রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ভেঙে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার মধ্যে গতকাল সংসদ সদস্যের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। সংসদ সচিব গোলাম সারওয়ার ডেইলি ওয়াদাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। দিনের শুরুতে মিষ্টিকে সংসদ ভবন কমপ্লেক্সে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কয়েক ঘণ্টা পর জাতীয় সংসদ সচিবালয় তাঁর সংরক্ষিত নারী আসনটি শূন্য ঘোষণা করে। সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতীয় সংসদের ৩২৩ নম্বর নির্বাচনী এলাকা (নারী সংরক্ষিত আসন-২৩) সংবিধানের ৬৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শূন্য হয়েছে।
মিষ্টি প্রয়াত বিএনপি সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন এবং নিহত বিএনপি কাউন্সিলরের বিধবা স্ত্রী। এর আগে দিনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতীকুর রহমান রুমন ওয়াদাকে জানিয়েছিলেন, মিষ্টিকে তাঁর সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে কাউকে, বিশেষ করে মিষ্টির নাম যেহেতু এ ঘটনায় ওঠে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি দলের কয়েকজন নেতা, এমনকি জ্যেষ্ঠ নেতারাও আহ্বান জানিয়েছিলেন। দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে মিরপুরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংসের ঘটনায় সৃষ্ট বিতর্কের মধ্যে মিষ্টির পদত্যাগ বিএনপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঘটনাটি নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির ওপর জনমতের চাপও ক্রমেই বাড়ছিল। সংবিধানের ৬৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন। স্পিকার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে সংসদীয় আসনটি শূন্য হয়। স্পিকার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে ডেপুটি স্পিকার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে পারেন।
গত ২৪-২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে প্রায় ২০০ মুখোশধারী ব্যক্তি রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলাকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের আটকে রেখে ওষুধ, টিকা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম লুট করে। পরে ভারী যন্ত্রপাতি এনে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ভবন ভেঙে ফেলা হয় বলে অভিযোগ। রাড্ডা মিরপুরের বাসিন্দাদের কয়েক দশক ধরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃসেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। ফলে প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সংবেদনশীলতা তৈরি করে। ঘটনার পরপরই বিষয়টি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউইয়র্কে অবস্থানকালে এ নিয়ে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে থাকে। চার দিনের কূটনৈতিক কর্মসূচি শেষে ঢাকায় ফিরে তিনি দেশে দুটি আলোচিত ঘটনার মুখোমুখি হন—রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস এবং ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর। তবে রাড্ডার ঘটনাটি ক্ষমতাসীন দলের জন্য তুলনামূলকভাবে সরাসরি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে, কারণ হামলা ও ধ্বংসের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নাম জড়ানোর অভিযোগ ওঠে।
শুধু সাংগঠনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়: বিরোধীদলীয় নেতা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শুধু সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ ও শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে শফিকুর রহমান বলেন, ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল শেষ পর্যন্ত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে এটি যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, মানুষ দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য আইনি ব্যবস্থা দেখতে চায়। মিরপুর-১-এ গত ২৫ সেপ্টেম্বর হামলা, লুটপাট ও ধ্বংসের শিকার হওয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি টেকসইভাবে পুনঃর্নিমাণ এবং পুনরায় স্বাস্থ্যসেবা চালুর দায়িত্ব সরকারকে নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি। এর আগে শফিকুর রহমান ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন এবং পুনঃর্নিমাণ ও স্বাস্থ্যসেবা পুনরায় চালুর জন্য ৫০ লাখ টাকা সহায়তার ঘোষণা দেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা
মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে বলার বিএনপির সিদ্ধান্ত রাজনীতিক, বিশ্লেষক এবং সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। অনেকেই এটিকে রাজনৈতিক জবাবদিহির ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকভাবে শক্ত অবস্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জামাতা ফাহাম আবদুস সালাম ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে লিখেছেন, রাজনৈতিক নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেছেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ‘সবার জন্য একটি বার্তা’ যাওয়া উচিত। তার মতে, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বুঝতে হবে যে ‘পুরোনো ধারার রাজনীতি আর চলবে না।’ আইনজীবী শিশির মনির সিদ্ধান্তটিকে ‘প্রশংসনীয়’ আখ্যা দিয়ে আশা প্রকাশ করেন, এ ঘটনা থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা শিক্ষা নেবেন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন। সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম অবশ্য কিছুটা সতর্ক অবস্থান নেন। তার মতে, জবাবদিহি শুধু ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। তিনি লিখেছেন, আমাদের এমন জবাবদিহি প্রয়োজন, যা প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার কাছ পর্যন্ত পৌঁছায়। একই সঙ্গে উচ্চপ্রোফাইল ঘটনাগুলোতে স্বাধীন তদন্ত, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নির্বিশেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। রাজনৈতিক ভাষ্যকার নায়েল রহমান মিষ্টিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের একটি ‘ঘুঁটি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে তিনি বলেন, দলের সদস্যদের আচরণ যখন দলটির শাসনক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে, তখন ক্ষমতাসীন বিএনপি প্রচলিত রাজনৈতিক কৌশল থেকে সরে আসতে প্রস্তুত—এই সিদ্ধান্তে তার একটি ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি বলেন, আপনি এটিকে জনসংযোগ, ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা কিংবা দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর কৌশল—যে নামেই ডাকুন না কেন, একজন ক্ষমতাসীন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক চর্চা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচ্যুতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশ্বের হাসানও এ ধরনের পদক্ষেপের বিরলতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সহিংসতা ও ভাঙচুরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে কোনো সংসদ সদস্যকে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা বিরল।
তবে মিষ্টির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং ঘটনায় যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাড্ডা হামলার ঘটনায় পুলিশ ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এ ছাড়া শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। মিষ্টি রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংসের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছেন। হামলার পর ওই স্থাপনায় যে সমবায় সমিতির সাইনবোর্ড দেখা যায়, সেই সমিতির সঙ্গে অতীতে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল বলে তিনি স্বীকার করেছেন। তবে ভাঙচুর বা স্থাপনা দখলের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
তারপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এমএইচ তানভীর এটিকে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশিত ‘দৃঢ় নেতৃত্বের’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে চাঁদাবাজি, সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিরুদ্ধেও একই ধরনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইয়ামেন জাহাঙ্গীর লিখেছেন, অবশেষে!! বিএনপির এটি একটি দুর্দান্ত পদক্ষেপ। যেখানে কৃতিত্ব প্রাপ্য, সেখানে তা অবশ্যই দিতে হবে। শেয়ারেক ফাহিম হক সিদ্ধান্তটিকে ‘সাহসী ও দৃঢ় পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এর মাধ্যমে দলের কর্মীদের কাছে একটি বার্তা গেছে—সীমা অতিক্রম করলে তার পরিণতি হতে পারে।