২০২৪ সালের জুলাই গণঅভুত্থানে ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুবাই, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এছাড়া সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখা ও বিদেশে বিপুল সংখ্যক অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সেগুনবাগিচায় দুদক প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কমিশনের সহকারী পরিচালক তানজীর আহমেদ।
তিনি জানান, পাচারের পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক নিয়োগে ৬০ কোটি টাকা এবং সারাদেশে ৩৬ জন ডিসি পদায়নে সর্বনিম্ন দুই থেকে ১০ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও এসেছে। অনুসন্ধানের আওতায় আসিফ মাহমুদের পাশাপাশি তার বাবা ও সাবেক দুই সহকারীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দুদক কর্মকর্তা তানজীর আহমেদ বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া ‘শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম’ নির্মাণ প্রকল্প দুর্নীতি, বিভিন্ন দপ্তরে বদলি-পদোন্নতি বাণিজ্য এবং বিভিন্ন সরকারি কাজের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণসহ ক্ষমতার অপব্যবহারের আরও একাধিক অভিযোগ খতিয়ে দেখছে কমিশন। তিনি বলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের এসব অভিযোগের অনুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। অনুসন্ধানের মাধ্যমে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
দুদকে জমা দেয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে আসিফ মাহমুদ পর্তুগালে জমি কিনেছেন, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ করেছেন এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করে সেখানে বিলাসবহুল ভিলা বা ভবন কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। এ ছাড়া তার দুই ভগ্নিপতি ও এক ভাগ্নের মাধ্যমেও বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ করা হয়েছে। দুর্নীতির অর্থে পাঁচ তারকা হোটেলে যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ি ব্যবহার এবং হেলিকপ্টারে ভ্রমণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের বিনিময়ে ঘুষ নেয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা এবং ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতেও কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার-বাণিজ্যের সঙ্গেও তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন এবং এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া তার পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনে তদবির এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
দুদক কর্মকর্তা তানজীর আহমেদ বলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের এসব অভিযোগের অনুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। অনুসন্ধানের মাধ্যমে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।