দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে আগামী ১ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে পর্যটন মৌসুম। ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য দ্বীপে ভ্রমণের সুযোগ থাকবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দৈনিক সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক প্রবেশের সীমা নির্ধারণ করেছে সরকার। পাশাপাশি প্রত্যেক পর্যটকের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে পর্যটন মৌসুম শুরুর প্রাক্কালে দ্বীপের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও প্রশিক্ষিত অগ্নিনির্বাপণকর্মী না থাকায় ঝুঁকিতে রয়েছে দ্বীপের প্রায় ১৫০টি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ।
পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এই দ্বীপে প্রতিবছর পর্যটকের সমাগম বাড়লেও অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে পর্যটকদের আবাসনের জন্য গড়ে ওঠা হোটেল-রিসোর্টগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি ভোরে সেন্টমার্টিনের পশ্চিম সৈকতের গলাচিপা এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে তিনটি রিসোর্টের ২৬টি কক্ষ সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকায় আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। প্রবল বাতাসে এক রিসোর্ট থেকে অন্য রিসোর্টে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা পানি ঢেলে প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ওই ঘটনার পরও দ্বীপে স্থায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পর্যটন মৌসুমে হোটেল-রিসোর্টে মানুষের উপস্থিতি বাড়লে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সেন্টমার্টিনে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৫০টি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। এসব স্থাপনায় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমনপথ, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং আগুন মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত কর্মী রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা।
তিনি আরো বলেন, দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনায় দ্রুত উদ্ধার ও আগুন নেভানোর কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে। এ অবস্থায় আগুন লাগার পর জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি আবাসিক স্থাপনায় কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রশোজন।
টেকনাফ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন কমান্ডার কামরুজ্জামান সুমন জানিয়েছেন, আগামী ২৯ অক্টোবর তাঁরা সেন্টমার্টিন দ্বীপ পরিদর্শনে যাবেন। পরিদর্শনের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হবে।
পর্যটন মৌসুম শুরুর আগে ফায়ার সার্ভিসের এ পরিদর্শনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে শুধু পরিদর্শন ও সুপারিশ নয়, দ্বীপের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীরা।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম জানান, দ্বীপে আপাতত ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের সম্ভাবনা না থাকলেও প্রতিটি রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখা বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। এসব যন্ত্র সচল ও ব্যবহারোপযোগী রাখা, নিয়মিত তদারকি, জরুরি বহির্গমনপথ নিশ্চিত করা এবং হোটেল-রিসোর্টের কর্মীদের অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও মহড়ার ব্যবস্থা করাও জরুরি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, “পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই দ্বীপে অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা জোরদার করা না গেলে অতীতের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যাবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ, নিয়মিত তদারকি এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানাচ্ছি।”
সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য ও ভঙ্গুর পরিবেশ রক্ষায় পর্যটকের সংখ্যা সীমিত রাখার উদ্যোগের পাশাপাশি পর্যটকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত পর্যটকসীমা কার্যকর করা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ফির পাশাপাশি হোটেল-রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম নিশ্চিত করা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত দল গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের কারণে সেন্টমার্টিন পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যেন কোনো পর্যটক অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে না পড়েন, সে জন্য পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।