বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে চীনের দাপট এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশকেও

স্পোর্টস ডেস্ক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

 


বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ চীন। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনেও চীন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অলিম্পিক-এশিয়ান গেমসের মতো বৈশ্বিক আসরে দেশটি শীর্ষেই থাকে। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের অগ্রযাত্রাতেও চীন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ও বন্ধু হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছে। 

এশিয়ান গেমস মানেই চীনের শ্রেষ্ঠত্ব
১৯৮২ দিল্লি এশিয়াড থেকে বর্তমান পর্যন্ত সকল এশিয়ান গেমসে পদক তালিকায় চীনের শ্রেষ্ঠত্ব অব্যাহত। জাপান, কোরিয়া ও ভারতসহ অন্য দেশগুলো লড়ে দ্বিতীয় ও অন্য পজিশনের জন্য। চীনের জন্য প্রথম পজিশন যেন নির্ধারিত। চীনের সঙ্গে দ্বিতীয় পজিশনের ব্যবধানও থাকে যোজন যোজন। 

দুই অলিম্পিকে সেরা
২০০৮ সালে বেইজিংয়ে চীন অলিম্পিক আয়োজন করেছিল। ঐ অলিম্পিকেই প্রথম চীন বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে প্রথম স্থান অর্জন করে। এরপর লন্ডন, রিও এবং টোকিও অলিম্পিকে নিজের সেই জায়গা ধরে রাখতে পারেনি। তবে প্যারিস অলিম্পিকে আবার নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে। অলিম্পিকে চীন, আমেরিকা ও গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যে লড়াই হয় মূলত। সেই লড়াইয়ে আগে আমেরিকার প্রাধান্য থাকলেও চীন সেটাও উৎরে যেতে পেরেছে।

সাংগঠনিক দক্ষতায় অন্যদের চেয়ে এগিয়ে চীন
২০২৩ সালে চীনের হাংজু শহরে এশিয়ান গেমস অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ঐ গেমসের ব্যবস্থাপনা ছিল বেশ প্রশংসনীয়। নানান দেশের ক্রীড়াবিদদের পাশাপাশি মিডিয়ার জন্যও ছিল দারুণ সব সুযোগ-সুবিধা। মিডিয়া সেন্টার থেকে প্রতি ভেন্যুতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাস চলাচল করেছে। হাংজু শহরে যে কোনো প্রান্তে শাটলের মাধ্যমে যাতায়াত ছিল বিনা পয়সায়। এশিয়ান গেমসে ২০১০ সালেও চীন এমন ব্যবস্থা করেছিল। তবে এবার জাপান এশিয়ান গেমসে ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। সব গেমসে মিডিয়ার জন্য মিডিয়া সেন্টার থেকে শাটল থাকে বিভিন্ন ভেন্যুতে। অনেক ভেন্যুতে এই সুবিধা নেই। কিছু ভেন্যুতে সুবিধা থাকলেও এটার জন্য সংবাদ কর্মীদের ভোর ছয়টায় মিডিয়া সেন্টারে পৌঁছানোর নির্দেশনা থাকে। যা প্রকৃত পক্ষে অসম্ভবই।
চীনের হাংজু এশিয়ান গেমসে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল নজরকাড়া। আধুনিক প্রযুক্তিতে অসাধারণ অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেই তুলনায় এবার জাপানের উদ্বোধন হয়েছে একেবারে সাদামাটা।

বাংলাদেশের ক্রীড়া পণ্য চীন নির্ভর
খেলাধুলার জন্য সবার আগে প্রয়োজন হয় সরঞ্জামের। ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস এবং হকিসহ বাংলাদেশের অনেক খেলার সামগ্রী চীন থেকে আমদানি করা হয়। ঢাকা স্টেডিয়াম দোকান মালিক সমিতির সভাপতি আহাদ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে খেলাধুলার সামগ্রী অধিকাংশ কেনা-বেচা হয় ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে। ঢাকা স্টেডিয়ামে শতাধিকের ওপর ক্রীড়া সামগ্রীর দোকান। এই দোকানগুলোর মালিকদের অনেকেই চীন থেকে মালামাল আনেন। ক্রেতারা চীনের পণ্যের দাম ও মানে সন্তুষ্ট।
বাংলাদেশে খেলাধুলার সামগ্রী অধিকাংশ কেনা-বেচা হয় ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে। ঢাকা স্টেডিয়ামে শতাধিকের ওপর ক্রীড়া সামগ্রীর দোকান। এই দোকানগুলোর মালিকদের অনেকেই চীন থেকে মালামাল আনেন। ক্রেতারা চীনের পণ্যের দাম ও মানে সন্তুষ্ট।
ব্যবসায়ীর পাশাপাশি ক্রীড়াবিদ-সংগঠকরাও চীনের ক্রীড়াসামগ্রী নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট। জাতীয় হকি দলের সিনিয়র খেলোয়াড় রাসেল মাহমুদ জিমি বলেন, চীনের স্টিক ও বল বেশ স্বাচ্ছন্দ্যময়। ব্যাডমিন্টনে সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ও ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাসেল কবির সুমন বলেন, ব্যাডমিন্টনের র‌্যাকেট বেশ ব্যয়বহুল। চীনের র‌্যাকেটগুলো মানে ও দামে সাশ্রয়ী। বাংলাদেশে চীনের র‌্যাকেটের সংখ্যা অনেক।

চীনে বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের দীর্ঘমেয়াদী ক্যাম্প
অ্যাথলেটিক্স-সাঁতারের পাশাপাশি জিমন্যাস্টিক্সও মৌলিক খেলা হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশে জিমন্যাস্টদের জন্য তেমন ভালো সুযোগ-সুবিধা নেই। চীন জিমন্যাস্টিক্সে অনেক উন্নত। চীনে বাংলাদেশের জিমন্যাস্টরা কয়েক সপ্তাহ ট্রেনিং করেছে।
টেবিল টেনিসের পিং পং জগৎ জুড়ে বিখ্যাত। চীন টেবিল টেনিসে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। বাংলাদেশ টেবিল টেনিস দল চীনে অনুশীলন করেছে কয়েক সপ্তাহ। টেবিল টেনিস ফেডারেশনের সহ-সভাপতি খন্দকার হাসান মুনীর সুমন বলেন, চীনের প্রশিক্ষণে আমাদের খেলোয়াড়দের অনেক উন্নতি হয়েছে।

উশুর সাফল্যে চীনের অবদান
বাংলাদেশ এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত ইভেন্টে ৪০ বছর পর পদক জিতেছে। বাংলাদেশের উশুকা জিন্নাত আক্তার ৫২ কেজি ওজন শ্রেণীতে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছেন। ব্রোঞ্জ পদকজয়ী উশুকা তার এবং বাংলাদেশের উশুর পেছনে চীনের অবদান সম্পর্কে বলেন, উশুর জন্য পোষাক, ম্যাট খুব গুরুত্বপূর্ণ। বেশ কয়েক বছর যাবৎ চীন দূতাবাস আমাদের এই সহায়তা দিয়ে আসছে। আমাদের সাফল্যময় সময়ে চীনকে স্মরণ করছি।
উশু ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক দিলদার হাসান দিলু। এশিয়ান গেমসে স্বর্ণ জয়ের পর বাংলাদেশের উশু উৎকর্ষতার জন্য আরও বেশি চীন নির্ভরতার কথা বলেন, উশুতে চীন খুবই ভালো। তারা শুধু নিজেদের নয়, আমাদের মান উন্নয়নেও যথেষ্ট চেষ্টা করছে। যে কোনো খেলায় সামনে আগাতে হলে একটি আন্তর্জাতিক ফলাফল লাগে। এশিয়ান গেমসে পদক পাওয়ায় এখন আশা করছি বাংলাদেশে উশুর প্রচার-প্রসারে সুবিধা হবে। চীন দূতাবাস বা সরকার আমাদের উশুকে এখন আরও বেশি সহায়তা করবে এ নিয়ে আমরা কাজ করছি।

ক্রীড়া গবেষণা ও চিকিৎসায় চীন অনন্য
খেলাধুলা এখন আর শুধু নিছক বিনোদন নয়। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্ভর অনেক। একজন খেলোয়াড়ের দুর্বলতা-সক্ষমতা গবেষণার মাধ্যমেই নির্ণয় হয়। চীন সেই গবেষণায় অনন্য। চীনে কাজ করা বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেন, অ্যাথলেটিক্সসহ অনেক খেলায় চীন সারা বিশ্বে প্রথম। এর কারণ বায়োমেকানিক্স। তারা খেলোয়াড়দের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রিড (বুঝতে পারা) করে। যা তাদের অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখে।
স্পোর্টস আর ইনজুরি—এ দুটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ক্রীড়া চিকিৎসায় চীন এখন এশিয়া তো বটেই, বিশ্বের মধ্যেই অগ্রগণ্য। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের চিকিৎসক দেবাশীষ চৌধুরী যেমনটা বলেন, ইনজুরি ব্যবস্থাপনায় চীন দুর্দান্ত। বিশেষ করে খেলোয়াড়দের ইনজুরি পুর্নবাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের চিকিৎসা সেবা, যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থাপনায় অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে। 

বিকেএসপি ও চীনা বিশ্ববিদ্যালয় চুক্তি
বাংলাদেশের একমাত্র ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকেএসপি। চীনের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বিকেএসপির চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে বিকেএসপিতে চীন উশু প্রশিক্ষণ দেয়। আবার অনেক চীনা নাগরিক বিকেএসপিতে এসে ক্রিকেট দীক্ষা নেন। চীনে গিয়েও ক্রিকেট শেখায় বিকেএসপির কোচরা।
চীনে ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিকেএসপি থেকে প্রতি বছর দুই জন শিক্ষার্থী যান। সেখানে তারা ক্রীড়াভিত্তিক পড়াশোনা ও খেলাধুলা দুটোই করেন। টিউশন ফি মওকুফের পাশাপাশি আর্থিক সুবিধাও পান।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL