খেলা আর ঘরোয়া নয়, আন্তর্জাতিক। প্রেসকে ব্রিফিংয়ে যা বলা বা জানানো হয়েছে, তাও আসল কথা নয়। তা শুধু বলার জন্যই বলা। ‘র’ প্রধান পরাগ জৈন, দিল্লির হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, সার্জিও গোরসহ যুক্তরাষ্ট্রের দুই রাজমেহমানের সাম্প্রতিক সফর সব ক্ষেত্রেই আসল ফের এখনো গভীরে লুকানো। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ কেবলই সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না। ভেতরে রয়েছে অনেক কথা।
সাক্ষাৎটি ছিল শুধুই শো আপ। উপরিতলে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা, শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত পাঠানো, তার দিল্লি থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া এবং সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকার অসন্তোষের কথা। এ বাস্তবতার মাঝেই ঢাকায় ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং’ বা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের নীরব সফর। তারেক রহমান সরকারের উচ্চপর্যায়ের তিনজনের সঙ্গে বৈঠকের পর তড়িঘড়ি নয়াদিল্লি ছুটে যান হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর সোমবার তিনি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে। সেদিন বিকালেই দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। চূড়ান্ত বা খাস কথা ওখানেই।
তবে পরাগ জৈনসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের আকস্মিক ঢাকা সফর ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নানা আলোচনা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া কীভাবে এগোতে পারে, দেশের মধ্যে এ বিষয়ে কী ধরনের সমঝোতা প্রয়োজন এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যে বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায়, এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে উচ্চপর্যায়ে।
ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার আগে মে মাসে দীনেশ ত্রিবেদীর ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর সঙ্গে একটি বিশেষ বৈঠক হয়েছিল। সেটার ফলোআপেই ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের ঢাকা সফর। দুই দিনের এই সফরের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচি প্রকাশ করা হয়নি। রোববার দুপুরে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে দিল্লি থেকে ঢাকায় আসেন পরাগ জৈন। তার সঙ্গে ছিলেন অশ্বীন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি ও শৈবাল রায় চৌধুরী। চার সদস্যের প্রতিনিধিদলটি ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলে অবস্থান নেন। সফরকালে তিনি বাংলাদেশের নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। তাদের বিশেষ বৈঠকটি হয় সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষা-বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামের সঙ্গে তার গুলশানের বাসায়। সোমবার দুপুরে সহযোগীদের নিয়ে একই ফ্লাইটে ঢাকা ছাড়েন পরাগ জৈন। সূত্র নিশ্চিত করেছে, নীরবে হলেও বৈঠকটি গোপনে ছিল না। একেবারে সীমিতও ছিল না। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের আমন্ত্রণেই র-এর টিমটি ঢাকায় আসে।
বাংলাদেশের অন্য কয়েকটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার প্রধান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেছেন তারা। এই সফরের সময়টিই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সম্ভাব্য ডিসেম্বরের দেশে ফেরার ঘোষণা এবং তাকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লির সাম্প্রতিক টানাপোড়েন, তার মধ্যেই ত্রিবেদীর কর্মতৎপরতা। একই দিনে ‘র’-প্রধানের ঢাকা সফর হওয়ায় দুই ঘটনাকে পাশাপাশি রেখে দেখছেন অনেকে। এতে ‘র’-প্রধানের ঢাকা সফর নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরার পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতেই পরাগ জৈন ঢাকায় এসেছেন। এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বা ভারতের কোনো সরকারি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ‘র’-এর মতো একটি বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের সফরের আলোচ্যসূচি সাধারণত প্রকাশ করা হয় না। তবে ঘটনার পরিক্রমায় তা দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার সাম্প্রতিক যোগাযোগ এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি তৈরি করেছে। গত মার্চের শুরুতে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশীদ চৌধুরী দিল্লি সফর করেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওই সফরে তিনি ভারতের ‘র’-প্রধান পরাগ জৈন এবং সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর এস রমনের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও ওই সফরের কথা নিশ্চিত করেছিলেন। গত দুই বছরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বড় একটি অংশ জুড়ে ছিলেন শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তিনি ভারতে চলে যান। এরপর তার ভারতে অবস্থান, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অবশ্য দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যেও যোগাযোগের নজির দেখা যাচ্ছে। কিন্তু হাইপ তুললেও আওয়ামী লীগের জন্য কোনো ভালো খবর নেই। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ভীষণ নার্ভাস। দিল্লি ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে যে অনুষ্ঠান হলো, সেটাতে অংশ নিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় বক্তব্য দিয়েই হুট করে ভিডিও অফ করে দেওয়ার মাঝেও রহস্য লুকিয়ে আছে। বিশেষ করে, ভারতে অবস্থানকারীরা বিএনপি সরকারের মেয়াদ পূর্তির আগে দেশে ফিরতে নারাজ। শেখ হাসিনাকেও ফিরতে দিতে নারাজ তারা।
তারাই এবার নানা পন্থায় প্রোপাগান্ডায় নেমেছে। নানা আওয়াজ দিলেও তারা ভেতরে ভেতরে গুপ্ত পন্থায় ভর করেছে। যেখানে যেভাবে পারা যায় বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসিহ বিভিন্ন দলে মিশে যাওয়ার বন্দোবস্ত করছে তারা। বিষয় আসলে শুধু ভারত-বাংলাদেশ নয়। আশপাশে আরও অনেক কিছু। তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। ভারতের উদ্বেগের জায়গা তৈরি হয় সৌদি অর্থ, পাকিস্তানি সামরিক সক্ষমতা এবং তুর্কি প্রযুক্তি যখন একই কৌশলগত কাঠামোর মধ্যে যুক্ত হয়। সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির মূলনীতি হলো, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রশ্ন উঠছে, পাকিস্তান কি তুরস্কের দক্ষিণ এশীয় প্রভাবের সেতু?
তুরস্ক শুধু বাণিজ্যিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চাইছে না; আঙ্কারা মুসলিম বিশ্বে তার রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে চায়। ‘এশিয়া অ্যাগেইন’ উদ্যোগের মাধ্যমে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের উপস্থিতি বাড়ছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং অন্যান্য মুসলিম-অধ্যুষিত দেশের সঙ্গে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার সামুদ্রিক ও প্রতিরক্ষা উপস্থিতি নয়াদিল্লির জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। ভারত সৌদি আরবের অংশগ্রহণকে সরাসরি ভারতবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে পারছে না। কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের শক্তিশালী অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। দ্বিপক্ষীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক এত ঘনঘটার মাঝে যুক্তরাষ্ট্র যা করার করে নিয়েছে। সামনে আরও অনেক কিছু করার পালা। এত কিছু ঘটে চলা ও ভারতীয় এ দৌড়ঝাঁপের মাঝেও রিলাক্সে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। পেয়ারার স্বাদ নিতে নৌপথে ছুটে গেছেন ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী ভীমরুলিতে। সেখানকার ভাসমান পেয়ারাবাজার ও সবুজে ঘেরা পেয়ারার বাগান দেখে মুগ্ধ হয়েছেন হয়েছেন স্ত্রী ডিয়ান ডাও’কে নিয়ে। নৌকায় ভাসমান পেয়ারাবাজার ও বিভিন্ন বাগান ঘুরেছেন। পেয়ারা চিবিয়েছেন। তাদের পেয়ারাবাজার ঘুরে দেখার কয়েকটি ছবি প্রকাশ করেছে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ। এর আগে সর্বশেষ ২০১৯ সালে তখনকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারও ভীমরুলির ভাসমান পেয়ারাবাজারে গিয়েছিলেন।