চব্বিশ ঘণ্টার স্পোর্টস টেলিভিশনের ধারণা দিয়ে ক্রীড়া সম্প্রচারের চেহারা বদলে দেওয়া ইএসপিএনের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল রাসমুসেন আর নেই; তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর।
পারকিনসন ডিজিজে আক্রান্ত রাসমুসেন মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিজের বাড়িতে মারা যান বলে ইএসপিএন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
২০১৯ সালে রাসমুসেন প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, ২০১৪ সালে তার পারকিনসন রোগ ধরা পড়ে।
তার মৃত্যুর খবর দিয়ে ইএসপিএন চেয়ারম্যান জিমি পিটারো তাকে ‘দূরদর্শী একজন উদ্ভাবক’ হিসেবে স্মরণ করেছেন।
তার ভাষায়, ইএসপিএনের সংস্কৃতিতে তার উদ্ভাবনী চিন্তা, পরিশ্রম ও উদ্যোক্তা মানসিকতার প্রভাব এখনো রয়েছে।
রাসমুসেনের ক্রীড়া টেলিভিশন তৈরির ভাবনার শুরু ১৯৭৮ সালে। ওয়ার্ল্ড হকি অ্যাসোসিয়েশনের (ডব্লিউএইচএ) দল নিউ ইংল্যান্ড হোয়েলার্সের জনসংযোগ কর্মকর্তার চাকরিটা সবে হারিয়েছেন।
ওই বছর অগাস্টে এক শুক্রবার বিকেলে কানেটিকাটের ইন্টারস্টেট-৮৪ মহাসড়কে যানজটে আটকে ছিলেন রাসমুসেন ও তার ছেলে স্কট। কেবল টিভিতে সার্বক্ষণিক খেলা সম্প্রচারের এক অভিনব ধারণা নিয়ে তাদের আলোচনা চলছিল।
তাদের কাছে তখন আরসিএর কাছ থেকে নেওয়া একটি স্যাটেলাইট ট্রান্সপন্ডার ছিল। সেটি দিয়ে কী ধরনের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা যায়, তা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই রাসমুসেন হঠাৎ শুধু খেলাধুলা নিয়ে একটি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক তৈরির প্রস্তাব দেন।
শুরুতে তাদের পরিকল্পনা ছিল কানেটিকাটের খেলাধুলার খবর ও অনুষ্ঠান ওই অঙ্গরাজ্যের দর্শকদের দেখানো। কিন্তু অঙ্গরাজ্যের অনেক কেবল অপারেটর তাতে আগ্রহ দেখাননি।
কিন্তু পরে সেটি জাতীয় পর্যায়ের ২৪ ঘণ্টার ক্রীড়া নেটওয়ার্কের পরিকল্পনায় রূপ নেয়। মাত্র ৯ হাজার ডলারের ক্রেডিট কার্ড ঋণ নিয়েও বাবা-ছেলে সেই উদ্যোগ এগিয়ে নেন।
অনেকেই সে সময় বলেছিলেন, ২৪ ঘণ্টা চালানোর মতো এত খেলাধুলা পৃথিবীতে নেই। কিন্তু বিল রাসমুসেন বিশ্বাস করতেন, অন্যরা ভুল ভাবছেন।
গেটি অয়েলের পৃষ্ঠপোষকতা, ন্যাশনাল কলেজিয়েট অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে অনুষ্ঠান সম্প্রচারের চুক্তি এবং অ্যানহয়জার-বুশের সঙ্গে বিজ্ঞাপন চুক্তি পাওয়ার পর প্রকল্পটি বাস্তব রূপ পায়।
১৯৭৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ লাখ বাড়িতে সম্প্রচার শুরু করে নতুন নেটওয়ার্কটি। প্রথম দিনেই সম্প্রচারিত হয় ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম 'স্পোর্টসসেন্টার', যা আজও ক্রীড়া সংবাদের এক অনন্য মাপকাঠি।
তখন এ নেটওয়ার্কের নাম ছিল ‘এন্টারটেইনমেন্ট অ্যান্ড স্পোর্টস প্রোগ্রামিং নেটওয়ার্ক’; ১৯৮৪ সালে নাম সংক্ষিপ্ত করে ইএসপিএন করা হয়।
ইএসপিএনের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রাসমুসেন নেটওয়ার্কটির শুরুর সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার নেতৃত্বে চব্বিশ ঘণ্টার ক্রীড়া সম্প্রচারের পাশাপাশি ১৯৮০ সালে এনসিসিএ পুরুষ বাস্কেটবল টুর্নামেন্টের প্রাথমিক পর্বের সম্প্রচার শুরু করে ইএসপিএন। ওই সম্প্রচার দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
তবে প্রতিষ্ঠার পর ইএসপিএনে রাসমুসেনের ভূমিকা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৮০ সালের অক্টোবরে তিনি নেটওয়ার্কটির সক্রিয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।
কারো কারো ধারণা, ইএসপিএনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিক গেটি অয়েল তখন রাসমুসেন ও তার ছেলে স্কটকে নেটওয়ার্ক থেকে সরিয়ে দেয়। সে সময় গেটির হাতে ছিল ইএসপিএনের ৮৫ শতাংশ মালিকানা।
রাসমুসেনের মৃত্যুর পর ইএসপিএনের সাবেক উপস্থাপক জর্জ গ্রান্ডে বলেন, নেটওয়ার্কটি কতদিন টিকবে, তা তারা জানতেন না। কিন্তু তারা বুঝেছিলেন, তাদের উদ্যোগটি বিশেষ কিছু।
ইএসপিএনের আরেক প্রবীণ উপস্থাপক ক্রিস বারম্যান রাসমুসেনকে ‘আমাদের জর্জ ওয়াশিংটন’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, রাসমুসেন ছিলেন অত্যন্ত আশাবাদী মানুষ এবং তার উত্তরাধিকার নিয়ে ক্রীড়াপ্রেমীরা ‘গর্ব’ করতে পারেন।
কানেটিকাটের ব্রিস্টলে অল্প পরিসরে শুরু হওয়া ইএসপিএন এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৯ সালে যাত্রার সময় যেখানে কর্মী ছিল প্রায় ৮০ জন, সেখানে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা ৫ হাজার ৯০০।
যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক টেলিভিশন নেটওয়ার্কের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ক্রীড়া অ্যাপ, সরাসরি গ্রাহকভিত্তিক স্ট্রিমিং সেবা, অডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কনটেন্টও রয়েছে তাদের।
ইএসপিএন থেকে সরে যাওয়ার পরও ক্রীড়া ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রাসমুসেন। তিনি বিভিন্ন ক্রীড়া সম্প্রচারস্বত্বের মালিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন এবং নিজেও বিভিন্ন ক্রীড়া-সম্পর্কিত উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন।
২০১৯ সালে পারকিনসন রোগের কথা প্রকাশ্যে জানানোর পর তিনি রোগীদের জন্য কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের দূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তার দীর্ঘ কর্মজীবনে আরও নানা স্বীকৃতি এসেছে। ২০২৫ সালে তিনি স্পোর্টস ব্রডকাস্টিং হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত হন। এর আগে রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয় ও ডিপাও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক তালিকায়ও তার নাম যুক্ত হয়।
১৯৯৪ সালে স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড তাকে ২০ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ক্রীড়াঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা ব্যক্তিদের তালিকায় স্থান দেয়। একই বছর ইউএসএ টুডে তাকে ‘দ্য ফাদার অব স্পোর্টস টেলিভিশন’ হিসেবে বর্ণনা করে।
রাসমুসেন ১৯৩২ সালের ১৫ অক্টোবর শিকাগোতে জন্মগ্রহণ করেন। ইন্ডিয়ানার ডিপাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীতে কাজ করেন এবং পরে রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেন।
বিজ্ঞাপন ব্যবসায় কাজের পর ১৯৬২ সালে রেডিওতে তার গণমাধ্যম ক্যারিয়ার শুরু হয়। পরে টেলিভিশনে ক্রীড়া ও সংবাদ বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ওয়ার্ল্ড হকি অ্যাসোসিয়েশনের নিউ ইংল্যান্ড হোয়েলার্সে জনসংযোগ পরিচালক হিসেবে যোগ দেন।
ইএসপিএনের সঙ্গে তার সম্পর্ক অবশ্য একসময় দূরত্বে গড়ায়। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানানোর মধ্য দিয়ে সেই দূরত্ব কমতে শুরু করে।
এরপর প্রতিষ্ঠানটি তাকে তার অবদানের জন্য নিয়মিত সম্মান জানায়। ২০১৯ সালে ইএসপিএনের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নিউইয়র্ক ইয়াঙ্কিজ ও বস্টন রেড সক্সের একটি ম্যাচে আনুষ্ঠানিক প্রথম বলও ছুড়েছিলেন তিনি।
‘সোর্টস জাঙ্কিস রিজয়েস! দি বার্থ অব ইএসপিএন’ এবং ‘ইএসপিএন: ওয়ান জায়ান্ট লিপ ফর ফ্যানকাইন্ড’ তার লেখা দুটো বই।
রাসমুসেনের জীবন ও ইএসপিএনের শুরুর ইতিহাস নিয়ে ২০২৬ সালে একটি তথ্যচিত্র ও বইও প্রকাশিত হয়েছে।