নারকেলের ভালো ফলনে পরিচর্যার গুরুত্ব

মো: তারিকুল ইসলাম
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

নারকেল গাছের ফলন বাড়াতে এবং গাছকে সুস্থ রাখতে এর বিভিন্ন রোগ ও সমস্যা দমন করা অত্যন্ত জরুরি। নারকেল চাষে সাধারণত ছত্রাক, পোকা এবং পুষ্টির অভাবে বেশ কিছু জটিল সমস্যা দেখা দেয়। নারকেলের প্রধান পাঁচটি রোগ ও সমস্যা, তাদের লক্ষণ এবং সুনির্দিষ্ট সমাধান সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো।
১. নারকেলের মাকড় সমস্যা (Mite Infestation) লক্ষণ:
 মাকড়ের আক্রমণে কচি ডাব বা নারকেলের গায়ে প্রথমে হালকা হলুদ বা বাদামী রঙের দাগ পড়ে। আক্রমণ বাড়লে ফলের খোসা শক্ত, খসখসে ও ফেটে বিকৃত আকার ধারণ করে,আক্রান্ত ডাব সময়ের আগেই ঝরে পড়ে এবং ফলের আকার আশঙ্কাজনকভাবে ছোট হয়। নারকেলের ছোবড়া থেকে আঁশ সহজে ছাড়ানো যায় না এবং ফলের বাজারমূল্য কমে যায়।
সমাধান: আক্রান্ত ডাব বা ফল গাছ থেকে পেড়ে মাটিতে পুঁতে বা পুড়িয়ে ধ্বংস করতে হবে। প্রাকৃতিকভাবে দমনের জন্য নিম তেল ও সাবান পানির মিশ্রণ ডাবের ছড়ায় স্প্রে করা যেতে পারে। রাসায়নিক প্রতিকার হিসেবে গাছে ও ফলের কাঁদিতে ওমাইট বা ভার্টিমেক মাকড়নাশক স্প্রে করতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি ওমাইট মিশিয়ে ফলের কচি অবস্থায় ২-৩ বার স্প্রে করা প্রয়োজন।
২. নারকেল গাছের সাদা মাছি (Rugose Spiraling Whitefly) 
বর্তমানে নারকেল চাষের জন্য একটি অত্যন্ত বিধ্বংসী ও ক্ষতিকর পোকা। সাদা মাছি ও তার বাচ্চারা পাতার নিচ থেকে রস চুষে খেয়ে গাছকে পুষ্টিহীন ও দুর্বল করে ফেলে। মাছির নিঃসৃত আঠালো তরলের কারণে পাতায় কালো ছত্রাক জমে পুরো পাতা কালো হয়ে যায়।পাতা কালো হয়ে যাওয়ার ফলে গাছ সূর্যের আলো থেকে নিজের খাদ্য তৈরির ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আক্রমণের তীব্রতায় গাছের ফুল ও কচি ডাব অসময়ে ঝরে পড়ে ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।গাছে থাকা ডাব বা নারকেলের আকার ছোট হয়ে যায় এবং ভেতরের পানি ও শাঁস শুকিয়ে নষ্ট হয়।
সমাধান: পাতার নিচে জোরে পানি স্প্রে করে সাদা মাছি ও মোমের আস্তরণ ধুয়ে ফেলে দিন।প্রতি একরে ১০-১২টি হলুদ আঠালো ফাঁদ (Yellow Sticky Trap) গাছের কাণ্ডে ঝুলিয়ে দিন। প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলি নিম তেল ও ১ মিলি তরল সাবান মিশিয়ে পাতার নিচে স্প্রে করুন। আক্রমণ বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ গ্রাম ইমিডাক্লোপ্রিড (যেমন: টিডো বা এডমায়ার) মিশিয়ে স্প্রে করুন। পাতার কালো ছত্রাক দূর করতে ১% ভাতের মাড়ের দ্রবণ পাতার ওপর স্প্রে করে ধুয়ে ফেলুন। 
৩. গাছের পাতা পোড়া বা ব্লাইট রোগ (Leaf Blight)
লক্ষণ: এই রোগে নারকেল গাছের নিচের দিকের বয়স্ক পাতায় ছোট ছোট বাদামী দাগ দেখা যায়,পরবর্তীতে দাগগুলো আকারে বড় হয়ে পুরো পাতাটি পুড়ে যাওয়ার মতো তামাটে রঙ ধারণ করে, আক্রান্ত পাতাগুলো সময়ের আগেই শুকিয়ে মরে যায় এবং গাছ তার সালোকসংশ্লেষণ ক্ষমতা হারায়।
সমাধান: আক্রান্ত পাতাগুলো গাছ থেকে কেটে সংগ্রহ করে দ্রুত পুড়িয়ে ফেলতে হবে।পটাশিয়াম সারের অভাব হলে এই রোগ বেশি হয়, তাই নিয়ম মেনে পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে, আক্রান্ত গাছে টিল্ট ২৫০ ইসি বা ফলিকুর ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ১মিলি মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। বাগান আগাছামুক্ত ও আলো-বাতাস চলাচলের উপযোগী করে রাখলে এ রোগ ছড়াতে পারে না।
৪. কাণ্ড বা আঠা ঝরা রোগ (Stem Bleeding)
লক্ষণ: নারকেল গাছের কাণ্ডের নিচের অংশ ফেটে তরল রস বা লালচে-বাদামী আঠা বের হয়। আঠা শুকিয়ে কাণ্ডের গায়ে কালো দাগের সৃষ্টি করে এবং কাণ্ডের ভেতরের টিস্যু পচে যায়।গাছের পাতাগুলো ধীরে ধীরে হলুদ হয়ে ঝুলে পড়ে এবং মাথার অংশ সরু হয়ে আসে। রোগের তীব্রতা বাড়লে গাছের ভেতরের কাঠ দুর্বল হয়ে ঝড়ে গাছ ভেঙে পড়তে পারে।
সমাধান: গাছের কাণ্ডে কোনো ধরনের যান্ত্রিক আঘাত বা ক্ষত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আক্রান্ত কাণ্ডের ক্ষয়প্রাপ্ত অংশ ধারালো ছেনি দিয়ে চেঁছে পরিষ্কার করতে হবে।পরিষ্কার করে বোর্দো পেস্ট ভালো করে লেপে দিতে হবে।
ছোট গুটি ঝরে পড়া (Nut Dropping)
লক্ষণ: ফুল থেকে ছোট ছোট গুটি বা কচি ডাব হওয়ার পরপরই তা বোটা আলগা হয়ে ঝরে যায়, ডাবের ছড়ায় গুটির সংখ্যা কমে যায়, যার ফলে কাঁদিতে কোনো নারকেল টিকে থাকে না। মাটিতে খাবার ও পানির অভাব হলে অথবা অতিরিক্ত খরার কারণে এই সমস্যা তীব্র হয়। অনেক সময় হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বা ছত্রাকের আক্রমণের কারণেও গুটি ঝরে পড়ে।
সমাধান: শুষ্ক মৌসুমে গাছের গোড়ায় নিয়মিত এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি সেচ দিতে হবে। বছরে অন্তত দুইবার গাছের গোড়ায় সুষম মাত্রায় নাইট্রোজেন, পটাশ ও ফসফরাস সার দিতে হবে। বোরন ও দস্তার অভাব দূর করতে গাছের গোড়ায় প্রতি বছর ১০০ গ্রাম সলুবর বোরন প্রয়োগ করতে হবে। গুটি ঝরা রোধে প্লানোফিক্স বা সমজাতীয় হরমোন প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি মিশিয়ে স্প্রে করা যায়। 

লেখক: সহকারী ম্যানেজার (কৃষি),  প্রান্ত এগ্রো রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট ইনিসিয়েটিভ

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL