বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক সায়মা ওয়াজেদ পুতুল তাকে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত চেয়েছেন।
ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গতকাল বুধবার (১৯ আগস্ট) এক প্রতিবেদনে লিখেছে, গত আট মাসে একাধিকবার ডব্লিউএইচও এবং সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসুসের কাছে বিষয়টি তুলেছেন পুতুল। সর্বশেষ গত মাসে আইনজীবীর মাধ্যমে পাঠানো চিঠিতে ডব্লিউএইচওর সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্বচ্ছতা দাবি করার পাশাপাশি প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এর আগে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে ভারতের নয়াদিল্লিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কমিটির ৭৬তম অধিবেশনে সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক নির্বাচিত হন পুতুল। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পাঁচ বছরের জন্য ওই দায়িত্ব নেন। ওই বছর অগাস্টের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন তার মা শেখ হাসিনা। এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের সময় শেখ হাসিনার পাশাপাশি পুতুলকেও কয়েকটি দুর্নীতি মামলায় আসামি করা হয়। তার চার মাস পর, ২০২৫ সালের ১১ জুলাই পুতুলকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠায় ডব্লিউএইচও। সে সময় একজনকে ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হলেও ইতোমধ্যে তার মেয়াদ শেষ হয়েছে।
এদিকে, গতবছর নভেম্বরে প্লট দুর্নীতির অভিযোগে এক মামলায় পুতুলকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে ঢাকার একটি আদালত। তার আগে তাকে ধরতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারিরও আদেশ দিয়েছিল আদালত।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুতুল অভিযোগ করেছেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই’ ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্র্বর্তী সরকারের ‘অনুরোধে’ তাকে ছুটিতে পাঠিয়েছে। এমনকি ওই সিদ্ধান্তের কারণও তাকে স্পষ্ট করে জানায়নি। তিনি ডব্লিউএইচওর বিরুদ্ধে ‘পক্ষপাত ও হয়রানির’ অভিযোগও তুলেছেন। পাশাপাশি, জানতে চেয়েছেন, এক বছরের বেশি সময় ধরে ছুটিতে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত চলেছে কি না।
সূত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ডব্লিউএইচও পুতুলের কয়েকটি ইমেইলের প্রাপ্তি স্বীকার করলেও তার অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো স্পষ্ট জবাব দেয়নি। সংস্থাটির মহাপরিচালক কর্মীদের কাছে পাঠানো এক ই-মেইলে পুতুলকে ছুটিতে পাঠানোর বিষয়টি জানান। ওই ই-মেইলে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের আপত্তি, পুতুলের নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন এবং দুদকের মামলাÍএ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে তাকে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, তাদের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। আর ডব্লিউএইচও এক ইমেইল বার্তায় পুতুলের ‘ছুটিতে থাকার’ বিষয়টি তুলে ধরে বলেছে, কর্মীদের অভিযোগ জানানোর জন্য নির্ধারিত মাধ্যম রয়েছে। তবে গোপনীয়তা বজায় রাখার স্বার্থে আমরা নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে মন্তব্য করি না।
সূত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, ডব্লিউএইচও সরাসরি দুদক ও তৎকালীন অন্তর্র্বর্তী সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করেছে’ বলে অভিযোগ করেছেন পুতুল।
নয়াদিল্লিতে এসইএআরও-এর আঞ্চলিক পরিচালক পদে তার মনোনয়নে ভোট দেওয়া ভারতসহ অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের কাছে ‘বিকৃত তথ্য’ উপস্থাপন করে ‘সম্মানহানি’ করা হয়েছে বলেও তার অভিযোগ।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, ভারত সরকার ‘উপযুক্ত মাধ্যমে’ বিষয়টি ডব্লিউএইচওর কাছে তুললেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
একটি সূত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছেন, একটি রাজনৈতিক অনুরোধ পাওয়ার পরপরই সায়মা ওয়াজেদকে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তটি ডব্লিউএইচওর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থি। স্বয়ং তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস যখন নিজ দেশ ইথিওপিয়া থেকে একই ধরনের রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন, তখন সংস্থার প্রতিক্রিয়া এমন ছিল না। ওই সূত্রটি আরও বলেছে, ঢাকায় পুতুলের অনুপস্থিতিতে বিচার করে তাকে পলাতক ঘোষণা করা হয়েছে। একজন নির্বাচিত আঞ্চলিক পরিচালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে বাইরের রাজনৈতিক প্রভাব কতটা যাচাই-বাছাই করা হয়েছে, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা ডব্লিউএইচও এখনও দেয়নি। পুতুলের দাবি, তার যোগ্যতা ও স্বাস্থ্যখাতে অবদানকে ‘পাশ কাটিয়ে, কেবল শেখ হাসিনার মেয়ে হওয়ার কারণেই’ তাকে বাংলাদেশ সরকারের ‘ইশারায়’ নিশানা বানানো হয়েছে।
সূত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, প্রথমে পুতুলকে সবেতনে ছুটিতে পাঠানো হলেও, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলায় কয়েক মাস পর তাকে 'বিনা বেতনে প্রশাসনিক ছুটিতে' পাঠানো হয়।
২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক নির্বাচনে ১০ ভোটের মধ্যে ভারতের ভোটসহ আটটি ভোট পেয়েছিলেন পুতুল।
আরেকটি সূত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, সায়মাকে যারা নির্বাচিত করেছিল, সেই সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াই একটি তড়িঘড়ি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ওই ম্যান্ডেট পরিবর্তন করা হয়েছে। আঞ্চলিক পরিচালকরা মূলত তাদের নির্বাচিত করা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছেই দায়বদ্ধ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটি বলছে, বর্তমানে আঞ্চলিক পরিচালকের পদটি শূন্য ঘোষণা করা না হলেও নির্বাচিত পরিচালক সায়মাকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর জন্য ‘ক্রমাগত চাপ’ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।