সামনে রাজনৈতিক ‘ঝড়’ : কতটা প্রস্তুত বিএনপি?

শামসুর রহমান
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও এক ধরনের অস্থিরতার পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে। এখনো বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সরকারবিরোধী আন্দোলনের সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রকাশ্যে নেই। কোনো একক রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্বে সরকারবিরোধী বড় আন্দোলনের নির্ভরযোগ্য প্রস্তুতির তথ্যও নেই। কিন্তু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা, জনঅসন্তোষের কয়েকটি ক্ষেত্র এবং সরকারবিরোধী বক্তব্য শুনলে মনে হয় রাজনীতির আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। বিশেষ করে সার-সংকটে ক্ষোভে ফুসে উঠছেন কৃষক। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় সার নিয়ে কৃষকদের এমন ক্ষোভ এখন আর নিছক বাজারব্যবস্থার সমস্যার মধ্যে নেই। কোথাও কৃষকেরা সারের দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছেন, কোথাও গুদামের দরজা ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহীর পুঠিয়ায় প্রায় ৩০০ কৃষক সার সরবরাহ ও কথিত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সড়ক অবরোধ করেছেন। কুড়িগ্রামের রৌমারীতে কৃষকেরা একটি গুদামের দরজা ভেঙে সার নিয়ে গেছেন। লালমনিরহাটেও সার সরবরাহের দাবিতে কৃষকেরা মহাসড়ক অবরোধ করলে প্রশাসনের আশ্বাসের পর তা প্রত্যাহার করা হয়।
সরকার বলছে, দেশে সার ঘাটতি নেই; মূল সমস্যা সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থায়। কিন্তু কৃষকের কাছে হিসাবটি ভিন্ন। প্রয়োজনের সময়ে সার না পাওয়া, বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হওয়া এবং ডিলারদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলছেন তারা। আর রাজনীতির জন্য সমস্যাটি এখানেই। সরকারের কাছে এটি সরবরাহব্যবস্থার সমস্যা হলেও কৃষকের কাছে এটি সরাসরি জীবন-জীবিকার সমস্যা। আর রাজনীতিতে জীবন-জীবিকার সমস্যা খুব দ্রুতই সরকারবিরোধী অসন্তোষের প্রতীকে পরিণত হতে পারে। কারণ- বাংলাদেশের রাজনীতিতে সার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের সংকট বরাবরই সরকারবিরোধী রাজনীতির কার্যকর ইস্যু। ২০০১-০৬ মেয়াদেও বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ ও সার-সংকট নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক সমালোচনা হয়েছিল।

# সার-সংকট, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দুর্ভোগ, দ্রব্যমূল্যের ঊধ্বমুর্খী ও সরকারি কাজে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সরকারবিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা করে তুলতে পারে
# ধর্মভিত্তিক কয়েকটি শক্তির অবস্থান ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে তাদের তৎপরতা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন ভূমিকা রাখতে পারে
# সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা রাজনীতিতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা

বর্তমান পরিস্থিতি অবশ্য অতীতের হুবহু পুনরাবৃত্তি নয়। কিন্তু রাজনৈতিক শিক্ষাটি একই—মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত সংকটকে কোনো সরকারই দীর্ঘদিন কেবল প্রশাসনিক ব্যাখ্যায় সামাল দিতে পারে না। বর্তমান সরকারও বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে। সরকার বলছে, আগের সরকারের আমলের সংকট সামাল দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতির কারণে শিল্প ও সাধারণ ভোক্তা—দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি করছে। আগস্টে গ্যাসের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়ে বড় ধরনের লোডশেডিং দিতে বাধ্য হতে হচ্ছে।
অন্যদিকে তৃতীয় এফএসআরইউ নিয়ে সরকারের পরিকল্পনাও এসেছে এমন সময়ে, যখন আমদানিনির্ভর গ্যাসব্যবস্থার ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। একটি গণমাধ্যমের হিসাবে প্রস্তাবিত তৃতীয় এলএনজি টার্মিনালের ক্ষেত্রে বর্তমান রিগ্যাসিফিকেশন ব্যয়ের তুলনায় ৩৫-৩৭ শতাংশ বেশি অর্থ গুনতে হতে পারে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে বিএনপির সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট—একদিকে বাস্তব সংকট সামলানো, অন্যদিকে সেই সংকটকে রাজনৈতিক বয়ানে পরিণত হওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণ করার  উদ্যোগ গ্রহণ। আরেকটি জায়গা বিএনপির জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে—সরকারি কাজ ও ক্ষমতার সুবিধা বণ্টন নিয়ে অভিযোগ। সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের পরিবারের সদস্যদের সরকারি কাজ পাওয়ার অভিযোগ সামনে আসছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে সাঈদ ইব্রাহিমকে ঘিরে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সাঈদ ইব্রাহিমের মালিকানাধীন ‘স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেড’ জাপানি একটি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় অংশীদার হিসেবে ভোলা-বরিশাল ও শরীয়তপুর-চাঁদপুর মেগা সেতু প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ওই দুই প্রকল্পের সম্ভাব্য মোট মূল্য প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির দাবি অনুযায়ী, স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটাল তুলনামূলক নতুন প্রতিষ্ঠান এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে স্থানীয় অংশীদার হওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন সরকারি নিশ্চিতকরণ এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টিকে আপাতত অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে রাজনৈতিকভাবে অভিযোগটির গুরুত্ব অন্য জায়গায়। ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর পরিবারের সদস্য যদি কয়েক দশকে হাজার কোটি টাকার সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পের সম্ভাব্য স্থানীয় অংশীদার হন, তাহলে তো স্বচ্ছতা ও স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠবেই। সরকার চাইলে এই প্রশ্নের সহজ উত্তর দিতে পারে—চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক প্রকাশ করে, অংশীদার নির্বাচনের যোগ্যতা প্রকাশ করে এবং প্রকল্পের অর্থায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া জনগণের সামনে তুলে ধরে। তাছাড়া এমপি মুশফিকুর রহমানের নাতি তায়েফ রহমানকে ঘিরে নতুন এফএসআরইউ প্রকল্পে আগের তুলনায় ১২২ কোটি টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগটিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।    
শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের ঘোষণা
নানান সংকটের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরতে চান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারেও তিনি দেশে ফেরার প্রস্তুতির কথা বলেছেন। একই সাক্ষাৎকারে তার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ভূমিকার কথাও সামনে এসেছে। এখানে শেখ হাসিনার বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক।
প্রথমত, তিনি দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নে শেখ সেলিমের নাম সামনে এনেছেন।
তৃতীয়ত, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। 
ফলে শেখ হাসিনার বক্তব্যটি শুধু আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের বিষয় নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের নির্বাচন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং বিএনপি সরকারকে স্পর্শ করেছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং দলটির বহু নেতা-কর্মী মামলা ও গ্রেপ্তারের মুখে থাকলেও শেখ হাসিনার বক্তব্যে পর রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের আভাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ কীভাবে সংগঠন পুনর্গঠন করবে, নিষেধাজ্ঞার রাজনৈতিক ও আইনগত বাস্তবতা কীভাবে মোকাবিলা করবে এবং সাধারণ নেতা-কর্মীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনবে—যদিও এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত, তারপরও বিএনপির জন্য বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক দেশের রাজনীতিতে গভীরভাবে বিস্তৃত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির নড়াচড়া। হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি শক্তির অবস্থান এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে তাদের তৎপরতা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন ভূমিকা রাখতে পারে বলেও অভিজ্ঞ মহল করেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির একটি অংশের সঙ্গেও বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের রাজনৈতিক সহঅবস্থানের মিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে এটিকে এখনই বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে সুসংগঠিত জোট বা সরকার পতনের আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে দেখার মতো সময় এখনো আসেনি। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাস করছে—এটিই এখন পর্যন্ত বেশি দৃশ্যমান। 
নির্বাচনের আগে বিএনপি যে পরিবর্তন, সুশাসন, অর্থনৈতিক স্বস্তি, আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির তুলনা এখন অনিবার্য। কারণ- অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীল, ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত, বিদ্যুৎ-গ্যাস এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্বাচনের আগে জনগণের অসীম প্রত্যাশা রেখেছিলো। এই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে সরকারবিরোধী রাজনীতির জন্য নতুন ইস্যু তৈরি হবে। আর প্রতিটি নতুন ইস্যু যদি আগেরটির সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন বিচ্ছিন্ন অসন্তোষ ধীরে ধীরে সামগ্রিক রাজনৈতিক অসন্তোষে পরিণত হতে পারে। 
সার-সংকট, কৃষকের ক্ষোভ, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দুর্ভোগ, দ্রব্যমূল্যের ঊধ্বমুর্খী, সরকারি কাজ নিয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ—প্রতিটি বিষয় আলাদা করে হয়তো সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু এগুলো একই সময়ে অব্যাহত থাকলে রাজনৈতিক মাঠে বিরোধীশক্তি তা কাজে লাগিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা করে তুলতে পারে। সেই সঙ্গে জনগণ যদি মনে করে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু শাসনের চরিত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি; দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির পুরোনো সংস্কৃতি নতুন মুখে ফিরে এসেছে; বাজারের চাপ কমেনি; কৃষকেরা সময়মতো সার পাচ্ছেন না; আর ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে না—তাহলে বিরোধীদের আলাদা করে সরকারবিরোধী আন্দোলন সহসায় নতুন মাত্রা পাবে।  বিএনপির হাতে তাই এখনো সময় আছে। প্রশ্ন হলো—সেই সময়টি তারা আত্মতুষ্টিতে কাটাবে, নাকি সম্ভাব্য রাজনৈতিক ঝড়ের আগে ঘর মেরামত করবে?

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL