পারিবারিক সহিংসতায় বাড়ছে উদ্বেগ, ছয় মাসে খুন ৩ শতাধিক নারী

এসএম দেলোয়ার হোসেন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে দিনের পর দিন বেড়েই চলছে পারিবারিক সহিংসতা। একই সঙ্গে এসব বিরোধের জের ধরে ঘটছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক সহিংসতাও। ভুক্তভোগীরা বলছেন, তুচ্ছ ঘটনায় এমনকি পরকীয়ার জের ধরেই প্রতিনিয়তই ঘটছে খুনোখুনি। এতে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পারিবারিক কলহের জেরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩ শতাধিক নারী খুন ও দুই শতাধিক নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, শুরুতেই আইনি প্রতিকার না পাওয়া এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিই বড় অপরাধের পথ তৈরি করছে। তবে পুলিশ বলছে, সবকিছু আইন দিয়ে সমাধান করা যায় না। পারিবারিক সহিংসতা কমিয়ে আনতে জনসচেতনতার বিকল্প নেই। প্রয়োজন সামাজিক কাউন্সেলিং। সোমবার (৯ আগস্ট) ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। 
 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছরের ৩০ জুলাই রাজধানীর উত্তরার দক্ষিণখানের ফায়দাবাদের নিজ বাসায় খুন হন দন্ত চিকিৎসক সারাহ রোকসানা পিনু নামের এক নারী। তাকে বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার রেশ না কাটতেই গত ২ আগস্ট রাজধানীর কলাবাগানের কাঁঠালবাগানের কিচেন গলির নিজ বাসায় খুন হন স্ত্রী ফারজানা আক্তার রাত্রি ও শাশুড়ি ফিরোজা বেগম। নৃশংস এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কলাবাগানের জোড়া খুনের ঘটনায় নিহত ফারজানা আক্তা রাত্রির স্বামী মো. হৃদয় ওরফে শিপন স্বেচ্ছায় থানায় আত্মসমর্পণ করে ধরা দেন। অপরটি উত্তরার দক্ষিণখানের ফায়েদাবাদের ঘটনায় স্ত্রী সারাহ রোকসানা হত্যাকাণ্ডটি চুরি বা ডাকাতি নাটক উপস্থাপন করতে গিয়ে পুলিশের সন্দেহে পড়েন স্বামী সোহেল রানা। নিহতদের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদেই পুলিশের তদন্তে উঠে আসে দাম্পত্য বা পারিবারিক কলহের জের ধরেই স্ত্রী-শাশুড়িকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে স্বামী মো. হৃদয় ওরফে শিপন। আর পরকীয়া সন্দেহে দীর্ঘদিনের বিরোধের জের ধরে দন্ত চিকিৎসক সারাহ রোকসানা পিনুকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে স্বামী সোহেল রানা।
 
কলাবাগান থানায় দায়ের করা জোড়া খুনের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইব্রাহিম হোসেন জানান, ঘটনার দিন সোমবার (২ আগস্ট) বিকেলে আসামি শিপন স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি উল্লেখ করে তা রেকর্ড করার আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জামসেদ আলম আসামির জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে, ঘটনার দিন ২ আগস্ট রাতে নিহত ফারজানার বাবা মো. ফারুক বাদী হয়ে কলাবাগান থানায় মামলা করেন। এর পরপরই আসামিকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

প্রাথমিক তদন্ত শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, আসামি মো. হৃদয় ওরফে শিপন নিজে কলাবাগান থানায় এসে আত্মসমর্পণ করলে তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে তার দেখানো তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত চাকুটি বাদীর বাসা থেকে উদ্ধার ও জব্দ করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে আসামির বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনার বিষয়ে দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। 

মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, পাঁচ বছর আগে ফারজানার সঙ্গে মো. হৃদয় ওরফে শিপনের বিয়ে হয়। তাদের এক বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। বিয়ের পর থেকেই তুচ্ছ বিষয় ও পারিবারিক নানা বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে আসামির ঝগড়া-বিবাদ হতো। গত ২৪ জুলাই পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে গ্রামের বাড়ি গেলে ৩০ জুলাই আসামি শিপন ও তার দুই বন্ধুকে নিয়ে সেখানে যান। স্ত্রীর সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে তিনি বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ না করেই গত ৩১ জুলাই ঢাকায় ফিরে আসেন। ১ আগস্ট রাতে পরিবারের সদস্যরা ঢাকার বাসায় ফেরেন। পরদিন (২ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে আসামি রান্নাঘর থেকে একটি ধারালো সবজি কাটার ছুরি এনে ফারজানাকে হত্যা করেন। এ সময় ফারজানার মা ফিরোজা বেগম মেয়েকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে আসামি তাকেও একই ছুরি দিয়ে গলা, কাঁধ ও হাতে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় ফিরোজা বেগমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

কলাবাগান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ফজলে আশিক দৈনিক সবুজ বাংলাকে জানান, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক কলহের একপর্যায়ে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। এ সময় রাত্রির মা মেয়ের পক্ষ নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শিপন প্রথমে তার স্ত্রীকে ছুরিকাঘাত করেন। পরে শাশুড়িকেও ছুরিকাঘাত করেন। ওসি জানান, ঘটনাস্থলেই রাত্রির মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ফিরোজা বেগমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত ফিরোজা বেগমের স্বামী মো. ফারুক হোসেন দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ঘটনার দিন সকালে তিনি খবর পান, কাঁঠালবাগানের বাসায় মেয়ে ও মেয়ের স্বামী শিপনের মধ্যে ঝগড়া চলছে। বাসায় গিয়ে তিনি মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে এবং স্ত্রীকে গুরুতর আহত অবস্থায় দেখতে পান। পরে স্ত্রীকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি আরও জানান, প্রায় ১০ দিন আগে মা-মেয়ে গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের গোসাইরহাটে গিয়েছিলেন। শুক্রবার এক আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে শিপনের সঙ্গে রাত্রির বাগবিতণ্ডা হয়। ১ আগস্ট রাতে তারা ঢাকায় ফেরেন। ২ আগস্ট সকালে সেই বিরোধের জের ধরে শিপন ধারালো অস্ত্র দিয়ে রাত্রিকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করেন। ফিরোজা বেগম বাধা দিতে গেলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে শিপন এক বছর বয়সী ছেলে রায়হানকে নিয়ে পালিয়ে যান।

এদিকে, গত ৩০ জুলাই দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ এলাকার জামতলা গলির একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে দন্ত চিকিৎসক সারা রোকসানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন নিহতের বোন মামলা করেন। মামলায় বলা হয়, ওই দিন বেলা ১১টা ২০ মিনিটের দিকে ১০ বছর বয়সী মেয়েকে স্কুলে দিয়ে অফিসে যান সোহেল রানা। বাসায় তখন একা ছিলেন সারাহ রোকসানা। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে স্কুল ছুটি হলে একাই বাসায় ফেরে মেয়েটি। ঘরে ঢুকে শোবার ঘরে মাকে বিছানায় মুখের ওপর বালিশচাপা অবস্থায় দেখতে পায় সে। ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে সে বুঝতে পারে মায়ের শ্বাসপ্রশ্বাস নেই। পরে স্কুলে ফিরে অধ্যক্ষের মুঠোফোন থেকে বাবাকে বিষয়টি জানায়। খবর পেয়ে সোহেল রানা এবং পরে সারা রোকসানার পরিবারের সদস্যরা বাসায় যান। ঘরের একটি জানালার গ্রিল কাটা পাওয়া যায় এবং আলমারি থেকে আনুমানিক ২০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার খোয়া গেছে বলে জানানো হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, চোর বা ডাকাত দল গ্রিল কেটে ভেতরে ঢুকে লুটপাটের পর সারাহ রোকসানাকে হত্যা করেছে। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি দল ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

মামলাটি তদন্তের এক পর্যায়ে গত শুক্রবার (৩১ জুলাই) দিবাগত রাতে সোহেল রানাকে আটক করে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে রিমান্ড আবেদনে বলেন, জানালার গ্রিল কাটা থাকলেও আশপাশের কেউ কোনো শব্দ শোনেননি। জানালার ভেতরের বারান্দায় পাওয়া জুতার ছাপের সঙ্গে সোহেল রানার জুতার মিল পাওয়া গেছে, যা সোহেল রানা নিজের বলে স্বীকার করেছেন। তবে বাইরের ছাদ বা বিপরীত পাশে কোনো জুতার ছাপ পাওয়া যায়নি।

রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়, নিহত চিকিৎসকের মেয়ে পুলিশকে জানিয়েছে, প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার আগে মা তার সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে ভেতর থেকে দরজা আটকে দিতেন। তবে ঘটনার দিন দরজা আটকানো হয়নি। এ ছাড়া সোহেল রানা বাসায় ফিরে স্ত্রীকে ওই অবস্থায় দেখেও তাকে স্পর্শ বা চিকিৎসার চেষ্টা করেননি। সোহেল রানার ব্যবহৃত আলমারিটি অক্ষত ছিল। ঘটনাস্থলে থাকা পুরোনো খালি গয়নার বাক্সগুলো গুছিয়ে রাখা ছিল, যা দেখে প্রকৃতপক্ষে চুরি বা ডাকাতির কোনো ঘটনা ঘটেনি বলেই পুলিশ মনে করছে। আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহের কথা স্বীকার করে স্ত্রীর একটি সম্পর্কের বিষয়ে সন্দেহ করার কথা বলেছেন সোহেল রানা।

পুলিশের এই আবেদনে সোহেল রানার বিরুদ্ধে নিহতের পরিবার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, সোহেল রানা দীর্ঘদিন ধরে স্ত্রীকে নির্যাতন করে আসছিলেন এবং তার একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। মৃত্যুর কিছুদিন আগে সারা রোকসানা বোনকে ফোন করে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন।

দন্তচিকিৎসক সারাহ রোকসানা (৪২) হত্যা মামলায় তার স্বামী মো. সোহেল রানাকে দুই দিনের রিমান্ড শেষে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে ওই দিন আদালতে শুনানিকালে আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহাবুদ্দিন শেখ রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিনের আবেদন করেন। তিনি বলেন, আসামিকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মনোমালিন্য থাকলেও তিনি হত্যা করেননি। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করে হত্যার রহস্য বের করতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করার আবেদন জানান। আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করার পর আদালত ভবন থেকে নিচে নামিয়ে নেওয়ার সময় সোহেল রানা সাংবাদিকদের বলেন, আমি খুন করিনি। পুলিশ কোনো আসামি না পেয়ে আমাকে ফাঁসিয়েছে। আমি সঠিক তদন্ত চাই। বিচার চাই।
   
পুলিশ ও আদালত সংশ্লিষ্টরা জানান, পারিবারিক কলহ থেকে বিরোধ, আর সেই বিরোধই গড়াচ্ছে হত্যাকাণ্ডে। গত ৩০ জুলাই দক্ষিণখানের ফায়দাবাদের একটি বাসায় বালিশচাপা দিয়ে খুন করা হয় সারাহ রোকসানা পিনু নামে এক দন্ত চিকিৎসককে। এরপর তদন্তে নামে পুলিশ। একপর্যায়ে বেরিয়ে আসতে থাকে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জুতার ছাপসহ বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করে সন্দেহের তীর যায় চিকিৎসকের স্বামী সোহেলের দিকে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তেও পারিবারিক কলহের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও উঠে আসে। নিহতের বোনের দাবি, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে বাধা দেওয়ায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। খোলামেলা পরিবেশের ওই বাসায় কীভাবে হত্যাকারী প্রবেশ করল এবং কীভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো এসব বিষয়সহ আরও বেশকিছু কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিহতের স্বামীর সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়।

নিহতের বোন সারাহ সুলতানা পলি দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমার বোনের জীবন শেষ করতে করতে তিলে তিলে ধরতে হইবো। কিন্তু একবারে শেষ কইরা ফালাইছে। স্বামী সোহেল রানার অমানুষিক নির্যাতনে নিরাপত্তারহীনতার কথা জানিয়েছিলো আমার বোন সারাহ রোকসানা।
 
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপ-কমিশনার মির্জা তারেক আহমেদ বেগ বলেন, চাঞ্চল্যকর ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমাদের কাছেও প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে জুতার ছাপটা বাইরে কেন নেই, অথচ ভেতরে পাওয়া গেল। আসলেই জুতার ছাপটা নিহতের স্বামীরই ছিল। 

এদিকে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পারিবারিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩ শতাধিক নারী। এতে আহত হয়েছেন আরও ২ শতাধিক। এ সময়ে আত্মহত্যা করেছেন ১৪৭ জন এবং অ্যাসিড আক্রান্তের শিকার হয়েছেন আরও ৪ জন। সব মিলিয়ে এ সময়ে অন্তত ১ হাজার ৬২১টি নারী নির্যাতনের ঘটনা সামনে এসেছে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছর এসব ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে।

মানবাধিকার সংস্থার নেত্রীরা বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক পারিবারিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় অনেক নারীই তাদের সংগঠনগুলোর মাঠ কর্মীদের কাছে নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একজন নারী বলেন, স্বামী- কথা শুনলেই তো ডরাই। স্বামীর কাছে যদি নিরাপত্তাই না থাকে, তাহলে নারীরা কার কাছে নিরাপত্তা পাবে?

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় আইনি প্রতিকার চাওয়া হয় না। ফলে ধীরে ধীরে সহিংসতা বাড়তে বাড়তে হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়। এছাড়া রাজনৈতিক সংহিসংতাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। শুধু পারিবারিক হত্যা ও সহিংসতা নয়, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নিয়েও জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, সমাজে এখনও নারীরা নানা কারণে অবহেলিত, নির্যাতিত হচ্ছে। পারিবারিক বিরোধে নির্মম নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডেরও শিকার হচ্ছেন নানা বয়সের নারীরা। বেশিরভাগই পারিবারিকভাবে ধামাচাপা পড়ে যায়। বিচার দিয়েও অনেক নারী পারিবারিকভাবেই হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এর ফলে বিচারপ্রার্থী নারীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়ে ঝামেলা এড়াতে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। তবে তার মতে, সামাজিক ও পারিবারিকভাবে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও তৎপরতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক আন্দোলন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে না পাড়লে নারী নির্যাতন ও পারিবারিক সহিংসতা আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, পারিবারিক সহিংসতায় যারা ভুক্তভোগী হন, তারা খুব বেশি থানায় গিয়ে কোনো অভিযোগ করেন না। আমার মনে হয়, সেগুলো অভ্যন্তরীনভাবে সমাধা না করে যেভাবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সমাধা করা যায়, সেগুলো চিহ্নিত করা উচিত। এগুলো না করার কারণেই পারিবারিক সহিংসতা বলেন আর রাজনৈতিক সহিংসতা বলেন, দুটোই কিন্তু বাড়ছে। এসব সহিংসতা রোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই বলেও মনে করছেন এই বিশ্লেষক। 

এদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, সবকিছু আইন দিয়ে সমাধান করা যায় না। এ ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক কাউন্সেলিংয়ের ওপর জোর দিতে হবে। তিনি বলেন, এ বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে যে অপরাধগুলো হয়, এর জন্য ইতোমধ্যেই আমরা কমিউনিটি এবং বিট পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদার করেছি। জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য এবং এই লক্ষ্যে কাজ করার জন্য আমরা আমাদের প্রত্যেকটা ইউনিটকে নির্দেশনা দিচ্ছি। জনসচেতনতা ও কাউন্সেলিং বাড়লে সামাজিকভাবে সহিংসতার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত