এর মধ্যেই নতুন লাইসেন্স পাওয়ার জন্য আরও চারটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কমিটির সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক মোঃ মাহবুবুল আলম সেলিম বলেন, মানুষের স্বা¯’্যসেবা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। লাইসেন্সের নবায়ন ছাড়া যেসব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক সেন্টার চালু রয়েছে, তাতে অপচিকিৎসায় মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে। এর লাগাম টেনে ধরতে তদারকির বিকল্প কিছুই নেই।
স্বা¯’্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযান ও আইনগত ব্যব¯’া নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে সাধারণ মানুষের নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র, চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যব¯’াপনা এবং সংশি¬ষ্ট সব নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে স্বা¯’্য বিভাগের এই কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ¯’ানীয় সুশীল সমাজ ও চিকিৎসকদের অনেকে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম চালালেও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হ”েছ না। ফলে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনিয়ম, ভুল চিকিৎসা কিংবা ভুল পরীক্ষার রিপোর্টের ঝুঁকিতে পড়ছেন।
চুয়াডাঙ্গা পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যেও উঠে এসেছে একই ধরনের চিত্র। সং¯’াটির কাছে জেলার ১৬২টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩৭টি প্রতিষ্ঠানকে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। আরও ছয়টি আবেদনের ফাইল প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বাকি ১১৯টি প্রতিষ্ঠান এখনও ছাড়পত্র পাওয়ার যোগ্য হয়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর ফাইলে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার নোটিশ দেয়া রয়েছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানকে চিকিৎসা-বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় ব্যব¯’া নেয়ার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। কিš‘ অনেক প্রতিষ্ঠানই এখনও নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেনি।
চুয়াডাঙ্গা পরিবেশ অধিদপ্তর জেলা কার্যালয়ের সিনিয়র কেমিস্ট নরেশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, জেলায় তাদের তালিকাভুক্ত ১৬২টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে এ পর্যন্ত ৩৭টিকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। উদ্যোক্তারা সময়মতো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেয়ায় অনেক আবেদন যথাসময়ে প্রক্রিয়াকরণ করা সম্ভব হ”েছ না বলেও জানান তিনি। চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যব¯’াপনা প্রসঙ্গে নরেশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যব¯’াপনা বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত অনেক প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে পরিপালন করছে না। ফলে তাদের পরিবেশগত ছাড়পত্র দেয়া সম্ভব হ”েছ না। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করছে, তাদের নিয়ম অনুযায়ী ছাড়পত্র দেয়া হ”েছ।
এদিকে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দীন আহমেদ বলেন, জেলায় বর্তমানে অনলাইনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্লিনিকের সংখ্যা ৬৪টি এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ১২০টি। পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, লাইসেন্স নবায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেয়া হয়েছিল। সময়সীমা পার হওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান পরিচালনা করা হ”েছ। ইতোমধ্যে আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা সদর ও জীবননগর উপজেলায় অভিযান চলছে। নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যব¯’া নেয়া হবে।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL